ঢাকা শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ফসলভরা মাঠে ইঁদুরের হানা, দুশ্চিন্তায় কৃষক

ফসলভরা মাঠে ইঁদুরের হানা, দুশ্চিন্তায় কৃষক

সোনালি স্বপ্নের সোনালি দিন। কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে এখন শুধুই সবুজ আর সবুজের সমারোহ। বাতাসের দোলায় দোলে আমন ধানগাছের লকলকে সবুজ পাতা। উপজেলা কৃষি অফিসের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ও দিকনির্দেশনায় প্রতি বছরের ন্যায় এবারও চান্দিনা উপজেলায় আমন ধানের ব্যাপক চাষাবাদ হয়েছে। সরকারি ও স্থানীয় কৃষি ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী দেখা যায়, এ বছর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রায় ৯,১২৪ একর জমিতে আমন ধানের আবাদ করা হয়েছে। ভোরের আলো ফুটতেই ধানক্ষেতে নেমে পড়েন কঠোর পরিশ্রমী কৃষকেরা। সার ও পানি দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে দিনভর ধানক্ষেতের পরিচর্যায় চরম ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। ফসলের বর্তমান সতেজ অবস্থা দেখে সাধারণ ধান চাষীরা অত্যন্ত আশাবাদী ছিলেন যে, আগামী আমন মৌসুমে তারা যে লক্ষ্য নিয়ে চাষাবাদ শুরু করেছিলেন, তা অনায়াসেই পূরণ হবে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের এই হাসিমুখের আড়ালেই হঠাৎ জমাট বাঁধতে শুরু করেছে গভীর দুশ্চিন্তার কালো মেঘ। সবুজে ঘেরা এই সম্ভাবনাময় আমন ক্ষেতগুলোর বেশ কিছু এলাকায় এখন উৎসবের আমেজের বদলে নেমে এসেছে চরম হতাশা ও হাহাকার। চান্দিনার কিছু কিছু এলাকায় ইঁদুরের মাত্রাতিরিক্ত উপদ্রবের কারণে চাষিরা রীতিমতো মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ও উল্লেখযোগ্য চিত্র দেখা গেছে মাইজখার ইউনিয়নের মেহার গ্রামে। গ্রামটির মাঠে মাঠে এখন সুন্দর ধানগাছের বদলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ইঁদুরের কেটে ফেলা ধানের গোছা ও নুয়ে পড়া শিষ। ইঁদুরের এই হঠাৎ ও অতিরিক্ত আক্রমণের ফলে সাধারণ মানুষের ধানক্ষেতের অবস্থা একবারে নাজুক ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শুধু তা-ই নয়, কোনো কোনো এলাকায় দেখা গেছে রাতের আঁধারে কিছু কিছু ধানক্ষেত একেবারে সাবাড় হয়ে গেছে, গাছগুলো শুয়ে পড়েছে বা মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। চোখের সামনে নিজেদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা কষ্টের ফসল এভাবে ধ্বংস হতে দেখে কৃষক পরিবারগুলো চরম চিন্তিত ও দিশেহারা হয়ে পড়েছে।

ইঁদুরের এই সর্বনাশা আক্রমণ থেকে কষ্টার্জিত আমন ধানকে রক্ষা করার জন্য স্থানীয় চাষিরা নানাভাবে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ ধানক্ষেতের চারপাশে বা আইলে ইঁদুর মারার বিষ কিংবা বিভিন্ন বিষাক্ত ওষুধ ব্যবহার করছেন, আবার কেউ কেউ দেশীয় প্রযুক্তি ও আধুনিক নানা রকমের ইঁদুরের কল বা ফাঁদ ব্যবহার করছেন। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, এতসব ব্যবস্থা নেওয়া সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো আশানুরূপ বা কার্যকর ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। বিষ কিংবা ওষুধ প্রয়োগ করার পরও ইঁদুরের বংশবৃদ্ধি ও তাণ্ডব যেন কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। প্রতিদিন সকালেই ক্ষেতে গিয়ে কৃষকরা দেখতে পাচ্ছেন নতুন নতুন ধানগাছ কেটে তছনছ করে রাখা হয়েছে।

এমনই এক ভভুক্তভোগী ও লড়াকু কৃষক হলেন মেহার গ্রামের চাষী মো. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি প্রতিদিন নিয়ম করে খুব ভোর থেকে নিজ ধানক্ষেতের নিবিড় পরিচর্যা করে আসছেন। কিন্তু ইঁদুরের তাণ্ডব দেখে তিনি বসে থাকেননি; নিজের মূল্যবান ধানক্ষেতকে রক্ষার জন্য তিনি নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন পথ ও কৌশল অবলম্বন করা শুরু করেন। চাষী জাহাঙ্গীর আলম জানান, তিনি প্রতিনিয়ত ক্ষেত পাহারা দিচ্ছেন এবং ইঁদুর মারার বিশেষ কল ব্যবহার করে এ পর্যন্ত প্রায় ১০০টির মতো ইঁদুর মেরে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও মাঠের ইঁদুরের উপস্থিতি পুরোপুরি কমানো যাচ্ছে না। তবুও তিনি দমে যাননি। নিজের রক্ত পানি করা ধানক্ষেতকে পুরোপুরি ইঁদুরমুক্ত না করা পর্যন্ত তিনি তার এই বিশেষ নিধন অভিযান ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়মিত অব্যাহত রেখেছেন। চান্দিনা উপজেলার ভুক্তভোগী চাষীরা জানান, আমন ধানের শিষ বের হওয়া ও ফসল ঘরে তোলার এই সুনির্দিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসে যদি ইঁদুরের এমন তাণ্ডব প্রতিনিয়ত চলতে থাকে, তবে তাদের চাষাবাদের আসল খরচ তো উঠবেই না, বরং বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের মুখে পড়তে হবে। কৃষি বিভাগের সঠিক হিসাব অনুযায়ী চলতি মৌসুমে বাম্পার ফলন ও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বড় সম্ভাবনা থাকলেও, মাইজখারসহ বেশ কয়েকটি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার কৃষকদের কাছে তা এখন বড় দুশ্চিন্তার কারণ। এই মুহূর্তে ধানক্ষেতকে ইঁদুরের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে পাকা ধান সুস্থভাবে ঘরে তোলা এবং পরিশ্রমের সঠিক মূল্য নিশ্চিত করাই চান্দিনার সাধারণ চাষীদের মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ব্যাপারে চান্দিনা কৃষি অফিস থেকে বলা হচ্ছে, ইঁদুর নিধনের জন্য আমরা কৃষকদেরকে বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করছি।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত