প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৭ জানুয়ারি, ২০২৬
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের একটি ভৌগোলিকভাবে সংবেদনশীল, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং সামাজিকভাবে বহুমাত্রিক অঞ্চল। পাহাড়, অরণ্য ও নদীবেষ্টিত এই জনপদ একদিকে যেমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সম্পদের আধার, অন্যদিকে তেমনি দীর্ঘ সীমান্তরেখা, দুর্গম ভূপ্রকৃতি এবং বহুমুখী নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের কারণে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সারা দেশের ন্যায় এই অঞ্চলের সীমান্ত সুরক্ষায় যে বাহিনীটি নীরবে, নিরলসভাবে ও অতন্দ্র প্রহরীর মতো দায়িত্ব পালন করে চলেছে, তা হলো বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত পরিস্থিতি দেশের অন্যান্য সীমান্ত এলাকার তুলনায় অনেক বেশি জটিল। খাড়া পাহাড়, ঘন বন, দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা এবং সীমান্তের উভয় পাশে বিচ্ছিন্ন জনবসতি- সব মিলিয়ে এই অঞ্চল সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে কঠিন করে তোলে। এর পাশাপাশি রয়েছে চোরাচালান, মাদক পাচার, অবৈধ অস্ত্র প্রবাহ, মানব পাচার এবং সীমান্তসংলগ্ন অপরাধের ঝুঁকি। এসব বাস্তবতায় পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবির ভূমিকা শুধু দায়িত্ব নয়, বরং একটি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে সীমান্ত রক্ষার পাশাপাশি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে এই দায়িত্ব আরও কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিকূল আবহাওয়া, দুর্গম পাহাড়ি পথ এবং দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে দায়িত্ব পালন- এ সব চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়েই বিজিবির সদস্যরা সীমান্ত পাহারায় নিয়োজিত থাকেন। তাদের এই নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতি সীমান্ত এলাকায় রাষ্ট্রের দৃশ্যমান কর্তৃত্ব নিশ্চিত করে।
মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবির ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পার্বত্য চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তবর্তী মাদক পাচারের একটি ঝুঁকিপূর্ণ রুট হিসেবে বিবেচিত। ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্যের অবৈধ প্রবাহ শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, বরং সামাজিক অবক্ষয় ও তরুণ সমাজের ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক হুমকি। বিজিবির নিয়মিত অভিযান, নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতার ফলে বহুবার বড় আকারের মাদক চালান আটক হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
অবৈধ অস্ত্র ও সীমান্ত অপরাধ দমনে বিজিবির ভূমিকা পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হয়েছে। সীমান্ত দিয়ে অস্ত্রপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে তা পাহাড়ি অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বিজিবির সতর্ক অবস্থান ও নিয়মিত টহল এই ধরনের ঝুঁকি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে বিজিবির ভূমিকা শুধু সীমান্ত পাহারা বা আইন প্রয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের সামাজিক বাস্তবতায় বিজিবি অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের কাছে আস্থা ও ভরসার প্রতীক। দুর্গম সীমান্তবর্তী এলাকায় বিজিবি ক্যাম্পগুলো প্রায়শই রাষ্ট্রের একমাত্র কার্যকর উপস্থিতি হিসেবে কাজ করে। জরুরি চিকিৎসা সহায়তা, দুর্যোগকালীন ত্রাণ বিতরণ, যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখা কিংবা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যায় সহায়তা- এসব মানবিক কার্যক্রম বিজিবিকে স্থানীয় জনগণের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।
দুর্যোগব্যবস্থাপনায় পার্বত্য চট্টগ্রামে বিজিবির ভূমিকা নীরব কিন্তু কার্যকর। পাহাড়ধস, ভারী বর্ষণ বা আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগে সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে। এসব পরিস্থিতিতে বিজিবির সদস্যরা উদ্ধার কার্যক্রম, ত্রাণ বিতরণ ও পুনর্বাসনে দ্রুত এগিয়ে আসেন। এই মানবিক ভূমিকা সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ককে দৃঢ় করে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বিজিবিকে প্রায়ই বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। দুর্গমতার কারণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার ও দ্রুত রসদ সরবরাহ সবসময় সহজ নয়। তবুও সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিজিবি তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে। সীমান্ত নজরদারিতে প্রযুক্তির ব্যবহার, সদস্যদের প্রশিক্ষণ উন্নয়ন এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বিজিবির কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করে তুলছে।
জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলের সীমান্ত যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে তার প্রভাব শুধু স্থানীয় পর্যায়ে নয়, জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাতেও পড়তে পারে। বিজিবির সতর্কতা ও পেশাদারিত্ব সেই ঝুঁকি কমিয়ে আনতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন কার্যক্রমও গতিশীল হয়- এ সত্য পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতায় বিশেষভাবে প্রযোজ্য।
গণতান্ত্রিক সমাজে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা থাকা স্বাভাবিক। বিজিবির কর্মকাণ্ডও এর বাইরে নয়। তবে সীমান্ত সুরক্ষার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে মূল্যায়ন হওয়া উচিত বাস্তবতা ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো জটিল অঞ্চলে দায়িত্ব পালন সহজ নয় এবং বিজিবির সদস্যরা প্রতিনিয়ত জীবনঝুঁকি নিয়ে এই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন- এই বিষয়টি উপলব্ধি করা জরুরি।
পরিশেষে বলা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত সুরক্ষায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থেই একটি অতন্দ্র প্রহরী। তাদের নিরলস পরিশ্রম, পেশাদারিত্ব ও ত্যাগ সীমান্তকে নিরাপদ রাখার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা ও আস্থার ভিত মজবুত করেছে। ভবিষ্যতে আধুনিকায়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ের মাধ্যমে বিজিবির এই ভূমিকা আরও শক্তিশালী হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু নিরাপদ সীমান্তই নয়, বরং শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পথে আরও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাবে।
এম মহাসিন মিয়া
সাংবাদিক ও লেখক, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা