প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
গ্যালিলিও গ্যালিলি : চার্চের রোষানলে গৃহবন্দি হয়েও সফলতা
১৫৬৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ইতালির পিসায় গ্যালিলিও গ্যালিলির জন্ম। বাবা ভিনসেনজো গ্যালিলি ছিলেন গণিতজ্ঞ ও সংগীতশিল্পী। ১৫৭৪ সালে তার পুরো পরিবার ইতালির ফ্লোরেন্সে চলে আসে। সেখানেই আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় গ্যালিলিওর। ক্যামালডোলেজ নামের এক আশ্রমে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয়। বাবার মতো তিনিও বেশ ভালো 'লিউট' (ষোড়শ শতকে ব্যবহৃত একপ্রকার তারের বাদ্যযন্ত্র) বাজাতে পারতেন। ১৫৮৩ সালে গ্যালিলিও মেডিসিনে পড়ার জন্য পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছায় পড়ালেখা চালিয়ে যান; কিন্তু আর্থিক সমস্যার ফলে ১৫৮৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জনের আগে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়তে হয়। এরপরও গ্যালিলিও তার গণিত শিক্ষা চালিয়ে যান। তিনি এ সময় 'দ্য লিটল ব্যালান্স' প্রকাশ করেন। তার এ গবেষণা জনপ্রিয়তা পায় এবং পিসা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়। অবশ্য এখানে তার সুসময় বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। গবেষণা করে তিনি যেসব তথ্য প্রকাশ করেন, অ্যারিস্টটলের সঙ্গে তার কোনো মিল ছিল না। ১৫৯২ সালে গ্যালিলিও পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পদ হারান। এরপর দ্রুতই তিনি পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পান। সেখানে ১৮ বছর শিক্ষকতা করেন। দূরবীক্ষণ যন্ত্রের মানোন্নয়ন ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের অগ্রগতিসহ বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জনক বলা হয় তাকে। দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে বৃহস্পতির চারটি উপগ্রহ আবিষ্কার করেন তিনি। গ্রহ ও উপগ্রহ পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে, এ মতবাদকে গ্যালিলিও ভুল প্রমাণ করেন। তার মতে, পৃথিবী নয়, সূর্যকে কেন্দ্র করেই সবকিছু ঘুরছে। এ মতবাদ প্রচারের জন্য তাকে শাস্তিও পেতে হয়। ১৬১২ সালে তিনি 'ডিসকোর্স অন বডিস ইন ওয়াটার' প্রকাশ করেন। পরের বছরই 'লেটারস অব সানস্পট' বইয়ে তিনি দাবি করেন, সূর্য নিখুঁত নয়, বরং এর গায়ে কালো দাগ আছে; যাকে তিনি সৌরকলঙ্ক বলে অভিহিত করেন। ১৬১৩ সালে তিনি তার এক ছাত্রের কাছে একটি চিঠি লিখেন। যেখানে তার একটি বিখ্যাত উক্তি ছিল, 'ঈশ্বর আমাদের অনুভূতি, যুক্তি ও বুদ্ধি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন; কিন্তু আমাদের সেগুলোর ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন, এমন কথা মানি না।' ১৬৩২ সালে গ্যালিলিও তার বিখ্যাত বই 'ডায়ালগ' প্রকাশ করেন। বইটি প্রকাশের পর তাকে ধর্মবিরোধিতার অভিযোগে গৃহবন্দি করা হয়। গৃহবন্দীর আট বছরের মাথায় ৭৭ বছর বয়সে ইতালির ফ্লোরেন্সের কাছে আর্সেট্রি নামক স্থানে ১৬৪২ সালের ৮ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন তিনি। যদিও তিনি মারা যাওয়া পর্যন্ত তার অধিকাংশ কাজের ওপর চার্চের নিষেধাজ্ঞা ছিল, কিন্তু কালের পরিক্রমায় সত্য থেকে বিমুখ থাকতে পারেনি চার্চ। ১৮৩৫ সালে চার্চ তার সব কাজের ওপর সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে জয় হয় বিজ্ঞানের। বিংশ শতকে অনেক পোপই তার কাজের গুরুত্ব অনুধাবনের কথা বলেন। তারা বিজ্ঞানে ও পৃথিবীকে আরও ভালোভাবে চেনার পথপ্রদর্শক হিসেবে তার কাজের স্বীকৃতি দেন।
থমাস আলভা এডিসন : ব্যর্থতার পরও বৈদ্যুতিক বাতির আবিষ্কারক
বৈদ্যুতিক বাল্ব আবিষ্কারের কারণে ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে আছে থমাস আলভা এডিসনের নাম। তিনি মধ্য-পশ্চিম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উত্তর কেন্দ্রীয় অঞ্চলের অঙ্গরাজ্য ওহাইও-তে ১১ ফেব্রুয়ারি ১৮৪৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৭৯ সালের ২১ অক্টোবর এডিসন তার বৈদ্যুতিক বাল্বের পেটেন্টের জন্য আবেদন করেন। এটি এমন এক উদ্ভাবন, যা গোটা বিশ্বকে রাতের আঁধারে আলোকিত করেছিল। এডিসনের এ আবিষ্কার শুধু বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেই নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করে। তার বৈদ্যুতিক বাল্বের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক আলো মানুষকে রাতের বেলায় কাজ করার সুযোগ করে দেয়, যা শিল্পবিপ্লবের অগ্রগতিতে বিশাল ভূমিকা রাখে। কথিত আছে, থমাস আলভা এডিসনকে সফলভাবে বাতি বানাতে গিয়ে ১০ হাজার বারের বেশি ব্যর্থ হতে হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, 'আমি ১০ হাজার বার ব্যর্থ হইনি, আমি এটি কাজ না করার ১০ হাজারটি কারণ বের করেছি মাত্র।' উডওয়ার্ড ও ইভান্স-এর গবেষণার স্বত্ব বা কপিরাইট কিনে নেন থমাস। তাদের প্রজেক্টের ওপর গবেষণা চালাতে থাকেন। ১৮৭৯ সালে তিনি আধুনিক বাল্বের সফল নকশা করতে সফল হন। অন্য সবার মতো থমাসও কাজটি করতে গিয়ে বারবার ব্যর্থতার সম্মুখীন হন। কিন্তু অন্যরা ব্যর্থ হয়ে গবেষণা থামিয়ে দিয়েছে, কিন্তু থমাস তা করেননি। তিনি গবেষণা চালিয়ে গিয়েছেন সফলতার আগপর্যন্ত। সফল হওয়ার পর তিনি আধুনিক বাল্বের পেটেন্টটি নিজ নামে করে নেন। থমাস এডিসন ছোটবেলা থেকেই বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রতি অনুরাগী ছিলেন। তার প্রকৃতি ছিল অনুসন্ধিৎসু। তিনি বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে সবসময় নতুন কিছু শিখতে আগ্রহী ছিলেন। মাত্র ১২ বছর বয়সে রেলগাড়িতে সংবাদপত্র বিক্রির কাজ করার সময় একটি ছোট গবেষণাগার গড়ে তোলেন। সেখানে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা চালাতেন। এ আগ্রহ থেকেই তিনি পুরো জীবন নানান উদ্ভাবনে লিপ্ত ছিলেন। একের পর এক সাফল্য অর্জন করেন। থমাস আলভা এডিসন ছিলেন সর্বমোট ১০৯৩টি আবিষ্কারের অধিকারী। বৈদ্যুতিক বাল্ব, আধুনিক ব্যাটারি, কিনটোগ্রাফ ক্যামেরা, যা প্রথম যুগের ভিডিও ক্যামেরা হিসেবে পরিচিত এবং সাউন্ড রেকর্ডিং ইত্যাদি তার শ্রম ও মেধার অবদান। এসব বিখ্যাত আবিষ্কারের বাইরেও তিনি নানা ধরনের গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের আবিস্কারক। তিনি যা যা আবিষ্কার করেছেন, তার সবগুলো সফল হয়েছে, এমনটাও নয়। তার রয়েছে কিছু অসফল আবিষ্কারও। সেগুলোর সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ শতাধিক। ৮৪ বছর বয়সী এ মহান বৈজ্ঞানিক ১৯৩১ সালের ১৮ অক্টোবর ওয়েস্ট অরেঞ্জ-এ নিজ বাড়িতে মারা যান। তার মৃত্যুর কিছুক্ষণ পর সারা বিশ্বের সব প্রান্তে কিছুক্ষণের জন্য ইলেকট্রিসিটি বন্ধ করে আলোর কারিগর হিসেবে তাকে সম্মান জানানো হয়।
মেরি কুরি : জীবন সংগ্রামে এক অজেয় নারী
মেরি কুরি বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিস্ময় সৃষ্টিকারী একটি নাম। রাশিয়া বিভাগের সময় ১৮৬৭ সালের ৭ নভেম্বর পোল্যান্ডের ওয়ার্স শহরে তার জন্ম। তার বাবা কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। মা ওয়ার্স শহরের গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। তাদের বাড়িতে সবসময় লেখাপড়ার আবহ বিরাজ করত। তাদের বাবা প্রতি সন্ধ্যায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিজ্ঞান ও সাহিত্যের আসর বসাতেন। তাই বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা ছোটবেলা থেকেই শুরু হয়। মেরির বয়স যখন দশ, তখন তার মা যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মায়ের মৃত্যুর কিছুদিন পর বড় বোন জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তাদের মৃত্যুতে মেরি খুব ভেঙে পড়েন। এদিকে তৎকালীন সরকার মেরির বাবাকে পূর্বের চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়ে একটি নিম্ন শ্রেণির চাকরিতে নিয়োগ দেন। ফলে তাদের পরিবারে আর্থিক সংকট দেখা দেয়। এতে ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। মেয়ে শিক্ষার্থী হওয়ার কারণে মেরি ও তার মেজ বোন নিয়মিত কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারেননি। তিনি ও তার বোন পোলিশের একটি ভ্রাম্যমাণ বিদ্যালয়ে যোগ দেন। তবে এরই মধ্যে আর্থিক সংকটে তাদের পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কিন্তু মেরি ও তার বোন হাল ছাড়ার পাত্রী ছিলেন না। তাদের মধ্যে চুক্তি হলো, একজন আরেকজনের পড়াশোনার খরচ জোগাবে। সিদ্ধান্ত হলো, মেরি কাজ করে বোনের পড়ালেখার ব্যয়ভার বহন করবে। পড়ালেখা শেষ হলে বোন মেরির পড়ালেখার ব্যয়ভার বহন করবে। মেরি তার বোনের পড়ালেখার খরচ চালানোর জন্য মাসিক পাঁচশ রুবেলের বিনিময়ে এক অভিজাত রুশ আইনজীবীর বাড়িতে গভর্নেসের চাকরি নেন। প্রায় তিন বছর সেখানে কাজ করেন। এ সময় তার জীবনে আসেন কাজিমিয়েরেজ জোরভস্কির। মেরি যে বাসায় গভর্নেসের কাজ করতেন, কাজিমিয়েরেজ জোরভস্কির ছিলেন সে বাড়ির ছেলে। নিয়তি সহায় ছিল না। তাই মেরির সঙ্গে কাজিমিয়েরেজ জোরভস্কির সম্পর্কটা ভেঙে গেল। মেরির পরিবার গরিব বলে কাজিমিয়েরেজের পরিবার সম্পর্কটা মেনে নেয়নি। এ বিচ্ছেদ মেরিকে আহত করে। পরে মেরি এ চাকরি ছেড়ে দেন। এরই মধ্যে মেরির বোন শিক্ষা কার্যক্রম শেষ করে চিকিৎসকের পেশায় নিয়োজিত হন। পূর্বশর্ত অনুযায়ী এবার মেরি তার বোনের আর্থিক সহায়তায় বিজ্ঞানের উচ্চশিক্ষার জন্য প্রথমে অস্ট্রিয়ার শাসনাধীনে ক্রাকো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান। কিন্তু সেখানে বিজ্ঞান ক্লাসে যোগ দিতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সচিব অসম্মতি জ্ঞাপন করে মেরিকে জানান, বিজ্ঞান মেয়েদের জন্য নয়, তিনি যেন রন্ধন শিক্ষা ক্লাসে যোগ দেন। তবে এসব বাধা মেরিকে তার বিজ্ঞানর প্রতি আগ্রহকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। ১৮৯১ সালের শেষের দিকে মেরি পোল্যান্ড থেকে ফ্রান্সের উদ্দেশে পাড়ি জমান। তিনি প্যারিসের সোরবর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন এবং গণিত অধ্যয়ন করতে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ল্যাটিন কোয়ার্টারে একটি গ্যারেজ ভাড়া করে বসবাস শুরু করেন। মেরির আয় তখন ছিল খুবই সীমিত। প্রায় সময় তাকে ক্ষুধায় কাটাতে হতো। দিনে পড়তেন, সন্ধ্যায় পড়াতেন। পড়িয়ে যা আয় করতেন, তা ছিল খুবই সামান্য। ১৯৮৩ সালে তাকে পদার্থবিজ্ঞানে ডিগ্রি দেওয়া হয়। এরপর তিনি গ্যাব্রিয়েল লিপম্যানের শিল্পভিত্তিক গবেষণাগারে কাজ শুরু করেন। এরইমধ্যে তিনি আরেকটি ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে ফেলোশিপ পেয়ে যান। এরপর থেকে তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালোভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যান। মেরি প্যারিসে 'দ্য সোসাইটি ফর দ্য এনকারেজমেন্ট অফ ন্যাশনাল ইন্ডাস্ট্রি'র সহায়তায় বিভিন্ন পদার্থের চৌম্বক পরীক্ষার মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক গবেষণা শুরু করেন। এ সময় পিয়েরে আসেন তার জীবনে। প্রকৃত বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহই তাদেরকে এ জায়গায় নিয়ে আসে। পিয়েরে কুরি ছিলেন বিশিষ্ট পদার্থবিদ। কুরির বাবা ইউজিন কুরি নিজের বাড়িতেই একটি গবেষণাগার গড়ে তুলেছিলেন। সেখানে ভাই জাকা কুরি আর বাবার সঙ্গে পিয়েরে রাতদিন গবেষণা করতেন। পোলিশ পদার্থবিদ অধ্যাপক জোজেফ কোভালস্কি যিনি মেরিকে সব ব্যাপারে সাহায্য করতেন, তিনিই মেরিকে কুরিদের গবেষণাগারে যোগ দিতে পরামর্শ দেন। তিনি জানতেন, মেরির গবেষণা কাজ চালিয়ে নেওয়ার জন্য বড় একটি গবেষণাগার প্রয়োজন। তাই তিনি পিয়েরের সঙ্গে মেরির পরিচয় করিয়ে দেন। মেরিকে দেখেই পিয়েরে তার প্রেমে পড়ে গেলেন। মেরিরও পিয়েরেকে দেখে ভালো লেগেছিল, কিন্তু কাজিমিয়েরেজের সঙ্গে ভালোবাসার তিক্ত অভিজ্ঞতা ভুলতে পারেননি। তাই প্রথমদিকে বিষয়টা এড়িয়ে চলতেন। দুজনে মিলে চুম্বক গবেষণায় নিয়োজিত হন। গবেষণা চলার সময় তাদের মধ্যে তীব্র ভালোলাগা ও ভালোবাসার জন্ম নেয়। পিয়েরেই বেশি আগ্রহী ছিলেন। অপরদিকে মেরি ছিলেন বাস্তববাদী। একদিন পিয়েরে সাহস করে মেরিকে প্রস্তাব দিয়ে বসেন। মেরি সরাসরি না করেননি, বেশ কিছু অজুহাতে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন। অবশেষে ১৮৯৫ সালের ২৬ জুলাই দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ে হয়। মেরি ও পিয়েরের জীবনে সংসার, গবেষণা আর ভালোবাসা যেন হাত ধরাধরি করে চলছিল। মেরি ও পিয়েরে যৌথভাবে গবেষণা শুরু করেন। ১৮৯৮ সালে এ দম্পতি প্রথমে প্লিচব্লেন্ড থেকে তেজস্ক্রিয় পদার্থ পলোনিয়াম এবং পরে রেডিয়াম আবিষ্কার করেন। মেরি ও পিয়েরে এজন্য ১৯০৩ সালে নোবেল পুরস্কার পান। মেরি সবসময় পিয়েরের পাশে থাকতেন। কিন্তু দিনরাত তেজস্ক্রিয় মৌল নিয়ে নাড়াচাড়ার ফল ভালো হলো না। লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৯৩৪ সালের ৪ জুলাই এ বিজ্ঞানী নারীর মৃত্যু হয়।
আলবার্ট আইনস্টাইন : শৈশবের জড়তার পরও সফলতার উচ্চ শেখরে
নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন। ১৪ মার্চ ১৮৭৯ সালে জার্মানিতে তার জন্ম। তিনি এতটাই স্মার্ট ছিলেন আর তার ব্রেইন নিয়ে বিজ্ঞানীরা এতটাই বিস্মিত ছিলেন, মৃত্যুর পর তার ব্রেইন ?চুরি করা হয়। তার আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এবং বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত সমীকরণের জন্য তিনি বিখ্যাত; যা প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী শেখে। 'থিওরি অব রিলেটিভিটি' নিয়ে তিনি কাজ করেছেন বছরের পর বছর। তবে তিনি যে শুধু এ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এবং সূত্রের জন্যই পরিচিত, এমনটা নয়; বরং আইনস্টাইন শিখিয়েছেন কীভাবে কঠোর পরিশ্রম এবং দৃঢ় সংকল্প জীবনে অসম্ভবকে অর্জন করতে সাহায্য করে। কারণ, তার সফল হওয়ার পেছনেও বহু বাধা ছিল। এ বাধা ডিঙিয়ে তিনি সফল হয়েছেন। চার বছর বয়স পর্যন্ত আইনস্টাইন কথা বলতে পারতেন না। ডাক্তার জানিয়ে দেন, তার মস্তিষ্ক স্বাভাবিক মস্তিষ্কের চেয়ে অনেক বড়। মা-বাবার ভয় ছিল, ছেলে হয়তো জড়বুদ্ধিসম্পন্ন হবে। এজন্য অবশ্য কটু কথাও শুনতে হয়েছিল তাকে। স্কুলজীবনে তার তেমন কোনো প্রতিভার প্রতিফলনও দেখা যায়নি। সব বিষয়ে কাঁচা, শুধু গণিত ও বিজ্ঞানে তিনি শীর্ষ ছাত্র ছিলেন। স্কুলে পড়াকালীন তার বাবা একদিন তাকে একটি কম্পাস দিয়েছিলেন, যেটি তার বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহের জন্ম দেয়। তার মনে কৌতূহল জন্মায়, আসলে এ মহাবিশ্ব কীভাবে কাজ করে! তবে তার মেধা থাকা সত্ত্বেও তিনি স্নাতকের পরেও একটি একাডেমিক চাকরি নিশ্চিত করতে পারেননি। তিনি ১৯০৩ সালে জার্মানির বার্নে ফেডারেল অফিস ফর ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি পেটেন্ট অফিসে ক্লার্ক হিসেবে কাজ করেন। দু'বছর অনেক গবেষণার পর আইনস্টাইন জার্নাল অ্যানালস অব ফিজিক্সে চারটি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্বগুলো সময়, স্থান, পদার্থ, শক্তি এবং মধ্যাকর্ষণকে নতুনভাবে পরিচয় করায়। তার কাজ পারমাণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ, মহাকাশ অনুসন্ধান এবং আলোর প্রয়োগসহ গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির দিকে নিয়ে গেছে। ১৯২১ সালে পদার্থবিজ্ঞানে অবদানের জন্য তাকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। জীবনের ২০ বছর বিজ্ঞান সাধনায় কাটিয়েছেন তিনি। তবে মানবতার কল্যাণে সংগ্রাম করেছেন ৪০ বছর। আইনস্টাইন তার জীবনের অর্জন থেকে শিখেছেন এবং সবাইকে শিখিয়েছেন। তার মতে, ভুল করা অন্যায় নয়; বরং ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে, এগিয়ে যেতে হবে। একই কাজ বারবার পুনরাবৃত্তি করলে জীবন কখনোই মূল্যবান হয়ে ওঠে না; বরং প্রতিটি কাজকেই উন্নত করার চেষ্টা করা উচিত। একই কাজ বারবার করে ভিন্ন ভিন্ন ফল আশা করাও মূল্যহীন। বিশেষজ্ঞ হতে হলে সে বিষয় সম্পর্কে সবকিছু জানতে হবে। আইনস্টাইন তার জীবনে যে দিকগুলোর অনুসরণ করেছেন, সেগুলো শুধু বিজ্ঞানীদের জন্যই প্রযোজ্য নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্যও শিক্ষণীয়। পেটের অ্যাবডোমিনাল অ্যাওর্টিক অ্যানিউরিজম ফেটে যাওয়ার কারণে অভ্যন্তরীণ রক্তপাতে আক্রান্ত হন তিনি। অবশেষে ১৯৫৫ সালের ১৮ এপ্রিল ৭৬ বছর বয়সে নিউ জার্সির প্রিন্সটন হাসপাতালে ঘুমের মধ্যে তার মৃত্যু হয়।
স্টিফেন উইলিয়াম হকিং : ২১ বছর বয়সে মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়েও সফল
বিখ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিদ স্টিফেন উইলিয়াম হকিং। ৮ জানুয়ারি ১৯৪২ সালে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডে তার জন্ম। তার জীবন বেশ ব্যতিক্রম আঙ্গিকে কেটেছে। ডাক্তার সময়ের ফ্রেম বেঁধে বলেছিলেন, 'তার বাঁচার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।' কিন্তু স্টিফেন হকিং সবার ধারণা ভুল প্রমাণিত করে বেঁচেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি তার শুধু মস্তিষ্ক কাজে লাগিয়ে একের পর এক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের ধারণা দিয়েছেন। লিখেছেন জনপ্রিয় সব বই। সাবমেরিনে চেপে সাগরতলে গিয়েছেন। অনুভব করেছেন মহাশূন্যের ওজনশূন্যতা। উপস্থাপনা করেছেন প্যারা অলিম্পিকের মতো আসরের। তার লিখিত বই 'ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম' প্রকাশিত হওয়ার পর বিজ্ঞানমহলের বাইরেও তিনি জনপ্রিয় হন। আন্তর্জাতিকভাবে বেস্টসেলার হিসেবে বইটির কোটি কপি বিক্রি হয়। তাকে নিয়ে রচিত হয় বহু গ্রন্থ, তৈরি হয় চলচ্চিত্র। মোটর নিউরন রোগে তার পুরো শরীর পক্ষপাতগ্রস্ত হয়ে যায়। এরপর তিনি যেভাবে বিজ্ঞানজগতে রাজত্ব করলেন, তা আসলেই বিস্ময়কর। স্টিফেন হকিংয়ের আরেকটি বই 'মাই ব্রিফ হিস্ট্রি'। এ আত্মস্মৃতিগ্রন্থে তিনি তার বেড়ে ওঠা, শৈশব, বিয়ে, সন্তান এবং শেষবেলা সম্পর্কে বলেছেন। বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং আত্মস্মৃতি বলার ফাঁকে ফাঁকে পদার্থবিজ্ঞানও পড়িয়েছেন। বইটির কলেবরে বিজ্ঞানীর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া মহাবিস্ফোরণ, মহাকর্ষীয় তরঙ্গ, কৃষ্ণগহবরের মতো বিষয়গুলো সহজাতভাবে উঠে এসেছে। স্টিফেন হকিং কেমব্রিজে পড়ার সময় বুঝতে পারেন, মোটর নিউরন রোগে আক্রান্ত তিনি। শুরু হয় অন্যজীবন। এ জীবনযুদ্ধে তিনি হার মানেননি। একসময় যুক্তরাজ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালটেকে চলে যান। এরইমধ্যে তার হুইলচেয়ার জীবনের চার বছর পেরোয়। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনও তার গবেষণায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। একসময় স্যার আইজ্যাক নিউটন ও পল ডিরাকের মতো বিজ্ঞানীদের উত্তরসূরি হিসেবে গণিতের লুকাসিয়ান প্রফেসর নির্বাচিত হন। তিনি যে হুইল চেয়ারে বসতেন এবং যে ভয়েস-সিন্থেসাইজারের সাহায্যে কথা বলতেন, সে বিষয়েও লিখেছেন। এ সীমিত জীবনে স্টিফেন হকিং সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়েছেন সাতবার, জাপানে গিয়েছেন ছয়বার, চীনে গিয়েছেন, অস্ট্রেলিয়া বাদে প্রতিটি মহাদেশে গিয়েছেন। শুধু একাগ্রতা, অদম্য চিন্তাশক্তির কারণে তা সম্ভব হয়েছে। স্টিফেন হকিংয়ের মতো অদম্য মানুষ পৃথিবীতে ছিলেন বলেই হয়তো পিছিয়ে পড়া মানুষজন আশা সঞ্চার করে আবার জেগে ওঠে। স্টিফেন হকিং নিজেই বলেছেন, মাত্র ২১ বছর বয়সে আমি মোটর নিউরন রোগে আক্রান্ত হই। তখন মনে হয়, এটা এক বড় ধরনের অবিচার। কেন এটা আমার জীবনেই ঘটবে? সে সময় ধরেই নিলাম, আমার জীবন আসলে শেষ। আমার ভেতরে যে অমিত সম্ভাবনা লুকিয়েছিল, তা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি। কিন্তু ৫০ বছর পর এখন নিজের জীবন নিয়ে আমি খুবই তৃপ্ত। আমার আছে গুণী তিন সন্তান। বৈজ্ঞানিক কর্মক্ষেত্রেও পেয়েছি সফলতা। ৭৬ বছর বয়সে ১৪ মার্চ ২০১৮ সালে তার মৃত্যু হয়।