
টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে রোগী ও তাদের স্বজনদের জন্য বরাদ্দকৃত ১২ টি লিফটের ৫টি নষ্ট থাকায় সেবাগ্রহীতা ও তাদের স্বজনদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ক্ষেত্রে এই লিফট সংকট মারাত্মক বিড়ম্বনার সৃষ্টি করেছে। চিকিৎসাসেবা নিতে আসা অধিকাংশ রোগী ও তার স্বজনদের লিফটের জন্য হাসপাতালের বিভিন্ন ফ্লোরে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়। লিফট নষ্টের বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গণপূর্ত বিভাগের ওপর দায় চাপিয়ে নিজেদের দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যায়। ২০১৪ সালে স্থাপিত টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অবকাঠামো ও আধুনিক সুবিধার প্রত্যাশা থাকলেও হাসপাতালটির সেবা ব্যবস্থাপনার মান নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। জনবল সংকট, অবকাঠামোগত সমস্যা, পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি, চিকিৎসক-স্টাফদের অনুপস্থিতি এবং লিফট বিকল থাকার মতো বিষয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। সরেজমিন গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১১ টায় টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের প্রথম তালায় লিফট গুলোর সামনে রোগী ও তাদের স্বজনদের সারি সারি দীর্ঘ লাইন।
তারা জানায়, ১৫ তলা হাসপাতালে বিভিন্ন ফ্লোরে যেতে লিফটের কোন বিকল্প নেই। তাই তারা মুমূর্ষু রোগী নিয়ে লিফটের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। বেলা১২ টায় হাসপাতালের পঞ্চম তলায় গিয়ে দেখা যায়, গুরুতর অসুস্থ্ রহিমা খাতুন লিফটের জন্য অপেক্ষা করতে করতে অচেতন হয়ে পড়েছেন। স্বজনরা জানায়, রহিমা এসেছেন অর্থোপেডিক বিভাগে। ডাক্তার দেখানোর পর নিচ তলায় নামতে লিফটের জন্য অপেক্ষা করছিলেন তারা। এমতাবস্থায় অবস্থায় তিনি অচেতন হয়ে যায়।
বহুতল হাসপাতাল ভবনে রোগী, স্বজন ও হাসপাতালের কর্মীদের জন্য লিফট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ রোগী, অস্ত্রোপচার-পরবর্তী রোগী, বয়স্ক ব্যক্তি ও হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য লিফটের বিকল্প খুবই সীমিত। সরেজমিন দেখা যায়, হাসপাতালের বহুতল ভবনের বেশিরভাগ লিফট প্রায়ই নষ্ট থাকে। ফলে রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তির শেষ নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, বর্তমানে হাসপাতালের জন্য ডাক্তার, স্টাফ ও নার্সসহ ৭৪০জন জনবলের বিপরীতে মাত্র ৩২২ জন কর্মরত রয়েছেন। ৫০০ শয্যার বিপরীতে হাসপাতালে প্রায় সাড়ে আটশত রোগী ভর্তি রয়েছে। অতিরিক্ত রোগী ও তার স্বজনদের সামলাতে অপ্রতুল জনবল নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে ডাক্তার ও নার্স ও স্টাফদের। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসাআব্দুল কাদের, সুজন মিয়া ও সাহানা বেগম জানায়, লিফটের জন্য ৩০ মিনিট ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, প্রচুর ভিড় আর লম্বা লাইন থাকায় এখনো ডাক্তার দেখাতে পারেননি।
মুমূর্ষু রোগী নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক রোগীর স্বজন অভিযোগ করে জানান, তার মার যদি চিকিৎসার কোন ব্যত্যয় ঘটে সেটা এই লিফটের কারণেই হবে। অপর একজন অসুস্থ রোগী সকাল দশটায় এসেছে লিফটে ভিড়ও লম্বা লাইন থাকায় সে বেলা সারে বারোটায়ও ডাক্তার দেখাতে পারেননি। এ ব্যাপারে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. আব্দুল কুদ্দুস বলেন, হাসপাতালের ১২টি লিফটের মধ্যে বর্তমানে ৫টি লিফট বিকল রয়েছে। লিফট মেরামতের বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগ বারবার চিঠি দেয়া সত্ত্বেও তারা কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। এছাড়া ১২টি লিফট রক্ষণাবেক্ষণ এর পুরো দায়িত্ব গণপূর্ত বিভাগের। গণপূর্ত বিভাগ ওটিজ ও ক্রিয়েটিভ এই দু'টি কোম্পানির মাধ্যমে লিফট গুলো সারা বছর রক্ষণাবেক্ষণ করিয়ে থাকে গণপূর্ত বিভাগ। তিনি আরও জানান, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সমস্ত ক্রয় ইজিপি টেন্ডারের মাধ্যমে হয়, এখানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোন হাত নেই।
তিনি আরও বলেন, অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের সুপারভাইজারগণ অভিযোগগুলো মীমাংসা করে থাকেন। এছাড়া হাসপাতালে ৭৪০ জন জনবলের বিপরীতে মাত্র ৩২২ জন থাকায় সমস্যার সমাধানে কিছুটা হিমশিম খেতে হচ্ছে। লিফটের অভিযোগ প্রসঙ্গে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শম্ভুরাম পাল বলেন, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২ টি লিফট স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭টি চালু আছে। ৫টি বিকল লিফট আমরা এখনো চালু করতে পারিনি। তবে আমাদের কার্যক্রম চলমান আছে। বিকল লিফট গুলোতে অনেক দামি পার্টস প্রয়োজন। যা টাঙ্গাইলে পাওয়া যায় না। ঢাকা থেকে আনতে হয়। এ বিষয়ে আমি লিফট কোম্পানিকে এরইমধ্যে অবহিত করেছি। আমাদের রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ বাৎসরিক ব্যয় ধরা আছে মাত্র ১২ লক্ষ টাকা। এই টাকা ১২টি লিফট রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিতান্তই অপ্রতুল। তবে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাকি ৫টি চালু হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ।