
চট্টগ্রামে অর্ধকোটিরও বেশি মানুষ বসবাস করছে। তাদের নাগরিক জীবনে যোগাযোগের অন্যতম প্রয়োজনীয় মাধ্যম হল যানবাহন। যানবাহন পরিসেবা বা কঠামো একটি শহরের যত উন্নত এবং নিয়ন্ত্রিত সে শহর তত বেশী অগ্রগামী হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশের জনগণ এ পরিসেবা থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছে এবং প্রায় সব বিভাগের চিত্র একই রকম। বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রাম দেশের অর্থনীতি ও যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। নগরে রয়েছে উড়ালসড়ক, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ, নতুন সড়ক অবকাঠামো ও আধুনিকায়নের নানা পরিকল্পনা। কিন্তু এসব উন্নয়নের আড়ালেই নগরবাসীর প্রতিদিনের গণপরিবহনব্যবস্থায় রয়ে গেছে পুরোনো এক চিত্র- জরাজীর্ণ, ফিটনেসবিহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ বাস। ভাঙা জানালা, নড়বড়ে দরজা, জীর্ণ বডি, অতিরিক্ত ধোঁয়া আর যাত্রী ওঠানামার সময় বেপরোয়া থামানো- চট্টগ্রামের অনেক লোকাল বাসে নিত্যদিনের বাস্তবতা এমনই। কোথাও বাসের গায়ে নতুন রং লাগিয়ে পুরোনো চেহারা আড়াল করা হয়, কোথাও আবার জোড়াতালি দিয়ে বছরের পর বছর চালানো হচ্ছে যানবাহন। সবচেয়ে উদ্বেগের তথ্য মিলছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবেই। ২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৮৯টি। এর মধ্যে ৭৬ হাজার ৩২০টি যানবাহনের ফিটনেস সনদ নেই। শুধু নগরীতেই ফিটনেসবিহীন যান রয়েছে ৪৬ হাজার ৭০৫টি। এসবের মধ্যে ২ হাজার ৯৯টি বাসও রয়েছে। অর্থাৎ শুধু কাগজপত্রের হিসাবেই নয়, নগরীর সড়কে যাত্রীবাহী বাসের নিরাপত্তা নিয়েও বড় প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৪ সালে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কে চলা একটি বাসের বয়স পাওয়া যায় ৪৩ বছর। বাসটির ফিটনেস ও কর সনদ মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল। ওই বাসের ধাক্কায় চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। এমন ঘটনার পরও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বায়েজিদ এলাকায় বিআরটিএর অভিযানে ফিটনেসবিহীন বাসসহ ছয়টি যানবাহনকে জরিমানা করা হয়। কয়েক ঘণ্টার অভিযানে ছয়টি মামলা হলেও পরবর্তী সময়েও ফিটনেসবিহীন যান চলাচলের অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে। চট্টগ্রামের গণপরিবহনের আরেকটি বড় সমস্যা যাত্রী ওঠানামার অনিয়ম। নির্দিষ্ট স্টপেজের পরিবর্তে রাস্তার মাঝখানে বাস থামানো, চলন্ত বাসে যাত্রী তোলা, অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং প্রতিযোগিতা করে আগে যাত্রী নেওয়ার প্রবণতা সড়কে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও প্রবেশপথগুলোতে এসব বাসের কারণে যানজটও তীব্র হচ্ছে। শাহ আমানত সেতু এলাকায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি, অবৈধ স্ট্যান্ড ও যত্রতত্র বাস থামানোর কারণে নিয়মিত ভোগান্তির অভিযোগ রয়েছে। সমস্যার আরেক দিক পরিবেশ। পুরোনো ইঞ্জিনের বাস থেকে কালো ধোঁয়া বের হলেও অনেক সময় সেগুলো দিনের পর দিন রাস্তায় চলাচল করছে। এতে বায়ুদূষণের পাশাপাশি যাত্রী, পথচারী ও চালকদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। তবে কর্তৃপক্ষ যে একেবারেই ব্যবস্থা নিচ্ছে না, তা নয়। বিআরটিএ নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে এবং ফিটনেসবিহীন যান ও লাইসেন্সবিহীন চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন নগরের সব গণপরিবহনের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা, মেয়াদোত্তীর্ণ বাস ধাপে ধাপে প্রত্যাহার, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং নির্দিষ্ট স্টপেজে বাস পরিচালনা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে বাস মালিকদের জন্য পুরোনো গাড়ি প্রতিস্থাপনে বাস্তবসম্মত আর্থিক প্রণোদনাও প্রয়োজন। চট্টগ্রামকে আধুনিক নগর হিসেবে গড়ে তুলতে শুধু নতুন সড়ক বা উড়ালসড়ক নির্মাণ যথেষ্ট নয়। নগরবাসীর প্রতিদিনের যাতায়াত যদি লক্কর ঝক্কর বাস, কালো ধোঁয়া, ঝুঁকিপূর্ণ ওঠানামা ও অনিয়মের মধ্যেই আটকে থাকে, তাহলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন আর মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন একসঙ্গে এগোবে না।