প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬
প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা আলেম, লেখক, গবেষাক ও ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা আবদুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী আল আজহারী (রহ.)-এর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০২৪ সালের ১৯ জানুয়ারির শুক্রবারে তিনি রাজধানীর আগারগাঁওস্থ ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশের লেখক-গবেষক ও সম্পাদক, বাংলাদেশ জমিয়াতুল মুদাররেসিনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের ‘ওয়াজ মাওলানা’ পদে জুমার বাংলা খুতবা প্রদান করতেন। এছাড়াও দীর্ঘদিন গণভবন ও বাংলাদেশ সচিবালয় মসজিদের ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালন করেন। তার লিখিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক।
বিগত সরকারের শাপলা চত্বরে নির্মম হত্যাযজ্ঞ এবং গুম, খুন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে তার কলম ছিল সোচ্চার। সে সময়ে তার লিখিত ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে শাহবাগ চত্বর ও শাপলা চত্বর’ বইটি তৎকালীন সরকার প্রকাশককে বাজার থেকে উঠিয়ে নিতে বাধ্য করে। বর্তমানে বইটি ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে শাহবাগ বনাম শাপলা নামে’ বাজারজাত করা হয়েছে। তিনি ছিলেন অকুতোভয় ও সাহসিকতার প্রতিমূর্তি। বিভিন্ন সময়ে অন্যায়-অনাচারের বিরুদ্ধে এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তার কলম সবসময় সোচ্চার ছিল।
সিলেট ও ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্রনেতা হিসেবে তার প্রচুর খ্যাতি ছিল?। ইসলামি-আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ডাক দিয়ে ১৯৬২-৬৩ সালে ঢাকায় লক্ষাধিক মাদ্রাসার ছাত্রের সভা-শোভাযাত্রা দুবার করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন।
মাওলানা আবদুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদীর জন্ম শুক্রবার ২৯ মে ১৯৪২ সালে সিলেটের টুকেরগাঁওয়ের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। তিনি সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন। পরে ঢাকায় এসে ঢাকা সরকারি আলিয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। এর পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ডিপ্লোমা ইন উর্দু কোর্স সম্পন্ন করেন। বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৬ সালে উচ্চতর ইমাম ট্রেনিংয়ের জন্য সর্বপ্রথম যে দলকে মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছিল, তিনি ছিলেন ওই দলের অন্যতম সদস্য। তিনি ১৯৭৩ সালে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে মহানবী (সা.)-এর জন্ম ও ওফাত বার্ষিকী উপলক্ষে সর্বপ্রথম সিরাতুন্নবী মাহফিলের আয়োজন করেন। স্বাধীনতা উত্তর দেশের সংকটাপন্ন মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কার এবং এর উন্নয়নে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনে কোরআন তিলাওয়াত ও আজান সম্প্রচার পুনরায় শুরু করতে তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তারই পরামর্শে সৌদি আরব বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি না দেওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ সরকার সর্বপ্রথম হজের ফ্লাইট সৌদি আরবের উদ্দেশে প্রেরণ করেন। ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত হজ যাত্রীদের ‘হজ, ওমরা ও জিয়ারত’ নামক যে পুস্তক সরকারিভাবে বিতরণ করা হয় তা তারই রচিত।
লেখক ও গবেষক হিসেবে তিনি দেশে-বিদেশে পরিচিত ছিলেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে তার লিখিত, অনূদিত ও সম্পাদিত অনেক বই প্রকাশিত হয়েছে। সব মিলিয়ে তার বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। তার মৃত্যুর পর বাংলা একাডেমি থেকে গত বইমেলায় তার অনূদিত ‘মুহাম্মদ রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবন ও কর্ম’ প্রকাশ করে বাংলা একাডেমি তাকে সম্মানিত করেন। তিনি তাফসিরে জিলানী নামে পাঁচখণ্ডে পবিত্র কোরআন শরিফের ২০ পারার তাফসিরের অনুবাদ কাজ সম্পন্ন করে গেছেন। এছাড়াও কাওলি হাদিসের সম্ভার ‘মশারিকুল আনোয়ার’ নামক প্রায় ১৩০০ পৃষ্ঠার হাদিস গ্রন্থের অনুবাদ সম্পন্ন করেন যা ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশের জন্য অপেক্ষমান রয়েছে। তিনি ১৯৭৮ সাল থেকে দীর্ঘদিন মহানবী (সা.)-এর জীবনীর ওপর প্রতি বছর ধারাবাহিকভাবে ‘মহানবী (সা.) স্মরণিকা’ শীর্ষক স্মরণিকা প্রকাশ করেছেন যা সুধী মহলে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছিল।
তার লিখিত ও অনূদিত গ্রন্থাবলির মধ্যে রাসুলুল্লাহর (সা.) পত্রাবলী, সন্ধি চুক্তি ও ফরমানগুলো, কিশোরদের প্রিয় নবী (সা.), ইসলাম ও রাজনীতি, আমি মুক্তিযোদ্ধা আমি রাজাকার, বাংলাদেশের রাজনীতিতে শাহবাগ বনাম শাপলা, ইসলামের ডাক (বর্তমানে নিমজ্জমান পাকিস্তানের শেষচিত্র নামে বাজারে প্রচলিত), ভারত যখন স্বাধীন হচ্ছিল, আল আদাবুল মুফরাদ, জীবন সন্ধ্যায় মানবতা (বর্তমানে ‘বিখ্যাতদের বিদায়বেলা’ নামে বাজারে প্রচলিত), নবী চিরন্তন (বর্তমানে ‘নবী পরশমনি’ নামে বাজারে প্রচলিত) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
তিনি মাওলানা আকরাম খাঁ এর বিশেষ স্নেহভাজন ছিলেন। দৈনিক আজাদে তিনি নিয়মিত লিখতেন। এছাড়াও দৈনিক ইত্তেফাক, নয়া দিগন্ত, দিনকাল প্রভৃতি পত্রিকায় এবং সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক ও বার্ষিক ম্যাগাজিনগুলো তার অসংখ্য রচনা প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বাংলাদেশ বেতারে ধর্মীয় কথিকা এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে অংশগ্রহণ করেন। জাতীয় লেখক পরিষদ কর্তৃক তিনি গুণীজন সম্মাননায় ভূষিত হন। এছাড়া বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলন এবং দেশ অধ্যায়ন কেন্দ্র কর্তৃক আলেম মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননায় ভূষিত হন। রাষ্ট্রীয়ভাবে তিনি সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, চীন, মিসর প্রভৃতি দেশ সফর করেন। তাকে মিরপুর-১১স্থ জান্নাতুল মাওয়া কবরস্থানে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, ৩ পুত্র ও ২ কন্যা সন্তান রেখে গিয়েছেন।