
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার ৮নং দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের টুনুর চর জেলার কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা। প্রায় ৪০ হাজার মানুষের বসবাস এই চরে। সারা লক্ষ্মীপুর জেলায় যে পরিমাণ সয়াবিন উৎপাদন হয়, তার প্রায় ৪০ শতাংশই আসে এখান থেকে। পাশাপাশি ধান, তরমুজ, খেসারি, তিল, বিভিন্ন সবজি ও মৌসুমি ফসল উৎপাদনের জন্যও টুনুর চর পরিচিত। কিন্তু এত বড় জনগোষ্ঠী ও উৎপাদনশীল এলাকার সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনও অত্যন্ত নাজুক। প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার মানুষ কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে মূল ভূখণ্ডে যাতায়াত করেন। অথচ তাদের চলাচলের একমাত্র অবলম্বন একটি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশ-কাঠের অস্থায়ী সাঁকো, যা স্থানীয়ভাবে ‘খেওয়াঘাট’ নামে পরিচিত। টুনুর চর ও মূল ভূখণ্ডের মধ্যে আজও কোনো স্থায়ী সড়ক বা সেতু নির্মিত হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে চরবাসী নৌকার মাধ্যমে যাতায়াত করতেন। তবে শুকনো মৌসুমে নদীর পানি কমে গেলে নৌকা ভেড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। তখন কৃষিপণ্য পরিবহন ও দৈনন্দিন চলাচলে মারাত্মক সমস্যা দেখা দেয়। কয়েক মাস আগে স্থানীয় এক ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে একটি অস্থায়ী সাঁকো নির্মাণ করে দেন। বর্তমানে মেঘনা নদীর পানি নেমে যাওয়ায় সাঁকোটি কিছুটা মেরামত করে চলাচলের উপযোগী করা হলেও এটি যেকোনো সময় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে উঠতে পারে। সরেজমিনে দেখা গেছে, বাঁশের খুঁটির ওপর পাতা পাতলা কাঠের তক্তাগুলো অনেক জায়গায় ভাঙা ও নড়বড়ে হয়ে আছে। কোথাও নেই নিরাপত্তা রেলিং, কোথাও আবার তক্তা সরে গেছে। মানুষের বা যানবাহনের চাপ পড়লেই সাঁকো দুলে ওঠে। নিচে কাদা ও পানিতে ভরা খাল, পা ফসকালেই বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। স্কুলে যাওয়া এক শিক্ষার্থী জানায়, মেঘনা নদীতে বর্ষার সময় নৌকায় উঠতে খুব ভয় লাগে। তবুও স্কুলে যেতে হয়। মোস্তফা নামে এক কৃষক বলেন, মাথায় ৫০-৬০ কেজির বস্তা নিয়ে মেঘনা নদীর উপর দিয়ে এই সাঁকো পার হতে হয়। ভয় লাগে, কিন্তু অন্য কোনো রাস্তা নেই।
ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও প্রায়ই মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত ভ্যানকে সাঁকো পার হতে দেখা যায়। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো সতর্কতা বা বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
টুনুর চর মূলত সয়াবিন উৎপাদনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। কৃষকরা জানান, শুকনো মৌসুমে মেঘনা নদীতে পানি না থাকায় নৌকা থেকে কৃষিপণ্য নামিয়ে শ্রমিক দিয়ে সাঁকো পার করে মূল সড়কে তুলতে হয়। এতে অতিরিক্ত শ্রম, সময় ও খরচ বেড়ে যায়। অনেক সময় পণ্য নষ্ট হওয়ার ঘটনাও ঘটে। সুমন হোসেন নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, অস্থায়ী সাঁকো দিয়ে পণ্য পরিবহন করতে গিয়ে বাড়তি ঝুঁকি নিতে হয়। যদি এখানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা হয়, তাহলে পরিবহন ব্যয় অর্ধেকে নেমে আসবে এবং কৃষকদের লোকসান অনেক কমে যাবে।
আবদুর রহিম নামে এক বাসিন্দা জানান, এই সাঁকো শুধু শুকনো মৌসুমের জন্য সাময়িক সমাধান। বর্ষা মৌসুমে মেঘনা নদী ফুলে উঠলে সাঁকো ডুবে যায় এবং তখন আবার নৌকার ওপরই নির্ভর করতে হয়। গর্ভবতী নারী, রোগী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য নৌযাত্রা অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের অভিযোগ, টুনুর চরের যোগাযোগ ব্যবস্থার স্থায়ী সমাধানের দাবিতে তারা বহুবার ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছেন। কিন্তু এখনও কোনো প্রকল্প অনুমোদনের আশ্বাস পাওয়া যায়নি। তাদের দাবি, অন্তত একটি মজবুত অস্থায়ী কাঠের সেতু নির্মাণ করা হলেও চলাচলের ঝুঁকি অনেকটাই কমবে।
সোহেল নামে এক যুবক বলেন, জেলার বড় অংশের সয়াবিন আমরা উৎপাদন করি। অথচ আমাদের জন্য যাতায়াতের একটি নিরাপদ সেতুও নেই, এটাই সবচেয়ে কষ্টের। ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হারুন হাওলাদার জানান, টুনুর চরে সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
বারবার তাগাদা দেওয়া হলেও এখনও প্রকল্প অনুমোদন পাওয়া যায়নি। চরবাসীর দাবি, একটি স্থায়ী সেতু নির্মিত হলে শুধু কৃষি নয়, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নেও বড় পরিবর্তন আসবে। যোগাযোগের দুরবস্থার কারণে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না। ফলে অল্প বয়সে ঝরে পড়া ও বাল্যবিয়ের মতো সামাজিক সমস্যাও বাড়ছে। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মেহেদী হাসান কাউছার বলেন, টুনুর চরের যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থা সম্পর্কে প্রশাসন অবগত। এলাকাবাসীর দাবি ও প্রয়োজন বিবেচনায় বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। অস্থায়ীভাবে ভোগান্তি কমানো এবং স্থায়ী সেতু নির্মাণের সম্ভাবনাও গুরুত্বসহকারে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। চরবাসীর আশা, উন্নত সড়ক নয়, তাদের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন একটি নিরাপদ ও স্থায়ী সেতু। এক বৃদ্ধার ভাষায়, একটা সেতুই আমাদের জীবন বদলে দিতে পারে।