ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

কালের সাক্ষী ৫০০ বছরের পুরোনো শিমুল গাছ

কালের সাক্ষী ৫০০ বছরের পুরোনো শিমুল গাছ

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার সাখুয়া ইউনিয়নের বালির বাজার সংলগ্ন এলাকায় চিনু মোড়লের বাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল আকৃতির এক প্রাচীন শিমুল গাছ। স্থানীয়দের বিশ্বাস, গাছটির বয়স অন্তত পাঁচশ বছর। দীর্ঘ সময়ের সাক্ষী হয়ে এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এই শিমুল গাছকে ঘিরে রয়েছে নানা লোককথা, বিশ্বাস, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গল্প।

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ভরপুর এই প্রাচীন বৃক্ষটি শুধু একটি গাছ নয়, স্থানীয়দের কাছে এটি এলাকার ঐতিহ্য ও স্মৃতির প্রতীক। দূর থেকে দেখলেই চোখে পড়ে এর বিশাল কাণ্ড ও বিস্তৃত ডালপালা। গাছটির নিচে দাঁড়ালে নিজের অস্তিত্ব যেন ক্ষুদ্র মনে হয়। অনেকে আবার এর বিশালত্বকে পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে থাকার অনুভূতির সঙ্গে তুলনা করেন।

প্রতি বছর ফাল্গুন মাসে গাছটি যখন টকটকে লাল শিমুল ফুলে ভরে ওঠে, তখন সৃষ্টি হয় এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। লাল ফুলের সমারোহে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে রঙিন। ফুলের মধু সংগ্রহে মৌমাছির গুঞ্জন, বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আনাগোনা এবং প্রকৃতিপ্রেমীদের ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে আশপাশের পরিবেশ। স্থানীয়দের মতে, এই সময় গাছটির সৌন্দর্য উপভোগ করতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন।

গাছটিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জনপদে প্রচলিত রয়েছে নানা লোকবিশ্বাস। অনেকেই মনে করেন, এই গাছের সঙ্গে অলৌকিক শক্তির সম্পর্ক রয়েছে। সেই বিশ্বাস থেকে কেউ কেউ মনের আশা পূরণের উদ্দেশ্যে এখানে মানত করেন। মানত পূরণ হলে গরু, খাসি বা মোরগ জবাই করে রান্নাবান্নার আয়োজন করেন এবং স্থানীয়দের মাঝে খাবার বিতরণ করেন। স্থানীয় বাসিন্দা মোকছেদ আলী বলেন, এই গাছটি কাটার জন্য অনেকেই চেষ্টা করেছে, কিন্তু কেউ সফল হতে পারেনি। বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে শুনেছি, গাছ কাটতে গিয়ে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, আবার কেউ নাকি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। সত্য-মিথ্যা জানি না, তবে এলাকাবাসীর মধ্যে এ ধরনের বিশ্বাস এখনও রয়েছে। গাছটি আমাদের এলাকার ঐতিহ্যের অংশ। জমির মালিক ইউসুফ আলী জানান, পূর্বপুরুষদের মুখে শুনে আসছি, এই শিমুল গাছটি কয়েক শতাব্দী ধরে এখানে দাঁড়িয়ে আছে। গাছটি নিয়ে নানা অলৌকিক ঘটনার কথাও প্রচলিত রয়েছে। তবে এসবের বাইরে এটি আমাদের এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য এবং প্রাকৃতিক সম্পদ। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, একসময় আশপাশে এমন বড় বড় গাছের সংখ্যা বেশি থাকলেও সময়ের পরিবর্তনে অধিকাংশই হারিয়ে গেছে। কিন্তু নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এই শিমুল গাছটি এখনও টিকে আছে, যা স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পাখি, মৌমাছি ও অন্যান্য উপকারী প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করছে গাছটি। প্রকৃতিপ্রেমীদের মতে, যথাযথ পরিচর্যা ও সংরক্ষণ করা হলে প্রাচীন এই শিমুল গাছটি ত্রিশালের একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এতে স্থানীয় পর্যটনের সম্ভাবনাও সৃষ্টি হবে।এ বিষয়ে ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরাফাত সিদ্দিকী বলেন, গাছটির বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী গাছ সংরক্ষণে উপজেলা প্রশাসন আন্তরিকভাবে কাজ করবে।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন শিমুল গাছ আজও ইতিহাস, লোকবিশ্বাস, প্রকৃতির সৌন্দর্য ও স্থানীয় ঐতিহ্যের এক জীবন্ত সাক্ষী হয়ে ত্রিশালের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত