ঢাকা সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

হাম্মাদিয়া জামে মসজিদ

মোস্তফা কামাল গাজী
হাম্মাদিয়া জামে মসজিদ

মহাসড়কে দুরন্তবেগে ছুটে চলেছে ভারী যানবাহন। আশপাশে দু-একটি দোকান থাকলেও সবগুলো প্রায় ক্রেতাশূন্য। রাস্তায়ও নেই তেমন মানুষের আনাগোনা। নিত্যদিনের চলাচলের ব্যস্ততায় অনেকের নজর এড়িয়ে যায় ঐতিহাসিক স্থাপনাটি। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে সীতাকুণ্ড উপজেলার ছোট কুমিরা এলাকায় কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় পাঁচশত বছরের পুরনো ইট-সুড়কির এক গম্বুজের হাম্মাদিয়া জামে মসজিদ। জনশ্রুতি আছে, এই মসজিদের নামেই গ্রামের নাম মছজিদ্দা হয়েছে।

মসজিদের সামনে রাস্তার পাশে একটি বিশাল ব্যানারে মসজিদ পুনর্নির্মাণের জন্য সাহায্যের আবেদনের পাশাপাশি নির্মিয়মান মসজিদের উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড থানার অন্তর্গত মছজিদ্দা একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রাম। পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর ও পূর্বে পাহাড়। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইন, ঢাকা ট্রাংক রোড, স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ, দীঘি, ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিদর্শন ও অসংখ্য খ্যাতিমান ব্যক্তির জন্মস্থান এই এলাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঐতিহ্যবাহী ও এলাকার মর্যাদার সঙ্গে সম্পৃক্ত হলো হাম্মাদিয়া জামে মসজিদ। এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে এটি হারমাদিয়া জামে মসজিদ ও হারমাদিয়া দীঘি নামে বেশি পরিচিত। এটি ৪৫০ বছরের বেশি পুরাতন মসজিদ। মসজিদটি মোঘল আমলে নির্মিত বলে যেমন মত রয়েছে, আবার সুলতানি আমলে নির্মিত হয়েছে বলেও বর্ণনা আছে। চুন-সুড়কি ও ইটের গাঁথুনি দিয়ে নানান কারুকার্যে সাজানো হয়েছে পুরো মসজিদ। দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও মনোমুগ্ধকর। মসজিদের উপরে মাঝখানে একটি বিশালাকৃতির চারকোণা গম্বুজ রয়েছে।

বর্তমানে আট মহল্লাবাসীর সহযোগিতায় তৈরি করা মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী মসজিদের পুনর্নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। তিন কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে পুনর্নির্মিত ভবনে মহিলাসহ প্রায় তিন হাজার লোক একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারবেন। মসজিদের দক্ষিণ পাশে চারতলা ভবনে থাকবে হেফজখানা ও এতিমখানা।

চট্টগ্রাম নগর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে সীতাকুণ্ড উপজেলার ছোট কুমিরা ইউনিয়নের মসজিদ্দা গ্রামে হাম্মাদিয়া জামে মসজিদের অবস্থান। মসজিদটিকে ঘিরে গড়ে উঠছে নতুন সম্প্রসারিত স্থাপনা। মূল মসজিদকে মাঝখানে রেখে এর দুপাশে একতলা সম্প্রসারিত ভবন গড়ে উঠেছে।

২০১২ সালে প্রকাশিত ইটারনাল চিটাগাং বইয়ে হাম্মাদিয়া মসজিদকে চট্টগ্রামের দ্বিতীয় প্রাচীন মসজিদ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা আশরাফ আলী বলেন, মূল মসজিদটিকে কেন্দ্রস্থলে রেখেই তিনতলা পর্যন্ত মসজিদ সম্প্রসারণের কাজ চলছে। এরইমধ্যে দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত ছাদের কাজ হয়েছে। একতলার কাজ প্রায় শেষ, এখানে নামাজ পড়া হচ্ছে নিয়মিত। নিচতলায় বর্তমানে প্রায় এক হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের কবরস্থানের পেছনে প্রায় ১০ একর জায়গায় রয়েছে হাম্মাদিয়া দীঘি। অজু-গোসলের জন্য এটি ব্যবহৃত হয়।

২০১৩ সালের মে মাস থেকে মসজিদ পুনর্নির্মাণের কাজে হাত দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। মাঝখানে কিছুদিন নির্মাণকাজ বন্ধ ছিল। মুসল্লিদের জায়গা সংকুলানের কথা ভেবে পরিচালনা কমিটি মসজিদ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে মূল মসজিদটিকে অক্ষত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এক গম্বুজের ছোট পুরোনো মসজিদকেই মূল মসজিদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই এর ভেতরের মিম্বারটি এখনও ব্যবহার করা হচ্ছে। মূল মসজিদ থেকে বেশ কয়েকধাপ নিচে নামতে হয় পুরোনো মসজিদের ইমামের কক্ষে যেতে। মেঝেতে এখন টাইলস বসানো হয়েছে। আগে সাধারণ মাটির মেঝে ছিল বলে জানান ইমাম সাহেব। মূল মসজিদের দেয়াল ও মেঝেতে টাইলস বসানো ছাড়া ইট-সুড়কির মূল মসজিদটি অবিকল আগের মতোই রাখা হয়েছে।

১৯৮৬ সাল থেকে মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকারী আব্দুস শুকুর বলেন, ‘মুসল্লিদের জায়গা সংকুলানের কথা ভেবে কার্যকরী কমিটির সভায় মসজিদ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা মূল মসজিদটিতে হাত দেব না। এটি ভাঙা হবে না।’

তিনি ব্যক্তিগতভাবেও এটি সংরক্ষণের পক্ষে বলে দাবি করে বলেন, ‘মসজিদটি অক্ষত রাখার ব্যাপারে এলাকায় মানববন্ধন হয়েছে। এ ব্যাপারে আমাকে নানা রকম চাপ দেওয়া হয়েছে।’

মসজিদটি এক গম্বুজ বিশিষ্ট একটি বর্গাকার ইমারত। বাইরের দিকে এর প্রতি বাহু ৬.৩৪ মিটার। বাইরের চার কোণায় রয়েছে চারটি সংযুক্ত চোঙ্গাকৃতির গোলাকার বুরুজ। মেহরাবের বাইরের দিকে রয়েছে একটি গোলাকৃতির বড় মিনার। এর উপরিভাগে স্থাপিত হয়েছে ক্ষুদ্রাকৃতির বুরুজ। চারপাশে মিনারগুলোর ব্যাস সমান হলেও মেহরাবের বাইরের মিনারটির ব্যাস তুলনামূলক বেশি। মসজিদের দেয়াল পৌনে ৪ হাত পুরু। মসজিদের পূর্ব দেয়ালে তিনটি খিলান দরজা এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালের প্রত্যেকটির মধ্যে রয়েছে একটি করে জানালা। প্রতিটি দরজার বাইরে ও ভেতরে রয়েছে দুটো সূচ্যগ্র পাথরে খিলান-ফ্রেম এবং দুটোর মধ্যে টোলের মতো খিলান ছাদ আছে।

মসজিদের ভেতর উত্তর-দক্ষিণ উভয় দেয়ালে একটি করে বড় কুলুঙ্গী আছে। এগুলো রাখা হয়েছে জিনিসপত্র রাখা ও বাতি জ্বালানোর জন্য। আগে উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালের জানালাগুলোতে পোড়ামাটির ফলক ছিল। কিন্তু বর্তমানে এগুলোর পরিবর্তে লোহার গ্রিল বসানো হয়েছে।

মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে তিনটি পাথরের মেহরাব রয়েছে। মধ্যবর্তী প্রধান মেহরাব পার্শ্ববর্তী মেহরাবের চেয়ে আকারে বড়। মধ্যবর্তী এবং ডান দিকের মেহরাব একটি সম্পূর্ণ পাথরের কাঠামোতে তৈরি, বামদিকের মেহরাব শুধু ইটের তৈরি। উল্লেখ্য, প্রধান মেহরাবের দুপাশে পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত উৎকীর্ণ করা আছে। প্রধান মেহরাবের ওপরের অংশে কলিমায়ে শাহাদাত এবং নিচে কলিমায়ে তাইয়্যেবা উৎকীর্ণ হয়েছে।

মসজিদের মধ্যবর্তী এবং ডানদিকের খিলানের কুলুঙ্গীর ভেতর শৃঙ্খল এবং ঘণ্টা খোদাই করা হয়েছে। ঘণ্টাটি আয়তাকৃতির; যা বাংলাদেশের সুলতানি আমলের অন্যান্য মসজিদের মতো গোলাকার নয়। সুলতানি আমলের মসজিদ স্থাপত্যগুলোর অলংকরণের মধ্যে পোড়ামাটির নকশা, মিনা করা টালি এবং পাথরে খোদাই করা নকশা দেখতে পাওয়া যায়। তখনকার স্থাপত্যের গায়ের অলংকণশৈলীর অধিকাংশই প্রকৃতি থেকে নেওয়া। এছাড়া সুক্ষ্ম ইটের নকশা, লতাপাতা, পদ্মফুল, ঝুলন্ত প্রদীপ ও ঘণ্টা শিকলের নকশাও রয়েছে। আগে হাম্মাদিয়া মসজিদের মেহরাবের অলংকরণাদিতে প্রকৃতিগত রং দেওয়া থাকলেও বিভিন্ন সময় মসজিদ কমিটির লোকেরা ইচ্ছেমতো নানান রঙ দিয়েছেন। তারপরেও বর্তমানে এতে লাল, সবুজ, নীল, কলমা রঙ দেখে বুঝার উপায় নেই, কোনটা আসল রঙ।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত