প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট
অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট মার্কিন নকশাকার, সাময়িকী সম্পাদক ও উড়োজাহাজ চালিয়ে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেওয়া প্রথম নারী বৈমানিক। ১৯৩৭ সালে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে নিরুদ্দেশ হয়ে যান তিনি। এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৩৭ সালে দুই ইঞ্জিনের একটি ক্ষুদ্র উড়োজাহাজ নিয়ে সহযোগী ফ্রেড নুনানকে নিয়ে তিনি পৃথিবী পরিক্রমণে বেরিয়েছিলেন। বিষুবরেখার কাছাকাছি অঞ্চল দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় নিখোঁজ হয় তার উড়োজাহাজ। এরপর থেকে অ্যামেলিয়া, ফ্রেড ও ওই উড়োজাহাজের কোনো খোঁজ মেলেনি। অ্যামেলিয়ার ভাগ্যে কী ঘটেছিল, তা আর কখনোই জানা যায়নি। সে সময় উড়োজাহাজটির কোনো ধ্বংসাবশেষও পাওয়া যায়নি। ২০১৪ সালে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র কিরিবাতির সৈকতে পাওয়া কিছু ধ্বংসাবশেষ অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্টের বিমানটির বলে ধারণা করেছেন গবেষকেরা। ১৯৩৭ সালে লকহিড ইলেক্ট্রা টেন ই বিমান নিয়ে পৃথিবী ভ্রমণে বের হন মার্কিন নারী বৈমানিক অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট। তার সঙ্গে ছিলেন নাবিক ফ্রেড নুনান। অ্যামেলিয়া অবশ্য এর আগেই বিশ্বখ্যাতি পেয়েছিলেন প্রথম নারী বৈমানিক হিসেবে একাকী আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে। এরপরই তিনি পৃথিবীর চারপাশে চক্কর দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। বিষুবরেখা বরাবর পূর্বদিকগামী তার যাত্রাপথের মোট দৈর্ঘ্য ছিল ২৯,০০০ মাইল। ১৯৩৭ সালের মার্চে বিমানে সমস্যার কারণে অ্যামেলিয়ার প্রথমবারের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। বিমান ঠিক করে একই বছরের ২১ মে নাবিক নুনানকে সঙ্গে নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার অকল্যান্ড থেকে যাত্রা শুরু করেন তিনি। ৪০ দিনে মোট ২০ জায়গায় যাত্রা বিরতি দিয়ে অ্যামেলিয়া ও নুনান ২২ হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে পাপুয়া নিউগিনির পূর্ব উপকূলের লায়ে নামক স্থানে এসে পৌঁছান। এরপর ২ জুলাই সকালে তারা দুজন সফরের সবচেয়ে কঠিনতম পথে যাত্রা শুরু করেন। তাদের গন্তব্য ছিল লায়ের মূল ভূখণ্ড থেকে ২৫০০ মাইল দূরে মধ্য প্রশান্ত সাগরে ১.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রবালদ্বীপ হাউল্যান্ড।
এ দ্বীপে যাত্রাবিরতি করে পুনরায় বিমানের জ্বালানি ভর্তি করার কথা ছিল ইয়ারহার্ট ও নুনানের। সে লক্ষ্যে তারা দুজন এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তাদের পথ দেখাতে সাহায্য করছিল ইটাস্কা নামের এক জাহাজ। ইয়ারহার্ট ও জাহাজের নাবিক রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে যোগাযোগ রেখে উভয়ে হাউল্যান্ড দ্বীপের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। কয়েক ঘণ্টার যাত্রা শেষে ইয়ারহার্ট ও নুনান যখন দ্বীপের নিকটবর্তী হন, তখন নিয়মিত জাহাজের নাবিককে রেডিও সিগনাল পাঠাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে সিগনাল অনেক জোরালো হয়ে এলে জাহাজের রেডিও সিগনাল অপারেটর দৌড়ে ডেকে আসেন। এরপর তিনি আকাশের চতুর্দিকে ইয়ারহার্টের বিমান খুঁজতে থাকেন। কোনো কিছু দেখতে না পেয়ে তিনি বিমানে একের পর এক সিগনাল পাঠাতে থাকেন। কিন্তু তার কোনোটাই আর ইয়ারহার্ট ও নুনান পর্যন্ত পৌঁছায়নি। এমনকি ইয়ারহার্টের লকহিড ইলেক্ট্রাও হাউল্যান্ড দ্বীপে পৌঁছায়নি। ব্যাপক অনুসন্ধানের পরও ইয়ারহার্ট, নুনান কিংবা বিমানের কোনো একটি অংশও খুঁজে পাওয়া যায়নি। দুই সপ্তাহের অনুসন্ধান শেষে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়, অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট এবং ফ্রেড নুনান বিমানসহ সাগরে বিধ্বস্ত হয়ে হারিয়ে গেছেন।
তাদের ধারণামতে, ইয়ারহার্ট জাহাজের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে ব্যর্থ হন। ফলে দিক ভুলে তারা অন্যদিকে চলে যান। একপর্যায়ে বিমানের তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় তা প্রশান্ত মহাসাগরে বিধ্বস্ত হয়ে যায়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এ ঘোষণায় কেউ আস্থা রাখতে পারেননি। আবার কেউ ইয়ারহার্ট ও নুনানের অন্তর্ধান রহস্যও ভেদ করতে পারেননি। তাদের দুজনের ভাগ্যে আসলে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে আজও অনুসন্ধান চলছে। বিভিন্নজন বিভিন্ন তত্ত্ব দিয়েছেন। ইয়ারহার্টকে নিয়ে লেখা হয়েছে বিভিন্ন বই। তৈরি হয়েছে একাধিক সিনেমা।
গ্লেন মিলার
আমেরিকান জ্যাজ সঙ্গীতশিল্পী এবং ব্যান্ডলিডার গ্লেন মিলারের ১৯৪৪ সালে রহস্যময় অন্তর্ধান বিশ্ব ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত অমীমাংসিত রহস্যগুলোর অন্যতম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তার প্লেনটি ইংল্যান্ড থেকে ফ্রান্স যাওয়ার পথে ইংলিশ চ্যানেলের ওপর দিয়ে উধাও হয়ে যায়। এ ঘটনার কোনো ধ্বংসাবশেষ বা নিশ্চিত প্রমাণ না মেলায় বিভিন্ন তত্ত্ব ও গুজব ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর কুয়াশাচ্ছন্ন এক বিকেলে মিলার নরম্যান বেসেল এবং পাইলট জন মরগানকে নিয়ে একটি একক-ইঞ্জিনের নোডুইন ইউসি-৬৪ নরসম্যান প্লেনে ওঠেন। মিলার সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে তার সফরের বিষয়ে কোনো তথ্য দেননি। তার এ অননুমোদিত যাত্রা তার সামরিক আদেশের লঙ্ঘন ছিল। বিমানটি তার গন্তব্যে পৌঁছায়নি। এর কোনো চিহ্ন বা যাত্রীদের অবশেষ কখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। অন্তর্ধানের পেছনের সম্ভাব্য তত্ত্ব হিসেবে বলা হয়— কার্বুরেটরের বরফ জমে গিয়েছিল। এটি সবচেয়ে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৪৫ সালে অষ্টম বিমান বাহিনীর তদন্তে জানা যায়, প্লেনটি পাইলটের ভুল, যান্ত্রিক ত্রুটি এবং খারাপ আবহাওয়ার কারণে বিধ্বস্ত হয়েছিল। তাদের যুক্তি হলো, সেদিনটি ছিল প্রচণ্ড ঠান্ডা। বিমানের কার্বুরেটরে বরফ জমার কারণে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক ঘটনা ছিল। এ ছাড়া ধারণা করা হয়, মিত্রবাহিনীর ভুলবশত আক্রমণ ছিল। এ তত্ত্ব অনুযায়ী, মিলারের প্লেনটি মিত্রবাহিনীর একটি বোমা বর্ষণের শিকার হয়েছিল। কারণ, অনেক সময় বোমা ফেলার পর প্লেনগুলো অতিরিক্ত বোমা নিরাপদে সাগরে ফেলে দিত। মিলারের ছোট প্লেনটি সম্ভবত ওইসব বোমার আঘাতে বিধ্বস্ত হয়েছিল। তবে মিলার জীবনীকার ডেনিস স্প্র্যাগ এ তত্ত্বকে জোরালোভাবে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, এ ধরনের বোমা বর্ষণের কারণে দুর্ঘটনা ঘটার কোনো সম্ভাবনা ছিল না।
এ ছাড়া ধারণা করা হয়, গুপ্তচরবৃত্তি ছিল তার অন্তর্ধানের পেছনের মূল কারণ। এ তত্ত্বটি অনুযায়ী মিলার কেবল একজন সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন না, বরং একজন গুপ্তচরও ছিলেন। তিনি জার্মানিতে নাৎসিবিরোধী প্রচারণার জন্য ব্রিটিশ অভিনেতা ডেভিড নিভেনের সঙ্গে কাজ করতেন। এ তত্ত্বের প্রবক্তারা দাবি করেন, এ কাজ কেবল মিডিয়া সম্পর্কিত ছিল না, বরং গুপ্তচরবৃত্তির সঙ্গেও যুক্ত ছিল। গ্লেন মিলারের অন্তর্ধানের ৮০ বছর পরও এর আসল কারণ নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা রয়ে গেছে। তবে তদন্তকারীদের মতে, সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য কারণ হলো ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণে বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটি। যেহেতু প্লেনের কোনো ধ্বংসাবশেষ বা মরদেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি, তাই রহস্য পুরোপুরি অমীমাংসিতই থেকে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিখোঁজ হওয়া হাজার হাজার সৈনিকের মধ্যে তিনিও একজন, যার ভাগ্যে কী ঘটেছে তা আজও অজানা। অনেকের ধারণা, ওই সময় একটি বাহিনীর প্রশিক্ষণ চলছিল। তাদের প্রশিক্ষণ বোমার আঘাতে হয়তো উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হতে পারে। তবে এ রহস্য এখনও উন্মোচিত হয়নি।
হ্যারল্ড হল্ট
অস্ট্রেলিয়ার ১৭তম প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড হল্ট। ১৯৬৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর সকালে পোর্ট সির শেভিওট সৈকতে সাঁতার কাটতে গিয়ে আর ফেরেননি। আজ পর্যন্ত তার সন্ধান মেলেনি। উদ্ধার হয়নি তার মরদেহ। টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেকের ধারণা ছিল, হ্যারল্ড হল্ট আত্মহত্যা করেছেন বা হাঙরের হামলায় তার মৃত্যু হয়েছে। কেউ কেউ ধারণা করেছিলেন, চীনের সাবমেরিন বা সিআইএ তাকে হত্যা করতে পারে। রহস্য উন্মোচিত না হলেও ২০০৫ সালে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা আছে, যেগুলো সময়ের পরিক্রমায় কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড এডওয়ার্ড হোল্টের রহস্যময় মৃত্যু এমনই ঘটনা। আজও তার মৃত্যু ঘিরে রহস্য, কৌতূহল ও ষড়যন্ত্রতত্ত্বের ঘন জাল ছিন্ন হয়নি। হ্যারল্ড হোল্ট ৫ আগস্ট ১৯০৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আইনবিদ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং পরে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৩৫ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ধীরে ধীরে লিবারেল পার্টির অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হয়ে ওঠেন। ১৯৬৬ সালে স্যার রবার্ট মেনজিসের অবসর নেওয়ার পর তিনি অস্ট্রেলিয়ার ১৭তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে হোল্ট ছিলেন জনপ্রিয়, উদারমনস্ক ও সংস্কারপন্থী। তিনি অস্ট্রেলিয়াকে ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্ত রাখলেও সমাজের ভেতরে কিছু মানবিক সংস্কারমূলক নীতি গ্রহণ করেছিলেন। সেদিন ছিল রোববার। হ্যারল্ড হোল্ট ভিক্টোরিয়া প্রদেশের পোর্টসিয়ার কাছে চিভিয়ট বিচে যান তার বন্ধুদের সঙ্গে। এ সৈকতটি ছিল তার প্রিয় সাঁতারস্থল। যদিও এটি ছিল অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক সৈকতগুলোর একটি। প্রচণ্ড ঢেউ ও স্রোতের জন্য কুখ্যাত। দুপুরে তিনি ঢেউয়ের মধ্যে সাঁতার কাটতে নামেন। সহযাত্রীরা তাকে ঢেউয়ের নিচে হারিয়ে যেতে দেখেন। তারা অনেক খোঁজাখুঁজির পর উদ্ধারদলকে খবর দেন। কিন্তু পরবর্তী কয়েকদিন ধরে নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবীদের বিশাল অভিযান সত্ত্বেও কোনো মৃতদেহ বা ব্যক্তিগত সামগ্রী পর্যন্ত উদ্ধার করা যায়নি।
অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে এটি ছিল সবচেয়ে বড় উদ্ধার অভিযান। শত শত মানুষ অংশ নিলেও ফলাফল শূন্য। অবশেষে ১৯৬৮ সালে সরকারি তদন্ত শেষে ঘোষণা করা হয়। হ্যারল্ড হোল্ট সাঁতারের সময় দুর্ঘটনাবশত ডুবে মারা গেছেন। তবে যেহেতু দেহ কখনও পাওয়া যায়নি, তাই সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে পারেনি, এটি নিছক দুর্ঘটনা। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি একটি প্রবল স্রোতের কারণে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা। কারণ, চিভিয়ট বিচের সমুদ্র অত্যন্ত বিপজ্জনক, সেখানে অনেক অভিজ্ঞ সাঁতারুও মারা গেছেন। তাই সম্ভবত হোল্ট প্রবল ঢেউ ও রিফ কারেন্টে আটকে গিয়ে সাগরে তলিয়ে যান। স্রোত তার দেহ গভীরে টেনে নিয়ে যায়। হ্যারল্ড হোল্টের মৃত্যুর পর অস্ট্রেলিয়া শোকাহত হয়। হঠাৎ প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যু সরকারকে অচল করে ফেলে। তার স্থলাভিষিক্ত হন জন ম্যাকইউয়েন। পরবর্তীতে হোল্টের স্মৃতিতে নির্মিত হয় 'হ্যারল্ড হোল্ট মেমোরিয়াল সুইমিং সেন্টার'। যা একধরনের রসিক ব্যঙ্গের মতো শোনালেও তার জনপ্রিয়তার প্রতীক হিসেবে প্রসিদ্ধি পায়।
জিম থিম্পসন
বিশ্ব ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা আছে, যেগুলো সময়ের পরিক্রমায় সত্য ও কল্পনার সীমা মুছে দিয়েছে। ১৯৬৭ সালে থাইল্যান্ডের 'সিল্ক কিং' নামে পরিচিত জিম থম্পসনের নিখোঁজ হওয়া এমনই একটি রহস্য, যা আজও সমাধান হয়নি। একজন মার্কিন স্থপতি, উদ্যোক্তা ও সাবেক গুপ্তচর ছিলেন তিনি। যিনি হঠাৎ মালয়েশিয়ার পাহাড়ে হাঁটতে গিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। কীভাবে, কেন এবং কার কারণে— এ প্রশ্নগুলোর উত্তর অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে অধরাই রয়ে গেছে। জেমস হ্যারিসন উইলসন থম্পসন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্যবিদ্যায় পড়াশোনা করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব স্ট্রেটেজিক সার্ভিস (ওএসএস)-এ যোগ দেন; যা পরবর্তীতে সিআইএ-এর ভিত্তি হয়ে ওঠে। যুদ্ধ শেষে তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে থাইল্যান্ডে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি থাই সিল্ক শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করেন এবং 'থাই সিল্ক কোম্পানি' প্রতিষ্ঠা করে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন। অল্প সময়েই তিনি থাই সমাজে এক প্রভাবশালী ও সাংস্কৃতিক প্রতীক হয়ে ওঠেন।
২৬ মার্চ ১৯৬৭ জিম থম্পসন ১৯৬৭ সালের মার্চ মাসে বন্ধুদের সঙ্গে মালয়েশিয়ার ক্যামেরন হাইল্যান্ডসে বেড়াতে যান। দুপুরে একা পাহাড়ি পথে হাঁটতে বের হন, তারপর আর ফেরেননি। সেনা, পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবক ও ট্র্যাকারদের সমন্বয়ে বিশাল অনুসন্ধান অভিযান চলে। কিন্তু কোনো দেহ, পোশাক বা বস্তু পাওয়া যায়নি। এটি হয়ে ওঠে মালয়েশিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অনুসন্ধান অভিযান; কিন্তু ফলাফল শূন্য। ১৯৬৭ সালের অনুসন্ধানে প্রযুক্তিগত ঘাটতি, রাজনৈতিক সহযোগিতার অভাব ও প্রমাণ সংরক্ষণের দুর্বলতা ছিল। ১৯৭০-৮০-এর দশকে মাঝে মাঝে 'মানব হাড়' বা 'পোশাক' পাওয়া গেছে বলে খবর আসে; কিন্তু কোনোটি থম্পসনের বলে প্রমাণিত হয়নি। ২০১৭ সালে নিখোঁজের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া উভয় সরকার একে 'অমীমাংসিত দুর্ঘটনা' বলে ঘোষণা করে। ব্যাংককে তার নির্মিত 'থম্পসন হাউজ' একটি আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্র। তার নাম থাই সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। একজন মার্কিন নাগরিক হয়েও তিনি থাই ঐতিহ্য সংরক্ষণে যে অবদান রেখেছেন, তা ইতিহাসে অমর।
মাইকেল রকফেলার
১৯৩৮ সালে আমেরিকার তৎকালীন সবচেয়ে ধনী পরিবারে মাইকেল রকফেলারের জন্ম। তার বাবা ছিলেন নিউ ইয়র্কের তৎকালীন মেয়র নেলসন রকফেলার। পাঁচ সন্তানের মধ্যে মাইকেল ছিল সবার ছোট। তার দাদা জন রকফেলার ছিলেন স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানির কর্ণধার; যিনি সর্বপ্রথম আমেরিকান বিলিয়নিয়ার। ১৯৬০ সালে মাইকেল রকফেলার হার্ভার্ড থেকে পড়াশোনা শেষ করে। তার বাবা চাইছিলেন, সে যেন এবার দাদার বিশাল সাম্রাজ্য দেখাশোনায় মনোযোগ দেয়; কিন্তু রকফেলারের চিন্তা ছিল ভিন্ন। বংশের অন্যান্যদের তুলনায় কিছুটা শান্ত স্বভাবের মাইকেল ছিল সাহিত্য আর শিল্পমনা। স্যুট-টাই পরে রকিং চেয়ারে বসে দোল খাওয়ার চেয়ে অ্যাডভেঞ্চারকেই বেছে নিল সে। তার বাবা ছিলেন আর্টের বিশেষ ভক্ত। ফলে তিনি বিভিন্ন সভ্যতার দর্শনীয় বস্তু সংগ্রহ করতেন। তারই ধারাবাহিকতায় নিউইয়র্কে তিনি 'প্রাইমেটিভ আর্টের' আস্ত মিউজিয়াম খুলে বসেন এবং সেগুলো প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেন। বিশেষ করে, নাইজেরিয়া ও মায়ান সভ্যতার নানা নিদর্শন সেখানে স্থান পেয়েছিল। বাবার শখ ছেলের কাছে পেশা হয়ে ধরা দেয়। মাইকেল রকফেলার চেয়েছিল তার বাবার সংগৃহীত জিনিসের বাইরে সম্পূর্ণ নতুন কিছু সংগ্রহ করতে, যেগুলো নিউ ইয়র্ক আগে কখনও দেখেনি। রকফেলার বাবার মিউজিয়ামে বোর্ড মেম্বার হিসেবে জায়গা করে নেয়। তারপর হার্ভার্ডের পরিচিত এক নৃতাত্ত্বিক এবং ডাচ মিউজিয়ামের জাতিতত্ত্বের একজন এক্সপার্টসহ রওনা হয় সে। গন্তব্য নিউ গায়ানার একটি দ্বীপ। এখানে 'অসমত' নামে একটি আদিবাসীগোষ্ঠীর বসবাস। বহুদিন ধরে এ দ্বীপে ডাচ কর্তৃপক্ষ ও মিশনারীরা নিয়মিত যাতায়াত করছে। কিন্তু অসমতদের ভেতর অনেকেই কখনও সাদা চামড়ার মানুষ দেখেনি। তারা মনে করত, তাদের দ্বীপটি কোনো এক শক্তি ঘিরে রেখেছে, যেখানে যাতায়াত সম্ভব নয়। তাই তারা যখন কোনো সাদা চামড়ার মানুষকে আসতে দেখল, স্বভাবতই তাদের অতিপ্রাকৃত প্রাণী হিসেবে ধরে নিল। রকফেলার ও তার টিম অসমতদের বড় একটি সম্প্রদায় 'অসজানেপ'দের পাড়ায় প্রবেশ করল। তারা খুবই মুগ্ধ ও মোহাবিষ্ট হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয়রা যে তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে, সেটা ভুলে গেল। সাদা চামড়ার প্রাণীগুলো তাদের কাছে এগিয়ে গেল। পরিচিত হওয়ার চেষ্টা চালাল। যদিও তারা আগন্তুকদের খুব একটা ভালো চোখে দেখছিল না। রকফেলার যখন তাদের ছবি তুলতে চাইল, তারা তাতে আনন্দের সঙ্গেই রাজি হয়ে গেল। কিন্তু তাদের ধর্মীয় কিংবা সামাজিক রীতি পালনের জায়গাগুলোতে মাইকেল ও তার টিমকে যেতে দেওয়া হলো না। কিন্তু এগুলোর জন্যই তারা এতদূর এসেছিল। সেই সময়গুলোতে অসমতরা ছিল সভ্যজগতের নিয়মনীতি থেকে অনেক দূরে। নিজেদের উদ্ভট আইন আর গ্রামকেন্দ্রিক যুদ্ধগুলোই ছিল তাদের সময় কাটানোর একমাত্র উপায়। বিপক্ষ সৈনিকদের মাথা আলাদা করে ফেলত তারা। তাদের মাংস ঝলসে খেত। ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিগুলোতে যৌনতার মতো ব্যাপারগুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। তবে তাদের স্বকীয়তা মাইকেল ও তার টিমকে বিমোহিত করে ফেলেছিল। মাইকেল তার ডায়েরিতে লেখে, 'আমি যতটুকু আশা করেছিলাম, এ জায়গাটি এবং এর মানুষগুলো তার চেয়েও বেশি কিছু।' রকফেলার ও তার সঙ্গীরা সেখান থেকে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে সেটা আরও বড় পরিসরে গবেষণা চালানোর জন্য, এদের সম্পর্কে আরও বেশি জানার তৃষ্ণা তাদের মাঝে পেয়ে বসেছিল।
তার আড়ালে নিউইয়র্ককে 'একেবারে ভিন্ন কিছু' দেখানোর স্বপ্নটা মাইকেলের মনে তখনও ঘুরপাক খাচ্ছিল। ১৯৬১ সালে সে আবারও নিউ গায়ানার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। এবার তার সঙ্গে ছিল সরকারি এক নৃতাত্ত্বিক রেনে ওয়াশিং। তারা যখন অসমতদের দ্বীপ থেকে মাত্র ১২ মাইল দূরে, তখনই সমুদ্র হঠাৎ উত্তাল হয়ে ওঠে। তাদের নৌকাটি একটা জায়গায় আঁটকে পড়ে। তা ছাড়া ঝড়ের কবলে পড়ে তাদের অবস্থাও হয়ে পড়েছিল দেখার মতো। রেনেকে রেখে মাইকেল সাঁতরে সাগর পাড়ি দেওয়ার চিন্তা করে। রেনের সতর্কবাণী কানে না নিয়েই সে পানিতে ঝাঁপ দেয়। এরপর রেনে মাইকেলকে আর ভেসে উঠতে দেখেনি। খবর পেয়ে ডাচ কর্তৃপক্ষ রেসকিউ টিম পাঠায়। নেলসন রকফেলার ছেলের খোঁজ করতে বিমান, হেলিকপ্টার আর জাহাজের ব্যবস্থা করেন। ডাচ কর্তৃপক্ষ পুরো এলাকা তন্ন-তন্ন করে খুঁজেও মাইকেল রকফেলারের কোনো চিহ্ন পেল না। এভাবে বেশ কিছুদিন খোঁজার পর ডাচরা তাদের হাল ছেড়ে দেয়। তারপরও ছেলেকে খুঁজে পাওয়ার ক্ষীণ আশা থেকে নেলসন আরও কিছুদিন খোঁজ চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন। তাতে রাজি হয়ে ডাচরা প্রায় ১০ দিন খোঁজার কার্যক্রম পরিচালনা করে। অবশেষে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। এদিকে পত্রিকাগুলোর শিরোনামজুড়ে কেবল মাইকেল রকফেলারের মৃত্যুসংবাদ। তার মৃত্যু নিয়ে নানা গুজব ছড়াতে থাকে তারা। কেউ বলতে থাকে, আমেরিকার সবচেয়ে ধনী ঘরের সন্তানকে কুমিরে খেয়েছে। আবার কারো মতে, সে এত প্রতিপত্তি আর বিলাসিতা থেকে আড়াল হতে সেখানে সন্ন্যাস জীবন শুরু করেছে। কিন্তু ডাচ কর্তৃপক্ষ এসব গুজবকে নাকচ করে দেয়। এটাকে স্রেফ মৃত্যু বলেই প্রচার করে তারা। যে যা-ই বলুক, সবার প্রশ্ন একটাই, কীভাবে জলজ্যান্ত একটা মানুষ চোখের সামনে থেকে উধাও হয়ে গেল!
সুভাষচন্দ্র বসু
১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট তাইওয়ানের ফরমোজা দ্বীপে বিমান দুর্ঘটনায় ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নেতা সুভাষ চন্দ্র বসু মারা যান বলে ধারণা করা হয়। এ দুর্ঘটনায় তার শরীর মারাত্মকভাবে পুড়ে গিয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়। তবে তার মৃত্যু নিয়ে এখনও বিভিন্ন বিতর্ক ও রহস্য রয়ে গেছে। অনেকে এ তত্ত্বটি মেনে নেন না। কিছু বিকল্প তত্ত্বের একটি হলো, তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের কোনো জেলখানায় ব্রিটিশদের জিজ্ঞাসাবাদের সময় মারা যান। অন্য আরেকটি তত্ত্ব বলে, তিনি বিমান দুর্ঘটনায় মারা যাননি, বরং আত্মগোপনে ছিলেন। তার মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে রহস্য ও গুজব তৈরি হয়েছে, যা এখনও কিছু মানুষের মনে বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়নি। এদিকে তার পরিবারের সদস্যদের দাবি, ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট তাইওয়ানে কোনো বিমান দুর্ঘটনাই ঘটেনি। এ কারণে তারা তার অন্তর্ধান রহস্য উন্মোচনসহ একগুচ্ছ দাবি তুলেছেন। এ বিষয়ে তার নাতি আর্য বসু বলেন, 'আমরা কেউই বিশ্বাস করি না, বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়েছে।' বিমান দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে গান্ধিজির মত নিয়ে আর্য বসু বলেন, 'যদি তিনি এ তথ্য বিশ্বাস করতেন, তাহলে খবর প্রকাশের পর আমাদের বাড়িতে গাড়ি পাঠিয়ে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করতে নিষেধ করতেন না।' সে বছরের ডিসেম্বরে দমদম জেলে রাজনৈতিক বন্দিদের সঙ্গে দেখা করতে যান মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি। সে সময়ে নেতাজির মৃত্যু নিয়ে তাকে প্রশ্ন করা হয়। তিনি বলেন, 'সুভাষচন্দ্রের মৃতদেহের ছবিও যদি কেউ দেখায়, তবু আমি বিশ্বাস করব না, তিনি মারা গেছেন।' গান্ধিজির সেক্রেটারি ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্নেহধন্য লুই ফিসারকে লিখেন, 'সোভিয়েতের সাহায্য নিয়ে সুভাষ দেশে ফিরলে গান্ধি কিংবা কংগ্রেস পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পারবেন না।' সুভাষ বসু যদি বেঁচে না থাকতেন, তাহলে তার দেশে ফেরার বিষয়ে আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্টের স্নেহধন্য লুই ফিসারকে এ চিঠি লিখবেন কেন? প্রশ্ন তোলেন আর্য বসু। লুই ফিসারের এ তথ্য ১৯৯০ সালের পরে সামনে এসেছিল। যে কারণে গান্ধিও বিশ্বাস করতেন না, নেতাজির বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে। নিশ্চয় গান্ধিজির কাছে নেতাজির বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য ছিল; ধারণা আর্য বসুর। গবেষক সৈকত নিয়োগী বলেন, 'বিমান দুর্ঘটনার কোনো গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই তাইওয়ান রিপোর্টে। যে রিপোর্টটা তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এলেও জনস্বার্থে প্রকাশ করেনি।'