ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

পোশাকশিল্পের সংকট নিরসনে ১৫ দফা দাবি জামায়াতের

পোশাকশিল্পের সংকট নিরসনে ১৫ দফা দাবি জামায়াতের

দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান সংকট নিরসন, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং কারখানাগুলোতে স্বাভাবিক উৎপাদন পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ১৫ দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এছাড়াও শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, গাজীপুরে শ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত, বন্ধ কারখানা চালু, বেআইনি ছাঁটাই বন্ধ এবং শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধেরও দাবি জানিয়েছে দলটি।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) পোশাকশিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়েছে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব লিখিত বক্তব্য পেশ করেন। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, শ্রমিকদের মজুরি ও অধিকারসংক্রান্ত অসন্তোষ, কারখানায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং উৎপাদন বন্ধের ঘটনায় দেশের তৈরি পোশাক খাতে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে একদিকে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাতও ক্ষতির মুখে পড়ছে।

জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পকারখানার নিরাপত্তা, উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং মালিক-শ্রমিকের মধ্যে আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা জরুরি। এ সংকট সমাধানে সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের মধ্যে কার্যকর সংলাপের উদ্যোগ নিতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি পূরণ এবং শিল্পের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত করার পথ বের করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়ে বলা হয়, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে নতুন মজুরি কার্যকর করতে হবে। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এই মজুরি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এ জন্য গত ১ নভেম্বর গঠিত ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ডকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। ৪ নভেম্বর বোর্ডের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়।

গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলনের সময় সংঘর্ষে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া ২১ বছর বয়সী শ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জামায়াত। দলটির দাবি, এ ঘটনার নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত করতে হবে। মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে নিহত শ্রমিকের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং সংঘর্ষে আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে কারখানায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও সহিংসতার নিন্দা জানানো হয়। তবে এসব ঘটনার দায় প্রমাণ ছাড়া সাধারণ শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে না দেওয়ার আহ্বান জানায় দলটি। একই সঙ্গে শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়। বিশেষ করে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ কিংবা অন্য কোনো গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে উসকানি দিয়ে নাশকতা ঘটিয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করার আহ্বান জানানো হয়।

শ্রমিকদের হয়রানি, নির্যাতন ও গণগ্রেপ্তার বন্ধের দাবি জানিয়ে জামায়াত বলেছে, কোনো অপরাধে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া শ্রমিকদের গ্রেপ্তার বা হয়রানি করা উচিত নয়। আন্দোলনের ঘটনায় নিরপরাধ শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুক্তি দিতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলন যেন সহিংসতা বা নাশকতার দিকে না যায়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়।

পোশাকশিল্পের সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও মিরপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে এক হাজারের বেশি কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এসব এলাকার শত শত কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। এতে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের আয় ও কর্মসংস্থান অনিশ্চয়তায় পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত চালু করতে সরকার ও মালিকপক্ষকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটকেও পোশাকশিল্পের অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি উৎপাদন ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি কারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করছে। সিপিডির তথ্যের বরাত দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শতাধিক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে এবং প্রায় ৬২ হাজার শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। এ সংকট মোকাবিলায় শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।

দলটির ১৫ দফা দাবির মধ্যে আরও রয়েছে, কারখানায় শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বেআইনিভাবে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ করা, কালো তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের কাজে পুনর্বহাল এবং শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, ভাতা ও অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক দ্রুত পরিশোধ করা। শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধে কোনো ধরনের গড়িমসি বা হয়রানি করা যাবে না বলেও দাবি জানানো হয়।

শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে রেশনিং ব্যবস্থা চালু, সাশ্রয়ী আবাসন, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছে জামায়াত। পাশাপাশি পোশাকশিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে হয়রানি ও বৈষম্য বন্ধের পাশাপাশি নারী শ্রমিকদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও অন্যান্য ন্যায্য অধিকার রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা এ এন এম শামসুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সংসদ সদস্য মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, সাবেক সংসদ সদস্য ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম, অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরসহ কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও মহানগর নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমানও সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

জামায়াতের,১৫ দফা দাবি,সংকট নিরসন,পোশাকশিল্প
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত