প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৭ মে, ২০২৬
সমাজ ও সভ্যতার মূল ভিত্তি হলো পরিবার, আর একটি সুস্থ পরিবারের প্রাণকেন্দ্র হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার নিবিড় ও বিশ্বস্ত সম্পর্ক। কিন্তু বর্তমান সময়ে এই বিশ্বস্ততার দেয়ালে সবচেয়ে বড় ফাটল ধরাচ্ছে পরকীয়া। আধুনিক যুগে মানুষের যাপিত জীবনের পরিবর্তন, কর্মব্যস্ততা এবং ব্যক্তি স্বাধীনতার ভুল ব্যাখ্যার কারণে পরকীয়ার হার ক্রমশ বাড়ছে, যা অসংখ্য পরিবারকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। মনস্তাত্ত্বিকদের মতে, পরকীয়া শুধু একটি চারিত্রিক স্খলন বা হঠাৎ করে ঘটা কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি অনেক ক্ষেত্রে দাম্পত্য সম্পর্কের ভেতরের দীর্ঘদিনের অবক্ষয়ের একটি চূড়ান্ত পরিণতি। তাই সমাজকে সুস্থ রাখতে হলে কেবল আইনি বা সামাজিক ভীতি দিয়ে নয়, বরং পরকীয়া প্রতিরোধের শেকড় খুঁজতে হবে সম্পর্কের মানসিক ও আবেগিক ভিত্তিগুলোর মাঝে।
পরকীয়ার মূল কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মানসিক দূরত্বই এর প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। যখন কোনো সম্পর্কে পর্যাপ্ত সময়, মনোযোগ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার অভাব ঘটে, তখন মানুষ অবচেতনভাবেই বাইরের দুনিয়ায় সেই শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা করে। আধুনিক জীবনের ইঁদুরদৌঁড়ে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই ক্লান্ত হয়ে পড়েন, ফলে নিজেদের মধ্যে মানসম্মত সময় কাটানোর সুযোগ কমে যায়। সাধারণ যুক্তি বলে, একটি সম্পর্কে যখন মানসিক বা শারীরিক চাহিদার অপূর্ণতা থাকে এবং সেগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ থাকে না, তখনই তৃতীয় কোনো ব্যক্তির প্রবেশ খুব সহজ হয়ে যায়। তাই পরকীয়া প্রতিরোধে প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত নিজেদের মধ্যকার জমে থাকা অভিমান ও দূরত্বের দেয়ালগুলো ভেঙে ফেলা।
বর্তমান সময়ে তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসার পরকীয়াকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা ইনস্টাগ্রামের মতো মাধ্যমগুলো মানুষের ভার্চুয়াল জগতকে এতটাই বিস্তৃত করেছে যে, পুরোনো বন্ধু বা নতুন কোনো অপরিচিত মানুষের সাথে নিমিষেই ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে। এই ভার্চুয়াল নৈকট্য অনেক সময় আবেগিক নির্ভরতায় রূপ নেয়, যা ধীরে ধীরে বাস্তব জীবনের পরকীয়ায় গড়ায়। প্রযুক্তির এই যুগে প্রাইভেসি বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুযোগ ব্যবহার করে মানুষ খুব সহজেই সঙ্গীর অগোচরে দ্বৈত জীবনযাপন করতে পারছে। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সীমানা বা ‘বাউন্ডারি’ নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি। সঙ্গীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকার যৌক্তিক দায়বদ্ধতা থেকে স্মার্টফোনের স্ক্রিনের চেয়ে সঙ্গীর চোখের দিকে তাকানো এবং বাস্তব জীবনকে প্রাধান্য দেওয়া বেশি প্রয়োজন।
?পরকীয়া প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই উপায় হলো দাম্পত্য সম্পর্কে বন্ধুত্বের চর্চা করা। যে সম্পর্কে স্বামী ও স্ত্রী একে অপরের সেরা বন্ধু হতে পারেন, সেখানে লুকোচুরি বা ছলনার সুযোগ থাকে না। গবেষকরা মনে করেন, নিয়মিত ইতিবাচক যোগাযোগ এবং একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি যেকোনো সম্পর্কের সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। সঙ্গীর ছোটখাটো ভুলগুলোকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা, তার কাজের প্রশংসা করা এবং যেকোনো সংকটে পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়া একটি সম্পর্ককে এতটা শক্তিশালী করে যে, বাইরের কোনো প্রলোভন সেখানে জায়গা করতে পারে না। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার এই যৌক্তিক ও আন্তরিক প্রচেষ্টা উভয়ের তরফ থেকেই হওয়া বাঞ্ছনীয়; কারণ, একতরফা চেষ্টায় কখনো দীর্ঘস্থায়ী বিশ্বাস বা ভালোবাসা গড়ে ওঠে না।
পরকীয়া প্রতিরোধে প্রয়োজন সচেতনতা এবং প্রয়োজনে পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের সাহায্য নেওয়ার ইতিবাচক মানসিকতা।
আমাদের সমাজে দাম্পত্য কলহ নিয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা ম্যারেজ কাউন্সেলরের কাছে যাওয়াকে এখনও অনেক ক্ষেত্রে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়। কিন্তু যখন নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সমাধান করা কঠিন হয়ে পড়ে, তখন একজন তৃতীয় নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের বৈজ্ঞানিক পরামর্শ জাদুকরী ভূমিকা রাখতে পারে। পরকীয়া কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, এটি ছোট ছোট অবহেলার পাহাড় থেকে সৃষ্ট এক ভয়াবহ পরিণতি। তাই পরিবারকে বাঁচাতে এবং সুস্থ সমাজ বিনির্মাণে প্রতিটি দম্পতিকে নিজেদের সম্পর্কের যত্ন নিতে হবে। পারস্পরিক সম্মান, স্বচ্ছতা এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসার শক্তিতেই পরকীয়ার মতো পারিবারিক ও সামাজিক ব্যাধিকে রুখে দেওয়া সম্ভব।
আমানুর রহমান
কবি ও লেখক চাষাড়া, নারায়ণগঞ্জ