ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ২৪ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

তিস্তার বুক তামাকের দখলে

বিষাক্ত রাসায়নিক ও কীটনাশকে হুমকির মুখে মৎস্য প্রজনন
তিস্তার বুক তামাকের দখলে

রংপুর অঞ্চলের চরাঞ্চলজুড়ে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে তামাকচাষ। অধিক লাভের আশায় কৃষকের ঝোঁক বাড়লেও এই চাষে ব্যবহৃত অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক তিস্তার পানি দূষিত করে তুলছে। ফলে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে মাছসহ নানা জলজ প্রাণীর প্রজনন এবং নদীর প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রংপুর ,নীলফামারী লালমনিরহাট, কুড়িগ্রামও গাইবান্ধা জেলার তিস্তার চরাঞ্চলে বিশেষ করে গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, পীরগাছা, পঅরগাছা, সুন্দরগঞ্জ আদিতমারী, কালীগঞ্জ ও হাতীবান্ধা উপজেলায় তামাকচাষের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। শুষ্ক মৌসুমে ধান, গম, ভুট্টা, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ সম্ভব হলেও অধিক মুনাফার কারণে কৃষকরা দিন দিন তামাক চাষের দিকেই ঝুঁকছেন। কৃষকদের দাবি, তামাকচাষে খরচ হলেও লাভ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। গত দুই দশকে তামাক কোম্পানিগুলোর প্ররোচণা ও সহজ শর্তে ঋণ প্রদান এবং আগাম চুক্তিভিত্তিক ক্রয়ব্যবস্থার কারণে এই প্রবণতা দ্রুত বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তামাকচাষে অন্যান্য ফসলের তুলনায় ৫ থেকে ৬ গুণ বেশি রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়, যা সরাসরি পরিবেশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার চর মহিপুর এলাকার কৃষক সামাদ সরকার প্রতিবেদককে বলেন, আমি প্রায় ২৫ বছর ধরে প্রতি মৌসুমে ১২ থেকে ১৫ বিঘা জমিতে তামাক চাষ করছি। ‘অন্য ফসলেও ফলন হয়, কিন্তু লাভ কম। তামাকেই আয় বেশি’। তবে পানি দূষণ নিয়ে প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানি কম থাকে, মাছও কম থাকে। তাই শুধু তামাকচাষের জন্য মাছ কমছে এটা পুরোপুরি ঠিক নয়’। একই মত প্রকাশ করেছেন একই এলাকার কৃষক মজিদ মিয়া, তিনি বলেন, ‘আগে আমরা গম, কাউন, পেঁয়াজ-রসুন চাষ করতাম। এখন সবাই তামাক করছি। খরচ বেশি হলেও লাভ অনেক বেশি’। তবে তিনি স্বীকার করেন, রাসায়নিক ব্যবহারে কিছুটা পানি দূষণ হয়। অন্যদিকে স্থানীয় জেলেরা এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। তাদের দাবি, তামাক চাষের কারণেই তিস্তা নদীর মাছ দিন দিন কমে যাচ্ছে এবং প্রজনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একই এলাকার জেলে মিলন বলেন, ‘তামাকচাষ শুরু হওয়ার আগে তিস্তায় অনেক মাছ পাওয়া যেত। এখন নদী প্রায় ফাঁকা। শুষ্ক মৌসুমে তো পানি থাকে না, বর্ষাতেও আগের মতো মাছ নেই’। তিনি অভিযোগের সুরে বলেন, ‘তামাকচাষে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারে পানি দূষিত হচ্ছে। এতে মাছের ডিম নষ্ট হচ্ছে, প্রজনন কমে যাচ্ছে। ফলে আমাদের জীবিকা হুমকিতে পড়ছে।’

এ ব্যাপারে পরিবেশবীদরা বলছেন, তিস্তার চরাঞ্চলে নির্বিচারে তামাকচাষ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে নদীর জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে মাটির উর্বরতা হ্রাস, ভূগর্ভস্থ পানির দূষণ এবং মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা তামাকচাষ নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন, বিকল্প লাভজনক ফসলের চাষে কৃষকদের উৎসাহ প্রদান, এবং নদী রক্ষায় সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) কৃষিবিদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, চরাঞ্চলের জমি অস্থায়ী হওয়ায় নিয়মিত জরিপ করা কঠিন। কৃষকদের তামাকচাষ থেকে বিরত থাকতে বলা হলেও তামাক কোম্পানির প্রভাবের কারণে তারা তা মানছেন না। এতে খাদ্যশস্য উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।

রংপুর বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক আয়নাল হক জানান, দুই যুগ আগেও তিস্তা নদীতে ১৪০ থেকে ১৫০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ প্রজাতিতে, তাও অল্প পরিমাণে। তার মতে, ‘শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকটের পাশাপাশি তামাক চাষে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত