ঢাকা সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ইসলামি খেলাফতের ১৩০০ বছরের উত্থান-পতনের ইতিহাস

নুরুদ্দীন তাসলিম
ইসলামি খেলাফতের ১৩০০ বছরের উত্থান-পতনের ইতিহাস

সপ্তম শতাব্দী থেকে শুরু করে বিশ্বের এক বিশাল ভূখণ্ডজুড়ে একের পর এক মুসলিম রাষ্ট্র ও রাজবংশের উত্থান ঘটেছে। এই সাম্রাজ্যগুলো শুধু রাজনৈতিকভাবেই বিশ্বকে শাসন করেনি, বরং জ্ঞান-বিজ্ঞান, শাসনব্যবস্থা, স্থাপত্যকলা ও সংস্কৃতির বিকাশে অনন্য অবদান রেখে গেছে। বিশ্ব রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এবং ইসলামী সভ্যতাকে সমৃদ্ধ করা এমন কিছু প্রধান রাষ্ট্রীয় শক্তি ও মুসলিম সাম্রাজ্যের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস এখানে তুলে ধরা হলো-

খোলাফায়ে রাশেদিন (১১-৪০ হিজরি/ ৬৩২-৬৬১ খ্রিষ্টাব্দ)

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওফাতের পর ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রথম পর্যায় শুরু হয় খোলাফায়ে রাশেদিনের মাধ্যমে। আরব উপদ্বীপের গণ্ডি পেরিয়ে এই রাষ্ট্র দ্রুতই একটি আঞ্চলিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়। পশ্চিমে লিবিয়া, মিসর, সিরিয়া, ইরাক ও ইরান হয়ে পূর্বে খোরাসান পর্যন্ত এবং দক্ষিণে আরব উপদ্বীপ থেকে উত্তরে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এই খেলাফত।

পরামর্শ ও সর্বসাধারণের সম্মতির (বাইয়াত) ভিত্তিতে চারজন খলিফা পর্যায়ক্রমে এই রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেন। তারা হলেন-

হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.): তিনি রিদ্দার যুদ্ধ বা ধর্মত্যাগীদের দমন করে আরব উপদ্বীপকে ঐক্যবদ্ধ করেন এবং কোরআন সংকলনের উদ্যোগ নেন।

হজরত ওমর বিন খাত্তাব (রা.): তার আমলে সাম্রাজ্যের সীমানা ব্যাপক বিস্তৃত হয়। তিনি বিচার বিভাগ, বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তর (দেওয়ান) এবং হিজরি সন প্রবর্তন করেন।

হজরত ওসমান বিন আফফান (রা.): তিনি বিজয়ের ধারা অব্যাহত রাখেন, প্রথম মুসলিম নৌবাহিনী গঠন করেন এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে একই প্রাতিষ্ঠানিক কোরআনের অনুলিপির অধীনে ঐক্যবদ্ধ করেন।

হজরত আলী বিন আবি তালিব (রা.): তিনি খেলাফতের কেন্দ্রবিন্দু মদিনা থেকে কুফায় স্থানান্তর করেন এবং অভ্যন্তরীণ নানা সংকট ও ফেতনা মোকাবিলা করেন। তিনি ছিলেন খোলাফায়ে রাশেদিনের শেষ খলিফা।

প্রধান অর্জনসমূহ

রাষ্ট্রের বিচার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মজবুত ভিত্তি স্থাপন।

প্রথম ইসলামী নৌবাহিনী গঠন।

বসরা, কুফা ও ফুস্তাতের মতো নতুন শহর নির্মাণ ও নগর উন্নয়ন।

প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন এবং আরবি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রসার।

পতন ও সমাপ্তি

হজরত ওসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর মুসলিম জাহানে তীব্র অভ্যন্তরীণ কোন্দল শুরু হয়। খলিফা হজরত আলী (রা.) এবং আমীর মুয়াবিয়ার মধ্যে সংঘটিত সিফফিনের যুদ্ধ (৩৭ হিজরি) মুসলিম উম্মাহর মধ্যে রাজনৈতিক বিভেদ আরও বাড়িয়ে দেয়। পরবর্তীতে খারেজি সম্প্রদায়ের উত্থান এবং তাদের হাতে হজরত আলী (রা.)-এর শাহাদাতের মধ্য দিয়ে খোলাফায়ে রাশেদিনের অবসান ঘটে।

উমাইয়া খিলাফত (৪১-১৩২ হিজরি/ ৬৬১-৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ)

অভ্যন্তরীণ বিরোধের অবসান ও মুসলিমদের রক্তপাত বন্ধ করতে হজরত হাসান বিন আলী (রা.) আমীর মুয়াবিয়ার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করলে উমাইয়া বংশের সূচনা হয়। মুয়াবিয়া (রা.) তার পুত্র ইয়াজিদকে পরবর্তী উত্তরাধিকারী মনোনীত করার মাধ্যমে ইসলামী ইতিহাসে প্রথম রাজতান্ত্রিক বা বংশানুক্রমিক শাসনব্যবস্থার সূত্রপাত ঘটে।

সিরিয়ার দামেস্ককে রাজধানী করে গড়ে ওঠা এই সাম্রাজ্যে আরবীয় সংস্কৃতির প্রভাব ছিল বেশি। পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগরের তীর (মরক্কো ও স্পেন) থেকে শুরু করে পূর্বে চীনের সীমান্ত সংলগ্ন কাশগড় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে এটি এক বিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত হয়।

প্রধান খলিফাগণ

মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান: উমাইয়া বংশের প্রতিষ্ঠাতা ও দামেস্ককে রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলেন।

আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান: উমাইয়া শাসনকে পুনর্গঠিত করেন, দাপ্তরিক ভাষা আরবি করেন এবং প্রথম ইসলামী মুদ্রা চালু করেন।

ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিক: তার আমলে সিন্ধু ও স্পেন বিজয়সহ সাম্রাজ্যের ব্যাপক ভৌগোলিক ও স্থাপত্যের প্রসার ঘটে।

ওমর বিন আবদুল আজিজ: তার সংক্ষিপ্ত শাসনকাল ন্যায়বিচার, সততা এবং সুশাসনের জন্য ইতিহাসের স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।

মরওয়ান বিন মুহাম্মদ: উমাইয়া বংশের শেষ খলিফা, যিনি অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার মুখে পতন ঠেকাতে ব্যর্থ হন।

প্রধান অর্জনসমূহ

প্রশাসনিক সংস্কার, আরবি ভাষার দাপ্তরিক স্বীকৃতি ও নিজস্ব মুদ্রা প্রচলন।

কায়রোয়ান ও ওয়াসিতের মতো নতুন শহর এবং বিখ্যাত সব মসজিদণ্ডপ্রাসাদ নির্মাণ।

জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্যচর্চার প্রসার।

পতন

আরবদের অতিরিক্ত প্রাধান্য, উপজাতীয় কোন্দল এবং আব্বাসীয়দের গোপন প্রচারণার ফলে উমাইয়াদের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। অবশেষে ১৩২ হিজরিতে ঐতিহাসিক জাবের যুদ্ধে আব্বাসীয়দের কাছে উমাইয়াদের চূড়ান্ত পরাজয় ঘটে।

স্পেনের উমাইয়া ইমারত (১৩৮-৪২২ হিজরি/ ৭৫৬-১০৩১ খ্রিষ্টাব্দ)

দামেস্কে উমাইয়াদের পতনের পর আব্বাসীয়দের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া যুবরাজ আবদুর রহমান বিন মুয়াবিয়া (আবদুর রহমান দাখিল) স্পেনে পালিয়ে যান এবং সেখানে স্বাধীন উমাইয়া শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। কর্ডোভাকে রাজধানী করে গড়ে ওঠা এই রাষ্ট্রটি ইউরোপে জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও সংস্কৃতির আলো ছড়ায় এবং কর্ডোভা হয়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম প্রধান শিক্ষাকেন্দ্র।

বিখ্যাত শাসকদের যত অর্জন

স্পেনের উমাইয়া সাম্রাজ্যের প্রধান শাসক ও খলিফাদের পরিচিতি:

আবদুর রহমান দাখিল: কুরাইশ বংশের বাজপাখি বা ছকরে কুরাইশ উপাধিতে ভূষিত এই দূরদর্শী নেতা স্পেনে উমাইয়া শাসনের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি আন্দালুসে উমাইয়াদের শাসনকে শক্ত ভিত্তি প্রদান করেন এবং কর্ডোভাকে রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলেন।

আবদুর রহমান আল-আওসাত বা দ্বিতীয় আবদুর রহমান: তার শাসনকাল ছিল রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্থিতিশীল। এ সময় স্পেনে ব্যাপক নগর উন্নয়ন ও স্থাপত্যের বিকাশ ঘটে। পাশাপাশি প্রশাসনিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং রাষ্ট্রীয় নানা সংস্কারের জন্য তার আমলটি বিশেষভাবে স্মরণীয়।

তৃতীয় আবদুর রহমান বা আন-নাসের লিদ্বীনিল্লাহ: দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা দমন করে তিনি উমাইয়া সাম্রাজ্যের গৌরব ও ঐক্য পুনরুদ্ধার করেন। তার হাত ধরেই স্পেনের উমাইয়া শাসন শক্তির চূড়ায় পৌঁছায়। ৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি নিজেকে খলিফা হিসেবে ঘোষণা করেন এবং এর মাধ্যমে স্পেনের এই ইমারত বা রাজত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে খিলাফতে রূপান্তরিত হয়।

দ্বিতীয় আল-হাকাম বা আল-মুসতানসির বিল্লাহ: তার আমলে স্পেনে জ্ঞান-বিজ্ঞান? শিক্ষা ও সংস্কৃতির অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটে। বিশেষ করে তার সময়ে রাজধানী কর্ডোভার রাজকীয় লাইব্রেরি বা গ্রন্থাগারটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক খ্যাতি লাভ করেছিল।

তৃতীয় হিশাম বা আল-মুসতাদ বিল্লাহ: তিনি ছিলেন স্পেনের আন্দালুসের উমাইয়া খিলাফতের সর্বশেষ খলিফা। তার পতনের মধ্য দিয়েই স্পেনে এই বংশের শাসনের অবসান ঘটে।

গৌরবময় অর্জনসমূহ

জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির বিকাশ: এই যুগে বিজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন ও চিকিৎসা শাস্ত্রের এক অভূতপূর্ব জাগরণ ঘটেছিল। বই লেখা ও অনুবাদ শিল্পকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাপক উৎসাহিত করা হতো। পাশাপাশি জ্ঞানচর্চার প্রসারে স্পেনের আনাচে-কানাচে গড়ে তোলা হয়েছিল অসংখ্য সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার ও উচ্চাঙ্গের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

স্থাপত্য ও চারুকলা: স্পেনের উমাইয়াদের হাত ধরে স্থাপত্যশৈলীতে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। তারা দেশজুড়ে নির্মাণ করে চোখধাঁধানো সব মসজিদ, রাজপ্রাসাদ ও সুরম্য দুর্গ। এর মধ্যে কর্ডোভার গ্র্যান্ড মস্ক বা ঐতিহাসিক কর্ডোভা মসজিদ এবং বিখ্যাত মদিনাতুজ জাহরা শহর তাদের স্থাপত্যশৈলীর শ্রেষ্ঠত্বের অনন্য নিদর্শন।

কৃষি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: কৃষিকাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে তারা উন্নত ও আধুনিক সেচ ব্যবস্থা চালু করে। এর ফলে উৎপাদন যেমন বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, তেমনি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে, যা পুরো স্পেনের অর্থনীতিকে শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ করে তুলেছিল।

আব্বাসীয় খিলাফত (১৩২-৬৫৬ হিজরি/৭৫০-১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দ)

উমাইয়া বংশের পতনের পর আব্বাসীয় আন্দোলনের গৌরবময় সাফল্যের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক আব্বাসীয় খিলাফত। এই সাম্রাজ্যের খলিফারা মূলত মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আপন চাচা হজরত আব্বাসের (রা.) বংশধর ছিলেন এবং এই পারিবারিক পরিচয়কেই তারা নিজেদের শাসনের বৈধতার মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতেন।

আব্বাসীয়দের মূল প্রভাব ও শক্তির কেন্দ্রবিন্দু ছিল মুসলিম বিশ্বের পূর্ব প্রান্তে। ইরাকের বাগদাদ শহরকে তারা সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলে। খিলাফতের প্রথম দিকের সময়গুলোতে আব্বাসীয়রা তাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষমতার চরম শিখরে পৌঁছায়। তৎকালীন সময়ে এই সাম্রাজ্যের সীমানা উত্তরে আর্মেনিয়া ও ককেশাস অঞ্চল থেকে শুরু করে দক্ষিণে আরব উপদ্বীপ এবং পূর্বে ভারতের সীমান্ত ও মধ্য এশিয়া থেকে শুরু করে পশ্চিমে লিবিয়া বা মরক্কো পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তবে স্পেনের আল-আন্দালুস এবং সুদূর মরক্কো ও মধ্য মরক্কোর অঞ্চলগুলোতে আব্বাসীয়দের সম্পূর্ণ স্বাধীন ও পৃথক কিছু মুসলিম রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল।

আব্বাসীয় আমলে জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য ও চারুকলার ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব জাগরণ ও সমৃদ্ধি ঘটেছিল। তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতি ও সংস্কৃতির মূল কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল রাজধানী বাগদাদ, যা শহরটিকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত করে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই অভাবনীয় উৎকর্ষের কারণেই আব্বাসীয় খিলাফতের এই গৌরবময় অধ্যায়কে ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসে স্বর্ণযুগ বলা হয়ে থাকে।

প্রথম দিকে খলিফাদের চরম কর্তৃত্ব থাকলেও পরবর্তীতে পার্সিয়ান ও তুর্কিদের প্রভাব বাড়তে থাকে। এই দীর্ঘ ইতিহাসকে প্রধানত চারটি যুগে ভাগ করা হয়।

প্রথম যুগ (১৩২-২৩২ হিজরি): এই সময়কালটি ছিল আব্বাসীয় খলিফাদের শাসন ও ক্ষমতার স্বর্ণযুগ। খলিফাদের একক কর্তৃত্ব, সভ্যতার অভূতপূর্ব বিকাশ, জ্ঞান-বিজ্ঞানের ব্যাপক প্রসার এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য এই যুগটি সুপরিচিত। তবে এ যুগে রাষ্ট্রের অন্দরমহলে পারসিয়ান বা ফারসি সংস্কৃতির প্রভাব ও তাদের কর্মকর্তাদের আধিপত্য লক্ষ্যণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল।

দ্বিতীয় যুগ (২৩২-৩৩৪ হিজরি): এ যুগে আব্বাসীয় দরবারে তুর্কি সামরিক কর্মকর্তাদের প্রভাব ও ক্ষমতা চরম আকার ধারণ করে। কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হতে থাকায় সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বেশ কিছু স্বাধীন আঞ্চলিক রাজবংশের উত্থান ঘটে, যারা বাগদাদের খিলাফতকে কেবল নামেমাত্র বা প্রতীকীভাবে মেনে চলত। এর মধ্যে মুসলিম বিশ্বের পূর্ব প্রান্তে সাফাবীয় ও গজনভী সাম্রাজ্য এবং মিসর ও সিরিয়া অঞ্চলে তুলুনীয় ও ইখশিদীয় রাজবংশের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

তৃতীয় যুগ (৩৩৪-৪৪৭ হিজরি): এই অন্ধকার অধ্যায়ে আব্বাসীয় খলিফারা তাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা সম্পূর্ণভাবে হারান এবং পারস্য বংশোদ্ভূত বুয়াইয়াহ বা বুইদ রাজবংশের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে চলে যান। খলিফারা তখন কেবলই নামেমাত্র শাসকে পরিণত হন।

চতুর্থ যুগ (৪৪৭-৬৫৬ হিজরি): খিলাফতের এই শেষ পর্যায়ে এসে শাসনব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি চলে যায় সেলজুক তুর্কি এবং তাদের অনুগত সামন্তপ্রভু বা আতাবেকদের হাতে। সেলজুক সুলতানরাই তখন বাগদাদের শাসনদ- পরিচালনা করতেন, যা শেষ পর্যন্ত ১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দে মঙ্গোলদের বাগদাদ ধ্বংসের আগ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল।

বিখ্যাত খলিফাগণ

আবু আব্বাস আস-সাফফাহ : তিনি ছিলেন আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের মূল প্রতিষ্ঠাতা এবং এই বংশের প্রথম খলিফা। উমাইয়াদের হটিয়ে নতুন খিলাফতের গোড়াপত্তন করেন তিনি।

আবু জাফর আল-মনসুর: তাকে আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা চলে। তিনি শক্ত হাতে অভ্যন্তরীণ সব বিশৃঙ্খলা ও বিদ্রোহ দমন করেন এবং বাইরের শত্রুদের হুমকি থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করে এর ভিত মজবুত করেন। এছাড়া তিনিই ঐতিহাসিক বাগদাদ শহর নির্মাণ করে সেটিকে খিলাফতের স্থায়ী রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলেন।

মুহাম্মদ আল-মাহদি: তার শাসনকাল ছিল মূলত শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতীক। এ সময় রাজ্যে ব্যাপক নগর উন্নয়ন ও প্রশাসনিক সংস্কার করা হয়। পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং জনগণের সুবিধার্থে অসংখ্য জনকল্যাণমূলক অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়।

হারুনুর রশিদ : তার আমলে আব্বাসীয় সাম্রাজ্য শক্তি, ক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক প্রভাবের চরম শিখরে পৌঁছায়। একই সাথে স্থাপত্যকলা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্পকলা ও সাহিত্যের অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটে এবং চারদিকে এক অভাবনীয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও স্বাচ্ছন্দ্য নেমে আসে।

আবদুল্লাহ আল-মামুন: বৈজ্ঞানিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং অনুবাদ সাহিত্যের প্রসারের দিক থেকে তার আমলকে ইসলামী ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায় মনে করা হয়। গ্রিকসহ পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার জ্ঞানভাণ্ডারকে আরবিতে রূপান্তরের জোয়ার উঠেছিল এ সময়। তবে তার আমলে একটি বড় বিতর্কিত ঘটনা ছিল কোরআন সৃষ্টি তত্ত্ব নিয়ে তৈরি হওয়া চরম সংকট বা মিহনা। খলিফা নিজে মুতাজিলা মতবাদ গ্রহণ করেছিলেন এবং তা মেনে নিতে সাধারণ মানুষ ও আলেমদের বাধ্য করেছিলেন।

আল-মুতাসিম বিল্লাহ: তিনি তুর্কি দাসদের নিয়ে একটি শক্তিশালী বাহিনী গড়ে তোলার মাধ্যমে পুরো সেনাবাহিনী ঢেলে সাজান এবং রাজধানী বাগদাদ থেকে সরিয়ে সামাররা নামক একটি নতুন শহরে নিয়ে যান। তিনি অভ্যন্তরীণ সব বিদ্রোহ দমন করার পাশাপাশি ২২৩ হিজরিতে বিখ্যাত আমুরিয়ার যুদ্ধে বাইজান্টাইন বাহিনীকে এক ঐতিহাসিক ও শোচনীয় পরাজয়ের স্বাদ আস্বাদন করান।

পতনের কারণ

খলিফাদের দুর্বলতা বিলাসী জীবন এবং তুর্কি সামরিক প্রধানদের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের ফলে খিলাফত দুর্বল হতে থাকে। অবশেষে ১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দে হালাকু খানের নেতৃত্বে তাতার বাহিনী বাগদাদ আক্রমণ করে খলিফা মুসতাসিম বিল্লাহকে হত্যা করে এবং লাইব্রেরিসহ পুরো বাগদাদ শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার মাধ্যমে এই খিলাফতের অবসান ঘটায়।

ফাতিমি খিলাফত (২৫৭-৫৬৭ হিজরি/ ৯০৯-১১৭১খ্রিস্টাব্দ)

তিউনিসিয়ায় শিয়া মাজহাবের অনুসারী ফাতিমিদের উত্থান ঘটে। পরবর্তীতে তারা মিসর জয় করে এবং কায়রো শহর প্রতিষ্ঠা করে সেটিকে রাজধানী বানায়। মহানবী (সা.)-এর কন্যা ফাতেমা (রা.)-এর বংশধর দাবি করে তারা এই নামকরণ করে।

ওবায়দুল্লাহ আল-মাহদি ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা। তাদের অন্যতম বড় অর্জন ছিল বিখ্যাত আল-আজহার মসজিদ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারে দারুল হিকমাহ স্থাপন। সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী কর্তৃক মিসরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মাধ্যমে এই বংশের অবসান ঘটে।

সেলজুক সাম্রাজ্য (৪২৯-৫৯০ /১০৩৭-১১৯৭ খ্রিস্টাব্দ)

মধ্য এশিয়ার তুর্কি বংশোদ্ভূত সেলজুকরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে খোরাসান ও তার আশপাশে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আল্প আরসলানের মতো বীর সুলতানরা ১০৭১ খ্রিষ্টাব্দে মালাজগির্দের যুদ্ধে বাইজান্টাইনদের পরাজিত করে আনাতোলিয়া বা বর্তমান তুরস্কে মুসলিম বিজয়ের পথ সুগম করেন। বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফাকে রক্ষা এবং সুন্নি মতাদর্শের প্রসারে তারা নিজামিয়া মাদ্রাসার মতো বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। অভ্যন্তরীণ সিংহাসনের লড়াই ও খাওয়ারিজিম সাম্রাজ্যের উত্থানে এদের পতন ঘটে।

মামলুক সালতানাত (৬৪৮-৯২৩ হিজরি/ ১২৫০-১৫১৭ খ্রিস্টাব্দ)

মিসর ও সিরিয়াকেন্দ্রিক এই সাম্রাজ্য শাসন করত মূলত দাস বা ক্রীতদাস থেকে সামরিক উচ্চপদে আসা যোদ্ধারা যাদের মামলুক বলা হতো। সুলতান কুতুজ এবং জহির বাইবার্সের নেতৃত্বে মামলুকরা আইন জালুতের যুদ্ধে অপরাজেয় তাতার বাহিনীকে পরাজিত করে মুসলিম বিশ্বকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে। এছাড়া ক্রুসেডারদের সিরিয়া থেকে চূড়ান্তভাবে বিতাড়িত করে তারা। ১৫১৭ খ্রিষ্টাব্দে উসমানীয়দের কাছে পরাজিত হলে এই শাসনের অবসান হয়।

উসমানীয় বা অটোমান সাম্রাজ্য (৬৯৯-১৩৪২ হিজরি / ১২৯৯-১৯২৪ খ্রিস্টাব্দ)

আনাতোলিয়ায় উসমান বিন আরতুগ্রুলের হাত ধরে ছোট একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে এর যাত্রা শুরু। পরবর্তীতে এটি ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম ও দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে সুলতান মুহাম্মদ আল-ফাতেহ কর্তৃক বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল) বিজয়ের মাধ্যমে উসমানীয়রা বিশ্ব রাজনীতিতে প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে। মিসর ও সিরিয়া জয়ের পর মক্কা-মদিনার খিলাফতের দায়িত্বও তাদের কাছে চলে আসে।

সুলতান সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টের আমলে এই সাম্রাজ্য এশিয়া আফ্রিকা ও ইউরোপের তিন মহাদেশজুড়ে বিস্তৃত হয়। তবে উনবিংশ শতাব্দীতে এসে আধুনিক সামরিক প্রযুক্তির অভাব অ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থার অবক্ষয় এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের ফলে এই বিশাল সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। অবশেষে ১৯২৪ সালে মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক আনুষ্ঠানিকভাবে খিলাফত বিলুপ্ত ঘোষণা করেন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত