ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

চান্দিনায় মাল্টা চাষ আশা জাগাচ্ছে

চান্দিনায় মাল্টা চাষ আশা জাগাচ্ছে

সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে থোকায় থোকায় মালটা। কোনো কোনো ডাল ফলের ভারে নুয়ে পড়ার উপক্রম। জুন-জুলাইয়ের এই কচি রোদে মাঠের সবুজ যেন এসে ভর করেছে বাড়ির আঙিনায়। এটি কোনো দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের বা দূরদেশের ফলের বাগান নয়, বরং কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার প্রত্যন্ত মেহার গ্রামের এক সাধারণ গৃহবধূর অসাধারণ কীর্তি। মেহার গ্রামের শিরিনা আক্তার তার বাড়ির সামান্য আঙিনাকে কাজে লাগিয়ে ফলিয়েছেন এই সবুজ সোনা। তার এই মালটা গাছ এখন শুধু তার পরিবারের পুষ্টির উৎসই নয়, বরং পুরো গ্রামের মানুষের জন্য এক পরম বিস্ময় ও অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

গৃহস্থালির চেনা চৌকঠ পেরিয়ে গ্রামীণ নারীরা যে এখন কৃষিতেও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারেন, শিরিনা আক্তার তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শখের বশে বাড়ির এক কোণে রোপণ করা একটি মাত্র মালটা গাছ আজ রূপ নিয়েছে এক দৃষ্টিনন্দন ও ফলবান বৃক্ষে। বর্তমানে গাছটিতে থোকায় থোকায় মালটা শোভা পাচ্ছে। সম্পূর্ণ রাসায়নিক মুক্ত এবং প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা এই গাছে ফলের সমারোহ দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। একটি সাধারণ গাছের হাত ধরে যে মেহার গ্রামে মালটা চাষের এমন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, তা আগে কেউ ভাবেনি। শিরিনা আক্তারের এই মালটা গাছের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর ফলন এবং ফলের প্রকৃতি। থোকায় থোকায় ধরে থাকা এই মালটাগুলো আকারে বেশ পুষ্ট এবং দেখতে চমৎকার সবুজ। সাধারণত বাজারে আমরা যে বিদেশি মালটা দেখি, সেগুলো পাকার পর পুরো হলুদ রঙ ধারণ করে। কিন্তু দেশীয় জাতের এই মালটাটি পরিপক্ব হওয়ার পরও তার গায়ে লেপ্টে থাকে গাঢ় সবুজ আভা। গাছ থেকে সদ্য পেড়ে আনা এই ফলের ঘ্রাণেই লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত সতেজতা। তবে সবচেয়ে কৌতূহল জাগায় এর স্বাদ। শিরিনা আক্তারের গাছের মালটার স্বাদ বাজারের অতিরিক্ত মিষ্টি বা কড়া মিষ্টির মতো নয়। এটি অত্যন্ত রসালো, যার স্বাদ সাধারণ পানির চেয়ে কিছুটা মিষ্টি। অতিরিক্ত মিষ্টি না হওয়ায় এই ফলটি যেমন তৃষ্ণা মেটাতে দারুণ কার্যকর, তেমনই ডায়াবেটিস রোগীসহ স্বাস্থ্য সচেতন যেকোনো মানুষের জন্য এক চমৎকার প্রাকৃতিক টনিক।

এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে শিরিনা আক্তারের নীরব পরিশ্রম ও পরম যত্ন। গ্রামীণ নারীরা সারাদিন সংসারের হাজারো কাজের ব্যস্ততার মাঝেও যে একটুখানি সময় বের করে প্রকৃতির পরিচর্যা করতে পারেন, তিনি তা প্রমাণ করেছেন। প্রতিদিন নিয়ম করে গাছে জল দেওয়া, চারপাশের আগাছা পরিষ্কার করা এবং জৈব সার ব্যবহারের মাধ্যমেই আজ এই গাছটি ভরে উঠেছে ফলে ফলে। কোনো রকম বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ছাড়া, কেবল পরিবারের ফল ও পুষ্টির চাহিদা মেটানোর লক্ষ্য নিয়েই তিনি এই যাত্রা শুরু করেছিলেন। আজ যখন গাছের ডালগুলো ফলে সয়লাব হয়ে গেছে, তখন তার সেই পরিশ্রম যেন সার্থকতা খুঁজে পেয়েছে।

চান্দিনার আবহাওয়া ও মাটি যে মালটা চাষের জন্য কতটা উপযোগী, মেহার গ্রামের এই আঙিনা চাষ তার এক জীবন্ত প্রমাণ। সাধারণত পাহাড়ি অঞ্চলের ফল হিসেবে পরিচিত হলেও সঠিক যত্ন পেলে সমতলের মাটিতেও যে থোকায় থোকা মালটা ফলানো সম্ভব, তা শিরিনা আক্তার দেখিয়ে দিয়েছেন। তার এই সাফল্য দেখে এখন মেহার গ্রামের অনেকেই উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। বাড়ির আশেপাশের পতিত জমি বা আঙিনার খালি জায়গায় কীভাবে দু-একটি ফলের গাছ লাগিয়ে পারিবারিক পুষ্টির অভাব দূর করা যায়, সেই চিন্তাভাবনা শুরু করেছেন প্রতিবেশীরাও। শিরিনা আক্তারের আঙিনার এই সবুজ মালটা গাছটি কেবল একটি ফলদ বৃক্ষ নয়, এটি মেহার গ্রামের জন্য এক নীরব সবুজ বিপ্লবের বার্তা। সামান্য ইচ্ছা আর সঠিক পরিচর্যা থাকলে যে ঘরের কোণেই প্রকৃতির আশীর্বাদ নামিয়ে আনা যায়, এই থোকায় থোকা সবুজ মাল্টাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। পানির চেয়ে একটু মিষ্টি স্বাদের এই ফলগুলো যেমন মেটাচ্ছে রসনা, তেমনই গ্রামীণ নারীদের স্বাবলম্বী ও সৃজনশীল হওয়ার পথে দেখাচ্ছে এক নতুন আলোর দিশা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত