প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৭ মার্চ, ২০২৬
দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে পবিত্র ঈদুল ফিতর। ঈদের আনন্দ মানেই আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব আর হরেক রকমের মুখরোচক খাবারের সমাহার। আমাদের বাঙালি সংস্কৃতিতে উৎসব আর ভোজনরসিকতা যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। তবে এই উৎসবের আমেজে অনেক সময় আমরা আমাদের শরীরের সীমাবদ্ধতা ভুলে গিয়ে অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসে মেতে উঠি। ফলে ঈদের আনন্দ বিষাদে রূপ নিতে বেশি সময় লাগে না। পেটের পীড়া, উচ্চ রক্তচাপ বা দীর্ঘমেয়াদি রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়া এখন ঈদের নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সুস্থ থেকে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে হলে আমাদের খাদ্যাভ্যাসে পরিমিতিবোধ ও সচেতনতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
রমজানে আমাদের শরীর এক দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকার অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে যায়। এই সময় আমাদের পাকস্থলীর হজম প্রক্রিয়া বা মেটাবলিজম একটি নির্দিষ্ট ধীরগতিতে চলে। ঈদের সকালে হঠাৎ করে ভারী বা অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার পাকস্থলীর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঈদের দিন আমরা প্রচুর পরিমাণে চিনিযুক্ত সেমাই, ফিরনি, চর্বিযুক্ত মাংস এবং পোলাও খেয়ে থাকি। এই ‘ফুড শক’ বা হঠাৎ খাবারের আধিক্য গ্যাস্ট্রিক, বদহজম এবং ডায়রিয়ার অন্যতম কারণ। বিশেষ করে যারা ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগে ভুগছেন, তাদের জন্য অনিয়ন্ত্রিত খাবার জীবনহানির ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। সুস্থতার সঙ্গে ঈদ কাটানোর জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন যেমন-
ঈদের সকালে শুরুতেই অনেক বেশি মিষ্টি বা ভাজাপোড়া খাবার না খেয়ে হালকা কিছু দিয়ে দিন শুরু করা উচিত। এক বা দুই পিস সেমাই বা অল্প মিষ্টি খেয়ে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা ভালো। এতে পাকস্থলী দিনের পরবর্তী খাবারের জন্য ধীরে ধীরে প্রস্তুত হতে পারে।
ঈদের দিন আমরা বিভিন্ন পানীয় বা কোল্ড ড্রিংকস পানে আগ্রহী হই, যা আদতে আমাদের ডিহাইড্রেশন বাড়ায় এবং রক্তে চিনির মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এর পরিবর্তে পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি, ডাবের পানি বা বাড়িতে তৈরি চিনিমুক্ত ফলের রস খাওয়া উচিত। পানি হজমে সহায়তা করে এবং শরীর থেকে টক্সিন বের করে দেয়।
খাবারের মেনুতে মাংস বা পোলাওয়ের আধিক্য থাকলেও এর পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে সালাদ ও সবজি রাখা বাধ্যতামূলক। আঁশযুক্ত খাবার বা ফাইবার কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ করে এবং রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। প্রতিবার খাবার গ্রহণের সময় থালার অর্ধেক অংশ সালাদ বা সবজি দিয়ে পূর্ণ রাখার চেষ্টা করা উচিত।
কোরবানির ঈদ হোক বা রোজার ঈদ, খাসি বা গরুর মাংসের প্রতি আমাদের ঝোঁক বেশি থাকে। তবে অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত মাংস এড়িয়ে চলা উচিত। মাংস রান্নার সময় তেল ও মশলার ব্যবহার সীমিত রাখা এবং উচ্চ তাপে ভালোমতো রান্না করা নিশ্চিত করতে হবে। যারা হৃদরোগী, তাদের উচিত মাংসের পরিমাণ খুব সীমিত রাখা।
একবারে অনেক বেশি না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার খাওয়ার অভ্যাস করুন। যখনই কারো বাড়িতে বেড়াতে যাবেন, সব খাবার একসাথে না খেয়ে কেবল সৌজন্য রক্ষার মতো সামান্য পরিমাণ গ্রহণ করুন। এটি অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ থেকে আপনাকে রক্ষা করবে। যারা আগে থেকেই কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত, তাদের জন্য ঈদের আনন্দ হওয়া উচিত কিছুটা সংযত। মিষ্টি খাবার এবং কার্বোহাইড্রেট (ভাত, পোলাও) নিয়ন্ত্রণে রাখা খুবই জরুরি। প্রয়োজনে নিজের জন্য চিনিমুক্ত বিশেষ ডেজার্ট তৈরি করে নিন। অতিরিক্ত লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন। প্রক্রিয়াজাত খাবার বা টিনজাত পানীয় স্পর্শ না করাই শ্রেয়। প্রোটিন বা মাংস গ্রহণের ক্ষেত্রে আপনার চিকিৎসকের দেওয়া চার্ট কঠোরভাবে মেনে চলুন।
ঈদের দিন খাওয়ার পর দীর্ঘসময় শুয়ে-বসে কাটানো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। বিকালে বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে কিছুটা সময় হাঁটাহাঁটি করা বা হালকা ব্যায়াম করা হজমে দারুণ সহায়তা করে। শরীর সচল থাকলে রক্ত সঞ্চালন ঠিক থাকে এবং অতিরিক্ত ক্যালরি পুড়তে সাহায্য করে।
ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই মিলনমেলা। তবে এই আনন্দের মূল উৎস হলো সুস্থতা। অসুস্থ শরীর নিয়ে উৎসবের আমেজ পুরোপুরি উপভোগ করা অসম্ভব। পরিমিত আহার, প্রচুর পানি পান এবং সঠিক খাদ্য নির্বাচন আপনার ঈদকে করতে পারে নিরাপদ ও আরামদায়ক। মনে রাখতে হবে, মুখরোচক খাবার ক্ষণিকের তৃপ্তি দেয়, কিন্তু সুশৃঙ্খল জীবনযাপন আজীবন সুস্থ রাখে। আসুন, এই ঈদে আমরা ভোজনের চেয়েও উৎসবের মূল চেতনা— ভ্রাতৃত্ব ও ত্যাগের ওপর বেশি গুরুত্ব দেই।