প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬
‘নকল’ শব্দটি আমাদের দেশে বহুকাল ধরে পরীক্ষার বদনাম হিসেবে পরিচিত। কিন্তু আজকের নকল সেই পুরোনো গোপন কৌপিনে লুকানো চিরকুট নয়; বরং এটি প্রযুক্তির সহচর হয়ে বহুমুখী, বহুরূপী এবং অধিকতর অদম্য এক প্রবাহে পরিণত হয়েছে। নকলের অর্থ শুধু প্রশ্ন দেখে উত্তর চুরি নয়, বরং প্রকৃত দাবিদারদের সুযোগ হরণ করা, পরিশ্রমকে অবমূল্যায়ন করা, শিক্ষাব্যবস্থায় অবিশ্বাস সৃষ্টি করা এবং দীর্ঘমেয়াদে সমাজের যোগ্যতা মানদ-কে ভঙ্গুর করে ফেলা। এই অভিঘাত শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়, বরং রাষ্ট্রের মানবসম্পদ গঠনের প্রক্রিয়া পর্যন্ত যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার পরিধি আরও গভীর।
শিক্ষা ও চাকরি, দুই ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতা দিন দিন বাড়ছে।
কিন্তু প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ন্যায্যতার সংকোচন ঘটছে বলে অভিযোগ উঠছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা, সরকারি চাকরির নিয়োগ, এমনকি প্রাথমিক পর্যায়ের নিয়োগ পর্যন্ত নকলের পদচারণা বিস্তৃত হয়েছে। যে পরীক্ষাটি কারও জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারত সেই পরীক্ষাই প্রযুক্তি-নির্ভর অসদুপায় ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে। অভিযুক্তদের অনেকে ধরা পড়ে, আবার কেউ কেউ ধরা না পড়ে ব্যবস্থার ফাঁক গলে সফল হয়। ফলে প্রকৃত পরিশ্রমীরা যেখানে বছরের পর বছর পড়াশোনা করে, সেখানে এক মুহূর্তের প্রযুক্তির সহায়তায় কেউ কেউ অস্বাভাবিক সুবিধা অর্জন করে ফেলে। এর ফলাফল ব্যক্তিগত ক্ষোভ, সামাজিক অসন্তোষ এবং ন্যায্যতার বোধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।
সময়ের সঙ্গে নকলের পদ্ধতিও বদলে গেছে। এক সময় শিক্ষক বা প্রহরীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে পকেট থেকে চিরকুট বের করা ছিল নকলের প্রধান রূপ। এখন নকলের অস্ত্রে যুক্ত হয়েছে ব্লুটুথ ডিভাইস, স্মার্টওয়াচ, কানে লুকানো মাইক্রো-ইয়ারবাড, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)। প্রশ্নের ছবি তুলে অনলাইন অ্যাপ বা কোচিং চক্রে পাঠিয়ে তাৎক্ষণিক উত্তর সংগ্রহ করা এখন আর কল্পকাহিনী নয়, বরং বাস্তব। এতসব নতুন প্রযুক্তিগত অসদুপায় চালু থাকলেও পরীক্ষার নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বিশেষ করে সরকারি নিয়োগ পরীক্ষাগুলো বেশিরভাগ জায়গায় পুরোনো নিয়মের ওপর নির্ভর করছে। প্রবেশে মোবাইল নিষেধ মানেই মনে করা হয় যে প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ হয়ে গেছে। অথচ প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে প্রযুক্তির সমপর্যায়ের বা বেশি ক্ষমতার প্রতিরোধী ব্যবস্থা প্রয়োজন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রশাসন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারেনি।
আরও বড় সমস্যা হলো, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অবহেলা ও দুর্বল মনোভাব। অনেকক্ষেত্রে পরীক্ষা কেন্দ্রের তদারকি অগোচরে চলে যায় বা নকল প্রতিরোধের ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে কেউ বিশেষ আগ্রহী হয় না। কখনও দেখা যায় পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাচ্ছে, আবার কখনও দেখা যায় পরীক্ষাকেন্দ্রেই নজরদারি শিথিল। এমনকি কোথাও কোথাও নেই প্রত্যক্ষ ক্যামেরা পর্যবেক্ষণ, নেই ইলেকট্রনিক সিগনাল শনাক্ত ব্যবস্থাও। ফলে প্রযুক্তি-সক্ষম নকলের সুযোগ আরও বিস্তৃত হয়। প্রশাসনের এই দুর্বলতা বা অসজাগতা শুধু পরীক্ষার সততা নয়, বরং সমগ্র নিয়োগ প্রক্রিয়াকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
এই অবহেলা ও প্রযুক্তিগত পশ্চাদপদতা রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ। যখন প্রকৃত যোগ্যরা বাদ পড়ে যায় এবং যোগ্যতার পরিবর্তে কৌশলে উত্তীর্ণরা সামনে আসে, তখন একটা সময় এসে দেখা যায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অযোগ্যদের আধিক্য। এর ফলে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়, সেবা ব্যাহত হয় এবং জনগণের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে যায়। এই অবক্ষয় ধীরে ধীরে এমন পর্যায়ে যেতে পারে যে, সমাজের চরিত্রগত মানদ- ক্ষয়ে যায়, এবং শিক্ষার উদ্দেশ হয়ে দাঁড়ায় কেবলভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার কৌশল শেখা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় হতাশার মনস্তত্ত্ব। পরিশ্রম করেও সুযোগ না পাওয়া মানুষজন মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং বহু ক্ষেত্রেই তারা সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করে।
তবে প্রযুক্তির দোষ সবসময়ই প্রযুক্তির নয়। প্রযুক্তি মানুষের আবিষ্কার, তাই এর ব্যবহারের চরিত্রও মানুষের ইচ্ছা থেকে নির্ধারিত হয়। একই প্রযুক্তি দিয়ে পরীক্ষায় নকল হতে পারে, আবার সে প্রযুক্তি দিয়ে নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণও করা যায়। বিশ্বে এরইমধ্যে এআই ভিত্তিক প্লেজিয়ারিজম শনাক্তকরণ, ফেস-রেকগনিশন পর্যবেক্ষণ, ডিজিটাল সিগনাল ব্লকার নামে পরীক্ষা পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি চালু হয়েছে। আমাদের ক্ষেত্রেও যদি প্রযুক্তি প্রতিরোধের বদলে প্রযুক্তিকে সহযোগী করা যেত, তবে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারত। কিন্তু বাস্তব ছবিটা হচ্ছে, নকল উদ্ভাবনে প্রযুক্তি যত দ্রুত এগোয়, প্রতিরোধে প্রশাসন সেই গতিতে এগোতে পারে না। ফলে ব্যবধান বিস্তৃত হয় এবং নিরাপত্তার ফাঁকও বড় হতে থাকে।
নকল শুধু পরীক্ষার সততা নষ্ট করে না, বরং একটি জাতিকে তার ভবিষ্যৎ যোগ্যতাশক্তি থেকে বঞ্চিত করে। যে সমাজে মানুষ জানে পরিশ্রমের চেয়ে অসদুপায়ই দ্রুত সাফল্য এনে দেয়, সেখানে নৈতিকতার জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং প্রতিযোগিতা হয়ে দাঁড়ায় অনৈতিক পন্থার প্রতিযোগিতা। একদল যখন দেখছে অন্যরা প্রযুক্তির সহায়তায় নকল করে সফল হচ্ছে, তখন অনেকেই একই পথে যেতে প্রলুব্ধ হয়, ফলে নকল একটি চক্রে পরিণত হয়; একদিকে বৈধ প্রতিযোগীরা পরাজিত, অন্যদিকে অসদুপায়ীরা সাহসী।
এই সংকট থেকে বেরোতে রাষ্ট্রকে দুই দিকেই সমানভাবে মনোযোগ দিতে হবে; প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা। প্রযুক্তি নির্ভর নকল প্রতিরোধ করতে প্রযুক্তির সাহায্যই প্রয়োজন এবং তা করতে প্রশাসনের বোঝাপড়া ও দক্ষতা জরুরি। পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবহেলা বা শৈথিল্যের বিরুদ্ধে কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে নকল শুধু অপরাধ হিসেবেই নয় বরং ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। তবেই প্রকৃত দাবিদাররা ফিরে পাবে তাদের ন্যায্য ক্ষেত্র এবং প্রতিযোগিতার ধারণায় ফিরে আসবে নৈতিকতা, পরিশ্রম ও সক্ষমতার মূল্য।
আরিফুল ইসলাম রাফি
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়