প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬
অনেকেই বলেন, ফেরদৌসী গজনীর শাসক সুলতান মাহমুদের অনুরোধে ‘শাহনামা’ লেখা শুরু করেছিলেন। কবিতার বিভিন্ন জায়গায় সুলতান মাহমুদের প্রশংসাও আছে, বলা হয়েছে যে কবি তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় নিশ্চিন্তে জীবনযাপন করেছেন। কিন্তু এই কথাগুলোই ‘শাহনামা’ সুলতানের আদেশে লেখা হয়েছিল- এটা প্রমাণ করে না। বরং কবিতার মধ্যেই এমন কিছু ইঙ্গিত আছে, যা থেকে বোঝা যায়, এই গ্রন্থ রচনার পেছনে সুলতানের কোনো সরাসরি আদেশ ছিল না।
বলা হয়েছে, ফেরদৌসী যখন এই মহাকাব্য লেখা শুরু করেন, তখন তাঁর এক বন্ধু তাঁকে বলেছিলেন- এমন রাজাদের কাহিনী কোনো একজন সম্রাটকে উৎসর্গ করলে ভালো হয়। সেই উপদেশ ফেরদৌসী গ্রহণ করেন। ইতিহাসও জানায়, একসময় তিনি সুলতান মাহমুদের সভায় স্থান পেয়েছিলেন।
তবে এতেই নিশ্চিত হওয়া যায় না যে ফেরদৌসী সুলতানের আদেশে কাব্য রচনা শুরু করেছিলেন। তবে এটা বলা যায় যে, ফেরদৌসী সুলতানের কাছ থেকে বড় কোনো পুরস্কারের আশায় ছিলেন। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তার কারণও সম্ভবত ‘শাহনামা’ নিজেই।
এই কাব্য পারস্য জাতীয়তাবাদের এক উজ্জ্বল প্রকাশ। স্বভাবতই, তুর্কি বংশোদ্ভূত গজনী শাসকগণ এই কাব্য সহজে মেনে নিতে পারেননি। পরে ‘শাহনামা’ যতই বিখ্যাত হোক না কেন, তখনকার সময়ে পারস্য ও তুর্কিদের মধ্যে বিরোধ প্রকট ছিল। সুলতান মাহমুদের মতো একজন রাজাকে এ বাস্তবতা না বোঝার কারণ নেই।
আর ‘শাহনামা’য় মাহমুদের যে প্রশংসাগুলো আছে, সেগুলোও অনেকাংশে জোড়া লাগানো মনে হয়। কারণ, কবিতার প্রধান চরিত্র বা ইতিহাসের ধারা গজনী রাজবংশের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখে না। পুরো কাহিনি শেষ হয়েছে মুসলমানদের হাতে পারস্য বিজয়ের মাধ্যমে। সেখানে মাহমুদের জন্য কোনো আলাদা মর্যাদার স্থান রাখা হয়নি।
কবিতা যখন শেষ হয়, তখন ফেরদৌসীর বয়স প্রায় আশি বছর। মানে, তিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে এই কাব্য রচনায় নিয়োজিত ছিলেন। যদি তা-ই হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে- তাঁর জীবনের প্রথম ৫০ বছর কোথায়, কীভাবে কেটেছে? আবার, যদি কাব্য রচনার শুরু ৯৮০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি হয়ে থাকে, তাহলে দেখা যায়, তখনও সুলতান মাহমুদ রাজসিংহাসনে বসেননি। তিনি তো সিংহাসন লাভ করেন ৯৯৮ সালে। তাহলে তাঁর আদেশে ফেরদৌসী ৯৮০ সালে কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন- এটা বিশ্বাস করা কঠিন।
শোনা যায়, ফেরদৌসী তাঁর যুবক বয়সে নিজ জন্মভূমিতে পারস্যের প্রাচীন রাজাদের কাহিনি গদ্যে লিখতে শুরু করেন এবং সম্ভবত শেষও করেন। পরে একজন কবি দাকিকির কাজ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে সেই গদ্যকাহিনিকে ছন্দে রূপ দিতে শুরু করেন। দাকিকি নিজে এই কাজ শুরু করেছিলেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অল্প বয়সেই খুন হন। ফেরদৌসী তাঁর কাজকে এগিয়ে নেন।
সম্ভবত শুরুতে যে গদ্যরূপটি লেখা হয়েছিল, তা ছিল ‘আলিফ লায়লা’ ধরনের কোনো রূপকথার আদলে। পরে দাকিকির প্রেরণায় ফেরদৌসী নিজ শহর থেকেই ছন্দে ‘শাহনামা’ লেখা শুরু করেন। সুলতান মাহমুদের সভায় তিনি গিয়েছিলেন জীবনের পরিণত বয়সে, একজন প্রাজ্ঞ কবি হিসেবে। সুলতান মাহমুদের সভায় তখন অনেক গুণিজন ছিলেন- যেমন আল-বেরুনী, কবি আজাদি, যবকর্মী, উনাবি প্রমুখ। ফেরদৌসীও এই গুণিজনদের একজন হয়ে উঠেছিলেন।
মাহমুদ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, শাহনামার প্রতিটি শ্লোকের জন্য ফেরদৌসিকে ১ স্বর্ণমুদ্রা করে পুরস্কৃত করবেন। পুরো গ্রন্থে প্রায় ৬০,০০০ শ্লোক থাকায় ফেরদৌসি বিশাল পুরস্কারের প্রত্যাশা করেছিলেন।
কিন্তু দীর্ঘ ৩০ বছর পর ফেরদৌসি যখন মহাকাব্যটি শেষ করে মাহমুদের কাছে উপস্থাপন করেন, তখন প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী স্বর্ণমুদ্রার বদলে তাকে রূপার মুদ্রা দেওয়া হয়, তাও অসম্মানজনকভাবে- স্নানাগারে। এতে তিনি চরম অপমানিত হন। ক্ষুব্ধ ফেরদৌসি শাহনামায় একাধিক স্থানে সুলতান মাহমুদের সমালোচনা করেন। বিশেষভাবে শেষ অংশে তিনি এক তীব্র ব্যঙ্গাত্মক কবিতা রচনা করেন, যেখানে মাহমুদকে নিষ্ঠুর ও অকৃতজ্ঞ শাসক হিসেবে চিত্রিত করা হয়।
ফেরদৌসীর অপবাদসূচক সেই বিখ্যাত কবিতাটি শুধু ক্ষোভ নয়- তার ভেতরে আমরা ফিরে পাই অনেক ঐতিহাসিক সত্য আর অনুভব করি এক মহাকবির আত্মমর্যাদাবোধ। সেই কবিতার মাধ্যমে বোঝা যায়, সুলতান মাহমুদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কতটা তিক্ত হয়ে উঠেছিল। কবি নিজের কাজের উপযুক্ত স্বীকৃতি না পাওয়ায় হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, আর সেই ক্ষোভ থেকেই সুলতানের নামে লিখে ফেলেন সেই বিখ্যাত নিন্দাসূচক কবিতা। সুলতানের দিক থেকেও তখন ফেরদৌসীর ওপর তিরস্কার বর্ষিত হয়। হয়তো এটিও একটি প্রতিক্রিয়াই ছিল- একদিকে প্রত্যাখ্যাত কবির হৃদয়ের আর্তনাদ, অন্যদিকে সিংহাসনের গর্বিত প্রতিধ্বনি।
‘শাহনামা’ কবি শেষ করেছিলেন ১০১০ খ্রিষ্টাব্দে। ঐতিহাসিক সূত্র বলছে, ফেরদৌসী দীর্ঘদিন গজনীর রাজসভায় ছিলেন এবং অনেকেই বলেন, তিনি রাজসভার অন্যতম অলঙ্কার ছিলেন। তিনি জন্মেছিলেন ইরানের তুস নগরে, এক সম্ভ্রান্ত ‘দিহকান’ পরিবারে। ‘দিহকান’ শব্দের আক্ষরিক মানে চাষী হলেও, তখনকার দিনে তারা ছিলেন ভূমিনির্ভর অভিজাত শ্রেণির মানুষ। সময়ের সঙ্গে অনেক দিহকান পরিবার ধন-সম্পদ হারিয়ে ফেললেও, তাদের শিক্ষা, আত্মমর্যাদা ও রুচি ঠিকই বজায় থাকত। ফেরদৌসী সম্ভবত এমন এক পরিবার থেকেই এসেছিলেন।