ঢাকা রোববার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

জনভোগান্তির আন্দোলন ও দেয়ালে ঠেকে যাওয়া পিঠ

ইব্রাহীম খলিল (সবুজ)
জনভোগান্তির আন্দোলন ও দেয়ালে ঠেকে যাওয়া পিঠ

রাজধানীর চিরচেনা রূপ হলো যানজট। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে এই জট আর স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। এটি এখন স্থবিরতায় রূপ নিয়েছে। সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ঢাকা কার্যত অচল। তাদের দাবি একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়। এই দাবি যৌক্তিক কি না, সেই বিতর্কে যাওয়ার আগে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের দিকে তাকালে বুক ফেটে যায়। তারা রাস্তা বন্ধ করে বসে আছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষ বাসে বসে আছে। অসহায় বৃদ্ধ রোগী বা অসুস্থ নবজাতককে কোলে নিয়ে সাধারণ মানুষ পায়ে হেঁটে কান্না করতে করতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছে। ইমার্জেন্সি অপারেশনের জন্য যেখানে হাসপাতালে ডাক্তারদের অপেক্ষায় রোগী শুয়ে আছে, সেখানে ডাক্তার নিজেই রাস্তায় আটকে আছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বিকল্প কোনো রুটও খোলা নেই। অথচ একদল টগবগে তরুণ তাদের দাবির নেশায় মত্ত। তারা ভুলে গেছে যে এই সাধারণ মানুষগুলো তাদের শত্রু নয়। তারা ভুলে গেছে যে এই মানুষগুলোর ট্যাক্সের টাকায় তাদের শিক্ষার খরচ চলে। আন্দোলনের ভাষা যখন সহিংস হয়, তখন তা আর গণমানুষের থাকে না। রাস্তায় অ্যাম্বুলেন্স আটকে থাকার দৃশ্য আমরা সংবাদমাধ্যমে দেখেছি। সেই অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে হয়তো কেউ জীবনের শেষ নিঃশ্বাসটুকু বাঁচানোর লড়াই করছে। কিন্তু একদল আন্দোলনকারী বলছে, মানুষ মরলে কী হয়েছে, সরকার দায় নেবে। এমন অমানবিক কথা শোনার পর স্তম্ভিত হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। একটি জাতির ভবিষ্যৎ যাদের হাতে, তারা যদি জীবনের চেয়ে আন্দোলনকে বড় করে দেখে, তবে সেই শিক্ষার সার্থকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

রাস্তা অবরোধ করা এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সামান্য কারণে রাজপথ দখল করে মানুষকে জিম্মি করা হচ্ছে। সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা যখন ভর্তি হয়েছিলেন, তখন তারা জানতেন তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পেয়ে মাঝপথে এসে হঠাৎ করে কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির দাবি কতটা বাস্তবসম্মত, তা পর্যালোচনার দাবি রাখে। দাবি উত্থাপনের জন্য কর্তৃপক্ষ আছে। যেই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার খেটে খাওয়া মানুষ যাতায়াত করে, তাদের পেটে লাথি মারার কারণ কি? একজন রিকশাওয়ালা বা দিনমজুর যার সারাদিনের আয়ের ওপর তার পরিবারের রাতের খাবার নির্ভর করে, যারা সারাদিন কাজ করেও দুবেলা খাবার জোগাড় করতে পারে না, দিন এনে দিন খায়, তাদের পেটের ক্ষুধা তো আর আন্দোলন বোঝে না। সরকারকে চাপ দেওয়ার জন্য সাধারণ মানুষকে কেন ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তার কোনো সদুত্তর নেই।

আন্দোলনকারীদের ভাষা এবং আচরণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক আলোচনা হচ্ছে। তাদের অনেকের ভাষা অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ। সাধারণ যাত্রী বা পথচারীদের সঙ্গে তাদের দুর্ব্যবহার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। কর্মজীবী নারীরা লাঞ্ছিত হচ্ছেন। বয়স্ক মানুষরা গালিগালাজ শুনছেন। এই কি আমাদের তরুণ প্রজন্মের সংস্কৃতি? অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে যখন মানবিকতা বিসর্জন দেওয়া হয়, তখন সেই লড়াই তার নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলে। সাধারণ মানুষ এখন ক্লান্ত এবং অতিষ্ঠ। তাদের ধৈর্য এখন খাদের কিনারায়। সরকার কি শুধু তাকিয়ে তামাশা দেখবে? রাষ্ট্র যন্ত্রের কাজ হলো নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের দাবির কাছে কোটি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে জিম্মি হতে দেওয়া যায় না। হয় সরকার দ্রুত আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান করুক, নয়তো কঠোর হস্তে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করুক। দীর্ঘ সময় ধরে রাজপথ বন্ধ রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো জনরোষ। সাধারণ মানুষের যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তখন তারা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। দিনের পর দিন হয়রানি সহ্য করতে করতে মানুষের মধ্যে ক্ষোভের পাহাড় জমেছে। এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ যদি রাজপথে ঘটে, তবে পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে। তখন হয়তো মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেবে। তখন সেটাকে মব ভায়োলেন্স তকমা দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তখন দায়ভার কে নেবে? শিক্ষার্থীরা যদি মনে করে তারা যা ইচ্ছা তাই করবে এবং কেউ কিছু বলবে না, তবে তারা ভুল করছে। জনগণের সহ্যেরও একটা সীমা আছে। সেই সীমা অতিক্রম করার আগেই রাষ্ট্রকে পদক্ষেপ নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের শুভবুদ্ধির উদয় হওয়া জরুরি। নিজেদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান বাড়ানোর জন্য আন্দোলন হতেই পারে, কিন্তু সেই আন্দোলনে যেন সাধারণ মানুষের হাহাকার না থাকে।

সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের দাবি নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট বিভাগ দ্রুত সিদ্ধান্ত জানাক। ঝুলে থাকা সিদ্ধান্তই ক্ষোভের ইন্ধন জোগায়। আবার একইসঙ্গে রাজপথ দখলমুক্ত রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সক্রিয় হতে হবে। আমরা চাই না কোনো সংঘাত বা রক্তপাত। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, অনির্দিষ্টকালের জন্য শহর অচল হয়ে থাকবে। অসুস্থ নবজাতক নিয়ে যে মা রাস্তায় আটকে আছেন, তার চোখের জল আমাদের বিদ্ধ করে। যে চাকরিজীবী বেতন কাটার ভয়ে অস্থির হয়ে আছেন, যে রিক্সাওয়ালা, শ্রমিক তার পরিবারের দুবেলা খাবার জোগাড় করতে না পেরে আর্তনাদ করছে তাদের অসহায়ত্ব আমাদের লজ্জিত করে। আন্দোলনের নামে এই অরাজকতা বন্ধ হওয়া দরকার। জনস্বার্থকে সবার উপরে স্থান দিতে হবে।

ইব্রাহীম খলিল (সবুজ)

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত