
নারায়ণগঞ্জের পোশাক খাতে রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়লেও অভ্যন্তরীণ নানা সংকটে শিল্পটির ওপর চাপ বাড়ছে। গত তিন বছরে জেলার সাড়ে পাঁচ শতাধিক পোশাক ও সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে দেড় শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে প্রায় ৬০ হাজার শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট শিল্পমালিকদের সূত্রে জানা গেছে।
কারখানার মালিকরা বলছেন, একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও শ্রমিকসংক্রান্ত সমস্যায় চাপে রয়েছেন তারা। বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জে একসময় সাড়ে পাঁচ শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছিল। গত তিন বছরে ৯১টি নিটিং, ৫৬টি গার্মেন্টস ও ১৩টি প্রিন্টিং কারখানাসহ দেড় শতাধিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে আগে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার শ্রমিক কাজ করলেও বর্তমানে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ২ লাখে নেমে এসেছে। বর্তমানে বিসিক শিল্পনগরীতে চার শতাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের অন্যতম প্রধান সমস্যা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট। নিটিং, ডাইং ও প্রিন্টিং কারখানায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় বয়লার ও উৎপাদন ইউনিট স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পরবর্তী ধাপের কারখানাগুলোতেও এর প্রভাব পড়ছে।
বিকেএমইএর এক জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৭৮ শতাংশ নিট পোশাক কারখানা কোনো না কোনো সময় আংশিক উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। প্রায় ৮৭ শতাংশ কারখানা পণ্য পাঠাতে বিলম্বের মুখে পড়েছে। এছাড়া ৯০ শতাংশ কারখানা বিদ্যুৎ এবং প্রায় ৭৫ শতাংশ কারখানা গ্যাস সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জরিপে উঠে এসেছে।
জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানকে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে নির্ধারিত দামে পণ্য সরবরাহ করতে হওয়ায় বাড়তি ব্যয়ের পুরোটা ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে উদ্যোক্তাদের লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে।
জরিপে অংশ নেওয়া ৫৫ শতাংশ কারখানা জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা তাদের ক্রয়াদেশ বাতিল বা কমিয়েছে। প্রায় ৬০ শতাংশ কারখানাকে ক্রেতাদের ছাড় দিতে হয়েছে। প্রায় ৫৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ব্যাংকঋণ খেলাপির ঝুঁকিতে রয়েছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাক রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ১১ দশমিক ৪২ শতাংশ বেড়েছে। আগস্টে দেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ এবং নিট পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
এ বিষয়ে মোহাম্মদ হাতেমসহ বিভিন্ন শিল্প মালিক ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন সুযোগ কাজে লাগাতে হলে নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
পাশাপাশি ব্যাংকঋণের চাপ কমানো, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং শ্রমিক-শিল্পমালিক সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তা না হলে রপ্তানি বাড়লেও এর সুফল স্থানীয় শিল্প ও কর্মসংস্থানে পুরোপুরি প্রতিফলিত হবে না।