ঢাকা বুধবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

শিক্ষকদের জন্য মানসম্মত প্রশিক্ষণ

মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন
শিক্ষকদের জন্য মানসম্মত প্রশিক্ষণ

একটি জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতির মূলভিত্তি হলো- শিক্ষা, আর সেই শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থান করেন শিক্ষক। শিক্ষক হলেন জ্ঞান বিতরণের পাশাপাশি মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও মানবিক গুণাবলির বাহক। একজন দক্ষ ও আদর্শ শিক্ষকই পারেন একজন শিক্ষার্থীকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে এবং তাকে ভবিষ্যতের জন্য যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে। তাই শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে শিক্ষকদের জন্য মানসম্মত, কার্যকর ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তনশীল। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থায় প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পরিবর্তন আসছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকেও আধুনিক ও কার্যকর হতে হচ্ছে। এক সময় শিক্ষকতা পেশায় মূলত পাঠ্যবই মুখস্থ করানো এবং পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষা দেওয়ার উপর গুরুত্ব দেওয়া হতো। কিন্তু আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকের ভূমিকা শুধু পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং শিক্ষার্থীকে চিন্তাশীল, সৃজনশীল, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই শিক্ষকের প্রধান দায়িত্ব।

এই পরিবর্তিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হলে শিক্ষকদের অবশ্যই মানসম্মত প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। প্রশিক্ষণ ছাড়া একজন শিক্ষক আধুনিক শিক্ষণ কৌশল, শিক্ষার্থী মনস্তত্ত্ব, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং নতুন পাঠ্যক্রমের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারবেন না। ফলে শিক্ষার্থীরাও কাঙ্ক্ষিত মানের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, এখানে শিক্ষক প্রশিক্ষণের গুরুত্ব স্বীকার করা হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে এখনও অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সরকারি বিভিন্ন তথ্যানুসারে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও আধুনিক প্রশিক্ষণের বাইরে রয়ে গেছে। প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষক মাত্র আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যা একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য উদ্বেগজনক। কারণ শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বাড়ছে, পাঠ্যক্রম পরিবর্তিত হচ্ছে এবং শিক্ষার চাহিদা ক্রমশ বহুমুখী হচ্ছে।

বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষক প্রশিক্ষণের অভাব আরও স্পষ্ট। শহরাঞ্চলে যেখানে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, সেমিনার ও কর্মশালার সুযোগ রয়েছে, সেখানে গ্রামীণ শিক্ষকদের জন্য সেই সুযোগ অনেকটাই সীমিত। ফলে শহর ও গ্রামের শিক্ষার মানে একটি বড় ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। এই বৈষম্য দূর করতে হলে শিক্ষক প্রশিক্ষণকে কেন্দ্রীয়ভাবে পরিকল্পনা করে সারা দেশে সমানভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। মানসম্মত শিক্ষক প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি করা। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকদের শেখাতে হবে কীভাবে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করা যায়, কীভাবে পাঠ পরিকল্পনা তৈরি করতে হয় এবং কীভাবে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা যায়। শুধু লেকচার পদ্ধতিতে নয়, বরং প্রশ্নোত্তর, দলগত কাজ, আলোচনা, সমস্যা সমাধানভিত্তিক শিক্ষা এবং বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে শিক্ষাদান কৌশল আয়ত্ত করানো প্রয়োজন। শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা শিক্ষক প্রশিক্ষণের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক। অনেক সময় দেখা যায়, বিষয় সম্পর্কে ভালো জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও শ্রেণিকক্ষ নিয়ন্ত্রণে অদক্ষতার কারণে শিক্ষক কার্যকর পাঠদান করতে ব্যর্থ হন। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকদের সময় ব্যবস্থাপনা, শৃঙ্খলা রক্ষা, শিক্ষার্থীদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ এবং ইতিবাচক শিক্ষার পরিবেশ তৈরির কৌশল শেখানো জরুরি।

শিশুদের মানসিক ও আবেগগত বিকাশ সম্পর্কে জ্ঞান ছাড়া একজন শিক্ষক কখনোই সম্পূর্ণ সফল হতে পারেন না। প্রতিটি শিক্ষার্থী আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী কারও শেখার গতি দ্রুত, কারও ধীর; কেউ মেধাবী, কেউ গড়পড়তা। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষককে এই বৈচিত্র্য সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। শিশু মনস্তত্ত্ব, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান থাকলে একজন শিক্ষক প্রত্যেক শিক্ষার্থীর সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে বিকশিত করতে পারবেন। বর্তমান ডিজিটাল যুগে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষাক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। স্মার্ট ক্লাসরুম, মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশন, ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম, ভার্চুয়াল ক্লাস এবং ডিজিটাল লাইব্রেরি এখন আধুনিক শিক্ষার অপরিহার্য অংশ। কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা না থাকলে একজন শিক্ষক এসব সুবিধা কাজে লাগাতে পারবেন না। করোনা মহামারির সময় অনলাইন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আমাদের স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে, শিক্ষকরা ডিজিটাল প্রশিক্ষণে কতটা পিছিয়ে আছেন। তাই শিক্ষক প্রশিক্ষণে তথ্যপ্রযুক্তি দক্ষতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। কম্পিউটার ব্যবহার, ইন্টারনেটভিত্তিক শিক্ষাসামগ্রী তৈরি, অনলাইন ক্লাস পরিচালনা এবং ডিজিটাল মূল্যায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া এখন সময়ের দাবি। অনলাইন ও হাইব্রিড প্রশিক্ষণ পদ্ধতি চালু করলে একদিকে যেমন খরচ কমবে, অন্যদিকে প্রশিক্ষণের সুযোগ আরও বিস্তৃত হবে। বাংলাদেশ সরকার ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’ এ শিক্ষক প্রশিক্ষণের গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে। ন্যাশনাল একাডেমি ফর এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন, টিচার্স ট্রেনিং কলেজ এবং অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে এসব প্রশিক্ষণের মান, সময়কাল এবং বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ শুধু তাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, যা শ্রেণিকক্ষে বাস্তবায়ন করা কঠিন। আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন ইউনিসেফ, ইউনেস্কো, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও বিশ্বব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নশীল দেশগুলোর শিক্ষক প্রশিক্ষণে সহায়তা দিয়ে আসছে। এসব সংস্থার সহায়তায় বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও দেশের নিজস্ব বাস্তবতা অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এখনও রয়ে গেছে। বিদেশি মডেল হুবহু অনুসরণ না করে দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে প্রশিক্ষণ নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন

শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত