ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ২৪ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ফলন ভালো, দাম কম থাকায় ক্ষতির মুখে ফরিদপুরের পেঁয়াজ চাষিরা

ফলন ভালো, দাম কম থাকায় ক্ষতির মুখে ফরিদপুরের পেঁয়াজ চাষিরা

ফরিদপুর, বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলা। এই অঞ্চলের কৃষকরা প্রতি বছর ব্যাপকভাবে পেঁয়াজ চাষে অংশ নেন এবং আশা করে ভালো ফলন ও লাভের। তবে বছরের এই সময়ে, ফলন ভালো হলেও বাজারে কম দর, ঋণের চাপ এবং সরবরাহের অতিরিক্ততা কৃষকদের স্বপ্নকে প্রায়ই ক্ষতির হিসাবেই পরিণত করছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই বছর পুরো জেলায় ৪৭,০৩৬ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়েছে। সদর উপজেলায় চাষের পরিমাণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেন জানান, ‘সদর উপজেলায় এ বছর ৪,৮৯০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়েছে। এটি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬০০ হেক্টর বেশি।’ এই অতিরিক্ত চাষ এবং অতিরিক্ত সরবরাহের ফলে বাজারে দাম কমে যাওয়ায় কৃষকরা বিপুল লোকসানের মুখোমুখি হচ্ছেন। কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রমিক মজুরি এবং সেচসহ প্রতি মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ পড়েছে প্রায় ১৩০০-১৫০০ টাকা। কিন্তু বাজারে বর্তমানে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৭০০-১১০০ টাকায়, যা উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম। এর ফলে কৃষকরা প্রতি মণ পেঁয়াজে ৫০০-৬০০ টাকা লোকসান করছেন।

চরমাধবদিয়া ইউনিয়নের ওয়াজদ্দিন মুন্সি গ্রামের কৃষক বাদশা খান বলেন, ‘ফলন ভালো হলেও দাম কম থাকায় খরচও উঠছে না। অনেকেই ধার-দেনা করে চাষ করেছেন, এখন সেই টাকা পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।’ সালথা, নগরকান্দা, ভাঙ্গা, বোয়ালমারী ও মধুখালী উপজেলায়ও একই ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। অনেক কৃষক খেত থেকে সরাসরি পেঁয়াজ তুলছেন, আবার কেউ বস্তায় ভরে পাইকারি বাজারে পাঠাচ্ছেন। তবে বাজারে ক্রেতার তুলনায় বিক্রেতার সংখ্যা বেশি হওয়ায় দাম বাড়ছে না।

সংরক্ষণ প্রযুক্তিতে নতুন সম্ভাবনা : ফলন ভালো হলেও দাম কম হওয়ায় কৃষকরা নতুন প্রযুক্তির দিকে আশার চোখ রেখেছেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য এয়ার ফ্লো মেশিন, অর্থাৎ ব্লোয়ার মেশিন ব্যবহার করছে। উপ-পরিচালক মো. শাহাদুজ্জামান জানান, ‘পুরো জেলায় সরকারি প্রণোদনা ও প্রকল্পের মাধ্যমে মোট ২,১০০টি ব্লোয়ার মেশিন দেওয়া হয়েছে। ফরিদপুর সদর উপজেলায় এরইমধ্যেই ৭০টি মেশিন বিতরণ করা হয়েছে এবং আরও ৯০টি প্রকল্পের আওতায় দেওয়া হবে। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করলে কৃষকরা পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে বাজারের চাপ থেকে মুক্ত হয়ে ভালো দামে বিক্রি করতে পারবেন।’

এই ব্লোয়ার মেশিন এবং আধুনিক সংরক্ষণ ঘরগুলোতে কিছু উল্লেখযোগ্য সুবিধা রয়েছে : পেঁয়াজের পচন রোধে সহায়ক, ৯-১০% শুকিয়ে যাওয়া কমানো সম্ভব। প্রতিটি মেশিন ২০০-৩০০ মণ পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে সক্ষম। বিদ্যুতের খরচ কম, মাসে মাত্র ৫০০-৬০০ টাকা, এবং সাধারণ টিন বা ইটের ঘরেও স্থাপনযোগ্য। আধুনিক সেন্সরযুক্ত ঘরে আর্দ্রতা এবং বায়ু নিষ্কাশন নিয়ন্ত্রণ করা যায়, যা সংরক্ষিত পেঁয়াজের গুণমান বজায় রাখতে সহায়ক। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড (ইঈঈঞঋ) এবং বিভিন্ন কৃষি পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় ফরিদপুরে পেঁয়াজ সংরক্ষণ ও অভিযোজন প্রকল্প চালু রয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকরা শুধু পেঁয়াজ সংরক্ষণে সক্ষম হচ্ছেন না, বরং বাজারের দামের উত্থান-পতন থেকে লাভজনকভাবে বের হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

বাজার চ্যালেঞ্জ এবং কৃষকের দাবি : কৃষকরা মনে করছেন, ধান বা গমের মতো পেঁয়াজেরও সরকারি ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করা উচিত। এছাড়া ইউনিয়ন পর্যায়ে কোল্ড স্টোরেজ সুবিধা গড়ে তোলার মাধ্যমে তারা তাৎক্ষণিক কম দামে বিক্রি না করে পরবর্তীতে ভালো দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে সক্ষম হবেন।

তালমা বাজারসহ জেলার বিভিন্ন পাইকারি হাটে দেখা গেছে, নগদ অর্থের প্রয়োজন মেটাতে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করছেন। এতে তাদের লোকসান বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষকরা জানাচ্ছেন, ঋণের বোঝা, বাজারের অনিশ্চয়তা এবং আবহাওয়ার প্রভাব- এই তিনটি কারণে পেঁয়াজ চাষে লাভের ছবি শুধু আংশিক।

সদর উপজেলার কৃষকরা আশা করছেন, আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং সরকারি সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ভবিষ্যতে তারা বাজারের চাপ কমিয়ে লাভজনক বিক্রির সুযোগ পাবেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগ এবং ব্লোয়ার মেশিনের বিতরণ কৃষকদের জন্য নতুন আশার আলো হিসেবে দেখা দিয়েছে।

কৃষকের চোখে নতুন সম্ভাবনা : ফলন ভালো হলেও বাজারের অনিশ্চয়তা এবং ঋণভারের চাপ কৃষকের স্বপ্নকে প্রায়ই ক্ষতির হিসাবেই পরিণত করছে। তবে আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং সরকারি উদ্যোগের সমন্বয়ের ফলে কৃষকরা এখন আত্মবিশ্বাসীভাবে আশা করতে পারেন- যদি তারা কিছুদিন পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে রাখেন, তবে বাজারে চাপ কমার সঙ্গে সঙ্গে ভালো দামে বিক্রি করতে সক্ষম হবেন।

ফরিদপুর সদর উপজেলায় ৭০টি ব্লোয়ার মেশিন বিতরণ করা হয়েছে এবং জেলায় মোট ২,১০০ মেশিন বিতরণ কার্যক্রম চলমান। এই উদ্যোগ শুধু কৃষকদের জন্য নতুন আশা নয়, বরং সমন্বিত বাজার ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পেঁয়াজ চাষকে আরও লাভজনক ও স্থিতিশীল করার পথও দেখাচ্ছে।

ফলে দেখা যাচ্ছে, পেঁয়াজ চাষের লাভণ্ডক্ষতির হিসাব শুধুমাত্র ফলনের উপর নির্ভর করছে না। আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তি, সরকারি প্রণোদনা এবং বাজারে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষকরা ভবিষ্যতে নিজেরা স্থিতিশীল আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারবেন। ফরিদপুরের পেঁয়াজ চাষিরা এখন নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে পেঁয়াজ চাষকে লাভজনক এবং টেকসই করার চেষ্টা করছেন।

সার্বিকভাবে বলা যায়, ফরিদপুরে পেঁয়াজ চাষিকে এখনও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি ও সরকারি সমন্বিত উদ্যোগ তাদের জন্য এক নতুন আশার দিক উন্মোচন করেছে, যা ভবিষ্যতে পেঁয়াজ চাষিকে লাভের পথে ফিরিয়ে আনতে পারে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত