ঢাকা রোববার, ১৭ মে ২০২৬, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

চট্টগ্রামে মসলার বাজারে সংকট নেই

চট্টগ্রামে মসলার বাজারে সংকট নেই

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের মসলার বাজারগুলোতে শুরু হয়েছে এক অন্যরকম ব্যস্ততা। কোরবানিকে সামনে রেখে আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে দেশের পাইকারী, খুচরা আরদাররা। একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে দেশের বৃহত্তম পাইকারী বাজার খাতুনগঞ্জে। ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী বর্তমানে দেশে মসলার বাজারে কোনো সরবরাহ সংকট নেই। আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, নিয়মিত আমদানি এবং পর্যাপ্ত মজুদের কারণে বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। ইন্দোনেশিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ও ভারত থেকে নিয়মিত চালান আসছে। এ কারণে পাইকারি বাজারে মসলার দাম স্থিতিশীল আছে। কিন্তু সেই দামের তুলনায় খুচরা বাজারে দাম অনেক বেশি।

চট্টগ্রামের প্রধান পাইকারি বাজার চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের সঙ্গে নগরীর খুচরা বাজারের দামের তুলনায় দেখা গেছে, অনেক পণ্যের দাম খুচরায় প্রায় দ্বিগুণ। পাইকারিতে ৭৫০ টাকার জায়ফল খুচরায় বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ টাকায়। দারুচিনি পাইকারিতে ৩৫০ থেকে ৪৪০ টাকা হলেও খুচরায় ৬০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। একইভাবে ১ হাজার ২০ টাকার গোলমরিচ খুচরায় ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এলাচ, জিরা, হলুদ ও মরিচের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। খাতুনগঞ্জে ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৩০০ টাকার এলাচ খুচরা বাজারে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাইকারিতে ১৮০ টাকার হলুদ খুচরায় ৩০০ টাকা এবং ২৩০ টাকার শুকনা মরিচ ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারি বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল থাকলেও খুচরা বাজারে লাগামহীন মুনাফা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তারা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে সাধারণ মানুষের জন্য ঈদের বাজার আরও চাপের হয়ে উঠবে। এদিকে চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ১২ ধরনের মসলা আমদানি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫৩ হাজার ৫৬০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি এসেছে রসুন, আদা ও দারুচিনি। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, কোরবানির মৌসুমি চাহিদা মেটাতে বর্তমানে দেশে পর্যাপ্ত এলাচ, দারুচিনি ও জিরার মজুদ রয়েছে। লোহিত সাগর বা হরমুজ প্রণালীর সংকটের সঙ্গে মসলা আমদানির দেশগুলোর সরাসরি যোগসূত্র না থাকায় জাহাজ ভাড়া বাড়লেও তা বাজারে বড় প্রভাব ফেলবে না।

সূত্র জানায় বৈধ অবৈধ পথে আসা এলাচ, জিরা, দারুচিনি, লবঙ্গ, গোলমরিচে বাজার সয়লাব। কয়েক মাস ধরে গরম মসলার বাজার স্থিতিশীল থাকলেও গোটা মরিচের দাম বেড়েছে কেজিতে অন্তত ৫০ টাকা। তবুও ব্যস্ততা বাড়ছে অলিগলির কলঘরে, যেখানে মসলা গুঁড়া করা হয়। তবে নানা আতঙ্কও আছে ক্রেতাদের। জিরার সঙ্গে ক্যারাওয়ে বীজ মেশানোর ঘটনা ধরা পড়েছে ভোক্তা অধিকারের অভিযানে। আগে পচা নিম্নমানের মসলা গুঁড়া করার এমনকি ভুষি মেশানোর ঘটনাও ধরা পড়েছিল। দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের আড়ত, খুচরা বিক্রির জন্য প্রসিদ্ধ বকশির হাট, রিয়াজউদ্দিন বাজার এবং বিবিরহাটের মসলার দোকানগুলো ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। বিক্রেতারা বলছেন, নতুন-পুরোনো, রং, সুবাস, আকার, উৎপাদনকারী দেশ, এলসি খরচ, পরিবহন ব্যয় ও মানভেদে মসলার দাম কমবেশি হচ্ছে। বাজারে চাহিদার তুলনায় কিছু মসলার সরবরাহ বেশি। পাইকারি বাজারে দাম একটু ওঠানামা করলেও মোটামুটি স্থিতিশীল। তবে অন্যান্য বছরের মতো আশানুরূপ বেচাকেনা নেই এবার। গোটা মসলার চাহিদা কমে যাওয়ার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব। দ্বিতীয়ত মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। তৃতীয়ত বড় পরিবার ভেঙে ছোট পরিবার বেড়ে যাওয়ায় রেডিমেড বা প্যাকেটজাত মসলার দিকে ঝোঁক বাড়ছে। চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ কার্যালয়ের উপপরিচালক ড. মোহাম্মদ শাহ আলম জানান, এলাচ, জিরাসহ কিছু গরম মসলা চট্টগ্রাম বন্দরের বাইরে বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়েও আমদানি হচ্ছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ১০ মে পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে এলাচ ছাড়পত্র পেয়েছে ১ হাজার ১৫০ টন, দারুচিনি ১৩ হাজার ২৯৬ টন, লবঙ্গ ১ হাজার ৩৫০ টন, জিরা ৩ হাজার ১১৫ টন, জৈত্রিক ৩৫০ টন, জায়ফল ৩৩৬ টন, গোলমরিচ ১ হাজার ৯৫৯ টন, আদা ৪৫ হাজার ৫৩৮ টন, রসুন ৫৩ হাজার ১০১ টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এলাচ এসেছিল ১ হাজার ৮৪৬ টন, দারুচিনি ১৫ হাজার ৭৩৯ টন, গোলমরিচ ১ হাজার ৬৫৯ টন আমদানি হয়েছিল। বকশির হাটের প্রসিদ্ধ খুচরা মসলার দোকান নিউ সততা স্টোরের মালিক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ভারতের এলাচ ৪ হাজার ৮০০ টাকা, আমেরিকান এলাচ ৪ হাজার ২০০ টাকা, শ্রীলংকার স্পেশাল দারুচিনি ১ হাজার ৫০ টাকা, ভিয়েতনামের ৪৮০ টাকা, লবঙ্গ ১ হাজার ৪৮০ টাকা, ভারতের চিকন জিরা ৬২০, মিষ্টি জিরা ২২০ টাকা, বাদাম ১৯০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। তিনি জানান, ২-৩ মাস আগে ভারতের মরিচ খুচরায় বিক্রি হতো ৩৬০ টাকার এখন ৪২৫ টাকা। পাশের বিসমিল্লাহ স্টোরের মালিক জিয়াবুল ইসলাম জানান, গুয়েতেমালার এলাচ ৪ হাজার ৮০০ টাকা, লবঙ্গ ১ হাজার ৪৮০ টাকা, দারুচিনি ৫০০ টাকা, টাইগার চিকনজিরা ৬০০ টাকা, মিষ্টি জিরা ২২০-২৫০ টাকা, জৈত্রিক ২ হাজার ৯০০ টাকা, জায়ফল ৮৫০-৯০০ টাকা, সাদা গোলমরিচ ১ হাজার ৪০০ টাকা, কালো গোলমরিচ ১ হাজার ২০০ টাকা, টক আলু বোখরা ১ হাজার ৫০০ টাকা, মিষ্টি আলুবোখরা ৪৮০ টাকা, কাঠবাদাম ১ হাজার ৩০০ টাকা। খাতুনগঞ্জের সালাম ট্রেডার্সে পাইকারিতে এলাচ ৩ হাজার ৭২০ থেকে ৪ হাজার ৪০০ টাকা, চিকন জিরা ৫৩৫, মিষ্টি জিরা ১৬৩, দারুচিনি ৪১০, কালো গোলমরিচ ১ হাজার ১০, লবঙ্গ ১ হাজার ২৮০ টাকা। হামিদউল্লাহ মার্কেটের মেসার্স হাজি মোহাম্মদ ইসহাক সওদাগর নামের মসলার দোকানে এলাচ ৩ হাজার ৭৫০ থেকে ৫ হাজার টাকা, চিকন জিরা ৫২৫ থেকে ৫৩৫, মিষ্টি জিরা ১৬৫-১৭০, সাদা গোল মরিচ ১ হাজার ২২০ টাকা, কালো গোলমরিচ ১ হাজার ১০, দারুচিনি ৩৫০-৪২০, ভারতের মরিচ ৩৩৫-৩৮৫ টাকা, হাটহাজারীর মরিচ ৪০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। খাতুনগঞ্জের ফারুক ট্রেডার্সের মালিক ফারুক আহমদ জানান, ভারতের কম ঝালের মরিচ ৩৯০ টাকা, ঝাল মরিচ ৩৪০ টাকা। হাটহাজারীর মরিচ ৪০০ টাকা। দেশি গোটা হলুদ ১৮০ টাকা, ভারতের ২১৫ টাকা, দেশি গোটা ধনিয়া মানভেদে ১২০-১৫০ টাকা। বাংলাদেশ পাইকারি গরম মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সহ-সভাপতি অমর কান্তি দাশ জানান, পাইকারি বাজারে মসলার সরবরাহের তুলনায় ক্রেতা নেই। বিশেষ করে চোরাচালানের মসলার কারণে বৈধ আমদানিকারকদের লোকসান হচ্ছে, ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। এলাচের দাম বেশি হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এলাচের ব্যবহার বহুমুখী। ওষুধ থেকে শুরু করে মাংস, চা, বিস্কুটসহ বিভিন্ন খাবারে এলাচের ব্যবহার বাড়ছে। মধ্যবিত্তের প্রিয় মসলা হচ্ছে জিরা।

তিনি জানান, ছোট আকারের এলাচ ৩ হাজার ৭০০ টাকা, বড় আকারের এলাচ ৪ হাজার টাকা এবং লবঙ্গ ১ হাজার ২৬০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা বিক্রি করছি আমরা। মেসার্স বাচা মিয়া সওদাগরের ম্যানেজার জানান, এবার কোরবানির চাহিদা মেটাবে দেশি পেঁয়াজ। পাবনা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, কুষ্টিয়াসহ উত্তরবঙ্গ থেকে প্রচুর পেঁয়াজ আসছে। মানভেদে ৩২ টাকা থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে আড়তে। জাহেদা ট্রেডার্সে চীনা আদা বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকা, চীনা রসুন ১১০ টাকা এবং দেশি রসুন ৩৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে পাইকারিতে। বড় পরিবারের কোরবানির জন্য বেশি মসলার প্রয়োজন। তারা অনেকেই খাতুনগঞ্জের আড়ত বা বড় দোকান থেকে এসব মসলা সংগ্রহ করেন। পীতাম্বর শাহ নামের বিখ্যাত দোকানটি থেকে মরিচ কিনতে এসেছিলেন চকবাজারের সাঈদুল ইসলাম ইসলাম।

তিনি জানান, দুই গরুর কোরবানির জন্য অনেক মসলা দরকার হয়। তাই আগেভাগে পাইকারি দোকান থেকে দেখেশুনে মসলা কিনি আমরা। খোলা মসলার গুঁড়োতে ভেজাল মেশানোর ভয় থাকে। প্যাকেট মসলার আবার দাম বেশি। তাই গোটা মসলা কিনে ধুয়ে মুছে রোদে শুকিয়ে কলঘরে এসব মসলা গুঁড়া করে রাখি কোরবানির জন্য। কিছু মসলা বেশ কয়েক মাস চলে যায়। ভালোমানের ভারতের মরিচ নিয়েছি ৪১০ টাকা আর হাটহাজারীর মরিচ ৪৫০ টাকা। মরিচ যদি ভালো না হয় রান্না তো হবে না। নগরের অলিগলির কলঘরে বাড়ছে ব্যস্ততা। মোমিন রোডের আল নূর ফ্লাওয়ার মিলের মরিচ মসলা গুঁড়া করতে কেজিপ্রতি নেওয়া হচ্ছে ৪০ টাকা, চাল, ডাল, গম গুঁড়া করতে ২৫ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এখানে গুঁড়া করা মরিচের কেজি ৬৪০ টাকা, হলুদ ৪৬০, ধনিয়া ৪৪০, জিরা ২৫০ গ্রাম ৩৫০ টাকা বিক্রি হয়। মুরাদপুরের বিবিরহাট, বহদ্দারহাট, রিয়াজউদ্দিন বাজারসহ বেশ কিছু এলাকায় গুড়ো মসলার বড় বড় দোকান গড়ে উঠেছে। বিবিরহাটের ১৯৬৮ সাল থেকে ব্যবসা করছে হরিণ মার্কা মসলা। ধনিয়া বাদে ১৩ পদের স্পেশাল মসলার গুঁড়া বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ টাকা। উট মার্কা হাটহাজারীর মিষ্টি মরিচের গুঁড়া প্রতিকেজি ৫৪০ টাকা, রায়পুরের মরিচ ও ঝাল মরিচ ৪৬০ টাকা, হলুদ ৩৬০ টাকা, মিক্স মসলা ৬০০ টাকা, ধনিয়া ২৮০ টাকা, চিকন জিরা ৯৬০ টাকা, মিষ্টি জিরা ৪২০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। হর্স মার্কা মসলার দোকানের মালিক মো. ইকবাল বলেন, এবার মরিচের ঝাল বেড়েছে।

গত রমজানে হাটহাজারীর মিষ্টি মরিচের গুঁড়া বিক্রি করেছিলাম ৪৮০ টাকা, এখন ৫৪০ টাকা। রায়পুরের মরিচের গুঁড়া আগে ছিল ৪২০ টাকা এখন ৪৬০ টাকা। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, উচ্চ আমদানি শুল্ক ও বাজার তদারকির দুর্বলতার কারণেই এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। আমদানিকারকেরা জানিয়েছেন, ৫০০ টাকার জিরায় প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি শুল্ক দিতে হয়। এলাচে কেজিপ্রতি ৬৫০ টাকা এবং গোলমরিচে ২২০ টাকা শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে। এই উচ্চ শুল্কের সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী স্থলবন্দর দিয়ে অবৈধভাবে পণ্য আনছে, ফলে বৈধ আমদানিকারকেরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন। ব্যবসায়ীদের দাবি, চট্টগ্রাম বন্দরে নজরদারি জোরদার হলেও স্থলবন্দরগুলোতে তা কার্যত নেই। তারা এ বিষয়ে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকার জোর দাবি করেন

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত