ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ৩১ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

অহংকারের পরিণতি মন্দ

এএসএম মারুফ বিল্লাহ
অহংকারের পরিণতি মন্দ

সমাজজীবনের অত্যন্ত নিন্দনীয় একটি চরিত্র হলো অহংকার প্রদর্শন করা। আত্ম অহমিকা, আমিত্ব, গর্ব, দম্ভ প্রকাশ করা, অন্যকে নিকৃষ্ট ও তুচ্ছ মনে করা এবং সবার তুলনায় নিজেকে বড় ভাবাই হলো অহংকার। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘অহংকার হলো সত্যকে পদদলিত করা এবং মানুষকে লাঞ্ছিত করা।’ (মুসলিম)। মানুষ বংশ, সম্পদ, সৌন্দর্য, শক্তি, সামর্থ্য ইত্যাদি বিষয়ে অহংকার করে থাকে। ধনী ও সম্পদশালীর অর্থের মধ্যে গর্ব থাকে, স্ত্রীলোকের রূপের বড়াই, ক্ষমতাবানদের ক্ষমতার দম্ভ এবং বিদ্বানের জ্ঞানের অহমিকা। অহংকারীরা বিভিন্ন উপায়ে তাদের আমিত্ব প্রকাশ করে। যেমন, অন্তরে গর্ব পোষণ, চালচলন ও কর্মকা-ে এবং কথাবার্তায় অন্যদের ওপর নিজের প্রাধান্য জানান দেওয়া।

অহংকার এমন এক ঘৃণ্য কাজ, যা একজন ব্যক্তির মানসিকতাকে কলুষিত করে দেয়। অসংখ্য নিন্দনীয় কাজ সংঘটনের পেছনে নিয়ামক হিসেবে অহংকারের উপস্থিতি দৃশ্যমান। আমিত্ব বজায় রাখতে মানুষের অন্তরে মিথ্যা, নেফাকি, ঈর্ষা, ঘৃণা, পরনিন্দা, ক্রোধ, লোভ-লালসা ও ফেতনা-ফ্যাসাদের সৃষ্টি হয়। অহংকারীরা প্রমাণিত সত্যকে উপেক্ষা করে নিজের মতের ওপর অটল থাকে এবং অপরকে হেয় জ্ঞান করে। মনে মনে মানুষকে শত্রুভাবে এবং তারা সবসময় এ ধারণা পোষণ করে যে, সবার মধ্যে মর্যাদার দিক দিয়ে তারাই সেরা। মানুষ তাদের কথা শুনবে, মানবে; কিন্তু তাদের ওপর কথা বলার কেউ থাকবে না এবং তারা নিজেদের স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবে। অথচ আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘কখনও নয়, নিশ্চয়ই মানুষ সীমা লঙ্ঘন করে থাকে। কেননা সে নিজেকে মনে করে স্বয়ংসম্পূর্ণ। নিশ্চয়ই প্রত্যাবর্তন তোমার রবের দিকেই।’ (সুরা আলাক : ৬-৮)। ধন-সম্পদ, খ্যাতি, সমাজে প্রভাব বিস্তার ও ঐশ্চর্যতার মোহে পড়ে মানুষের মনে আল্লাহভীতিও কমে যায়। ফলে অহংকারের মাত্রা বহুগুণে বৃদ্ধি পায় এবং প্রভুর বিরুদ্ধাচরণ করতে কুণ্ঠাবোধ করে না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মুসা (আ.) বলল, আমি আমার ও তোমাদের প্রতিপালকের আশ্রয় প্রার্থনা করছি এমন প্রত্যেক অহংকারী থেকে, যে হিসাবের দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখে না।’ (সুরা মুমিন : ২৭)। অথবা নিজেকে আল্লাহর বিশেষ নেয়ামতপ্রাপ্ত ব্যক্তি ভাবা হয় এবং মনে করা হয় বাকি সব মানুষ তুচ্ছ ও নেয়ামতলাভের অনুপযুক্ত। অথচ আল্লাহর কাছে সৃষ্টির সবাই সমান।

অহংকার হলো অন্তরের প্রধান ও বড় ব্যাধি। আর অন্তর পরিষ্কার না হলে ইবাদত কবুল হওয়া দুরূহ। কাজকর্মের শুদ্ধতার জন্য অন্তরের বিশুদ্ধতা একান্ত প্রয়োজন। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি অহংকার, খেয়ানত এবং ঋণমুক্ত অবস্থায় মারা গেল সে জান্নাতে যাবে।’ (তিরমিজি)। অন্তরে অহংকার পোষণকারীর ব্যাপারে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যার অন্তরে একটি সরিষা পরিমাণ অহংকার আছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (মুসলিম)। আর সর্বোপরি আল্লাহ তায়ালা কোনো অহংকারীকে পছন্দ করেন না। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো উদ্ধত অহংকারীকে ভালোবাসেন না।’ (সুরা লুকমান : ১৮)।

শক্তি-সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অন্তরে অহংকার থাকার কারণে অনেক মানুষ নিজের কাজ নিজে করে না, যাদের মধ্যে রয়েছে কথিত উচ্চশিক্ষিত এবং কতিপয় আলেম সমাজ, যা রাসুল (সা.) ও সাহাবাদের আমলের বিপরীত। বহু হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, রাসুল (সা.) সংসারের কাজ করতেন, উট ও ছাগলকে খাদ্য খাওয়াতেন, দুগ্ধ দহন করেছেন, বাজার থেকে সদাই ক্রয় করেছেন এবং স্ত্রীদের কাজেও সহযোগিতা করেছেন। হজরত ওমর (রা.) মুসলিম জাহানের আমির হয়েও আটার বস্তা নিজের কাঁধে করে বুড়ির বাড়ি পৌঁছে দিয়েছেন।

মানুষের মনুষত্বের বিকাশ ঘটে তার চালচলন ও আচার-ব্যবহারের মাধ্যমে। তাই বিনম্রভাবে চলাচল করা প্রত্যেক মানুষের করণীয়। কেননা আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘আর পৃথিবীতে দর্পভরে পদচারণা করবে না। নিশ্চয় তুমি তো ভূপৃষ্ঠকে কখনও বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমি কখনওই পর্বত প্রমাণ হতে পরবে না।’ (সুরা বনি ইসরাইল : ৩৭)। এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সেসব অহংকারীর ইঙ্গিত করেছেন, যারা বুক ফুলিয়ে চলে, বড় বড় অট্টালিকার গর্ব করে, সেগুলো পাহাড় সমানও নয়। অথচ আল্লাহর সৃষ্টি পাহাড়ের চেয়েও অনেক উঁচু। এখানে দাম্ভিকতাকে নিষেধ করা হয়েছে। অর্থাৎ অতি উৎফুল্লভাব নিয়ে জমিনে বিচরণ করা যাবে না। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের পূর্ববর্তীদের থেকে এক ব্যক্তি (কারুন) গায়ে দুটি চাদর দিয়ে হেলে দুলে হাঁটত, হঠাৎ জমিন তাকে গ্রাস করে নিয়েছে। সে কেয়ামত পর্যন্ত মাটির নিচে যেতে থাকবে।’ (মুসলিম)। দাম্ভিকতা সহকারে হাঁটা কিংবা কাপড় ঝুলিয়ে হাঁটা উভয়ই হারাম এবং কাপড় হাত দ্বারা উঁচু করে হাঁটাও তেমনি হারাম। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দাম্ভিকতাবশত কাপড় টেনে টেনে হাঁটে, কেয়ামতে আল্লাহ তায়ালা তার দিকে রহমতের দৃষ্টি দেবেন না।’ (বোখারি)।

জমিনে যারা নিজেকে মহান আল্লাহর প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবেছিল, তাদের অন্তর মূলত অহংকারের বশবর্তী হয়েছিল। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘ধর ফেরআউন বলল, হে পারিষদবর্গ! আমি ছাড়া তোমাদের কোনো ইলাহ আছে বলে আমি জানি না। অতএব, হে হামান! তুমি আমার জন্য ইট পোড়াও, তারপর আমার জন্য একটি প্রাসাদ তৈরি কর, যাতে আমি মুসার ইলাহকে দেখতে পাই। আর নিশ্চয়ই আমি মনে করি সে মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। আর ফেরআউন ও তার সেনাবাহিনী জমিনে অন্যায়ভাবে অহংকার করেছিল এবং তারা মনে করেছিল যে, তাদেরকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনা হবে না। অতঃপর আমি তাকে এবং তার সেনাবাহিনীকে পাকড়াও করলাম। তারপর তাদের সমুদ্রে নিক্ষেপ করলাম।’ (সুরা কাসাস : ৩৮-৪০)। এভাবে পূর্ববর্তী অনেক সম্প্রদায় তাদের শৌর্য-বীর্য নিয়ে অহংকার করেছিল এবং পরিণতিতে আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দিয়েছেন।

অন্তরে অহংকার পোষণ এবং কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তা প্রকাশ করার পাশাপাশি কথাবার্তার মাধ্যমেও প্রকাশিত হয়ে থাকে। যেমন শয়তান কথার মাধ্যমে তার শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করেছিল। আদম (আ.) কে সিজদা করতে বলায় শয়তান অহংকারবশত বিরত থাকে। তখন আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে ইবলিস! আমি যাকে আমার হাতে সৃষ্টি করেছি তার প্রতি সিজদানত হতে কিসে তোমায় বাধা দিল? সে বলল, আমি এমন নই যে, একজন মানবকে সিজদা করব।’ (সুরা হিজর : ৩২-৩৩)। কতক মানুষ অন্যের কথার ভ্রুক্ষেপ করে না, কেউ কিছু জানতে চাইলেও ঠিকভাবে জবাব দেয় না, এমনকি সালাম দিলেও মুখ ফিরে তাকায় না। লুকমান (আ.) তার পুত্রকে উপদেশ দিচ্ছিলেন, ‘অহংকারবশত তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না।’ (সুরা লুকমান : ১৮)। অর্থাৎ লোকের সঙ্গে সাক্ষাৎ বা কথোপকথনের সময় মুখ ফিরিয়ে রেখ না, যা তাদের প্রতি উপেক্ষা ও অহংকারের নিদর্শন এবং ভদ্রোচিত স্বভাব ও আচরণের পরিপন্থি। কথার বড়াইয়ের কারণে সমাজে ফ্যাসাদের সৃষ্টি হয়, হিংসাবিদ্বেষ বেড়ে যায়। একে অপরের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের প্রতিযোগিতায় পারস্পরিক বাক্যালাপগুলো অনেক সময় উচ্চ স্বর হয়। লুকমান (আ.) উচ্চ স্বরে কথা বলতে পুত্রকে নিষেধ করেছিলেন, ‘পদচারণায় মধ্যবর্তিতা অবলম্বন করো এবং কণ্ঠস্বর নিচু কর।’ (সুরা লুকমান : ১৯)।

হজরত হুসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত, আমি আমার পিতা আলী (রা.) মানুষের সঙ্গে রাসুল (সা.) এর ওঠবস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নবী (সা.) কে সর্বদা প্রসন্ন ও হাস্যোজ্জ্বল মনে হতো। তার চরিত্রে নম্রতা, আচার-ব্যবহারে বিনয় বিদ্যমান ছিল। তার স্বভাব মোটেই রুক্ষ ছিল না, কথাবর্তাও নিরস ছিল না। তিনি উচ্চ স্বরে বা অশ্লীল কথা বলতেন না, কারও প্রতি দোষারোপ করতেন না। কৃপণতা প্রকাশ করতেন না। যেসব দ্রব্য মনঃপুত হতো না, সেগুলোর প্রতি আসক্তি প্রকাশ করতেন না এবং কাউকে তা থেকে নিরাশ করতেন না।

সে সম্পর্কে কোনো মন্তব্যও করতেন না। তিন বস্তু সম্পূর্ণরূপে বর্জন করেছিলেন ঝগড়া, অহংকার ও অর্থহীন কাজে আত্মনিয়োগ করা। (তিরমিজি)।

পরিশেষে, প্রতিটি মানুষের কোনো না কোনো অভাব রয়েছে। সুতরাং অহংকার করা মানুষের জন্য শোভা পায় না। অহংকার শুধু তার জন্যই শোভনীয়, যার কোনোই অভাব নেই। হাদিসে কুদসিতে এসেছে, আল্লাহ তায়ালা বলেন, অহংকার আমার চাদর। যে আমার চাদর নিয়ে টানাটানি করে, আমি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। (মুসলিম)। আল্লাহ তায়ালা আমাদের অহংকার থেকে বেঁচে থাকার তৌফিকদান করুক। আমিন।

লেখক : শিক্ষক, ইসলাম শিক্ষা, কেসি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, দক্ষিণখান, ঢাকা

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত