প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৭ জানুয়ারি, ২০২৬
ডিজিটাল প্রযুক্তির বিকাশ মানুষের যোগাযোগব্যবস্থাকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি তৈরি করেছে নতুন এক বাস্তবতা- ‘ভাইরাল’ হওয়ার সংস্কৃতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন কোনো বিষয়ের গুরুত্ব নির্ধারিত হয় তার সত্যতা বা সামাজিক উপযোগিতা দিয়ে নয়, বরং কত দ্রুত এবং কত মানুষের কাছে তা পৌঁছাতে পারছে, সেই হিসাব দিয়ে। এই ভাইরাল সংস্কৃতি একদিকে যেমন মানুষের কণ্ঠস্বরকে দৃশ্যমান করেছে, অন্যদিকে তেমনি সত্য, নৈতিকতা ও মানবিকতার জন্য তৈরি করেছে গভীর সংকট। ভাইরাল হওয়ার এই প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সত্য। কোনো তথ্য যাচাই করার আগেই তা শেয়ার হচ্ছে, মন্তব্য আসছে, মতামত গড়ে উঠছে। একসময় সেই অসম্পূর্ণ বা ভুয়া তথ্যই সামাজিক বাস্তবতার অংশ হয়ে যাচ্ছে। ফলে ব্যক্তি, সমাজ এমনকি রাষ্ট্র পর্যন্ত ভুল তথ্যের প্রভাবে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে। এই প্রবণতা শুধু বিভ্রান্তি নয়, দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বাসের সংকটও তৈরি করছে।
এই ভাইরাল সংস্কৃতির শিকার সবচেয়ে বেশি হচ্ছেন অভিনেতা-অভিনেত্রীরা। কারণ পরিচিত মুখ মানেই বেশি ক্লিক, বেশি শেয়ার। সাম্প্রতিক সময়ে ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার এই সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। ২০২৩ সালে জনপ্রিয় ভারতীয় অভিনেত্রী রাশমিকা মান্দানার নামে একটি ডিপফেক ভিডিও সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ভিডিওটিতে এমন একজন নারীর শরীরে রাশমিকার মুখ বসানো হয়েছিল, যার সঙ্গে তার বাস্তব জীবনের কোনো সম্পর্কই ছিল না। কিন্তু ভাইরাল হওয়ার পর সেটি নিয়ে যে ট্রোলিং, কটূক্তি ও মানসিক চাপ তৈরি হয়, তার বোঝা বইতে হয়েছে বাস্তব একজন মানুষকে।
এ ধরনের ঘটনা শুধু একজন অভিনেত্রীর সম্মানহানিতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি প্রমাণ করে, প্রযুক্তি কত সহজে কারও পরিচয় ও মর্যাদা ধ্বংস করতে পারে। আলিয়া ভাট, ক্যাটরিনা কাইফ কিংবা আন্তর্জাতিক তারকা টেলর সুইফট- কেউই এই ঝুঁকির বাইরে নন। টেলর সুইফটের নামে ছড়ানো এআই-তৈরি ভুয়া ছবি ও ভিডিও বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। প্রশ্ন ওঠে- যদি এত বড় তারকারাও নিরাপদ না হন, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?
ভাইরাল সংস্কৃতির প্রকৃত ভয়াবহতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয় সাধারণ মানুষের জীবনে। একজন সেলিব্রিটির হয়তো আইনি সহায়তা নেওয়ার সুযোগ আছে, আছে গণমাধ্যমে নিজের অবস্থান জানানোর ক্ষমতা। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষ- বিশেষ করে নারী, শিক্ষার্থী বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কেউ- ভাইরাল ভুয়া ভিডিও বা ছবির শিকার হলে তার সামনে প্রায় কোনো পথই খোলা থাকে না।
অনেক শিক্ষার্থী শুধুমাত্র একটি বিকৃত ভিডিও বা ভুল ক্যাপশনের কারণে সামাজিকমাধ্যমে ট্রোলিংয়ের শিকার হয়েছে। এর ফল হিসেবে কেউ পড়াশোনা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে, কেউ মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে, কেউ আবার দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থেকেছে। ডিজিটাল আদালতে এসব ঘটনার রায় হয় মুহূর্তেই; কিন্তু সেই রায়ে ন্যায়বিচারের কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। কর্মজীবী নারীদের ক্ষেত্রেও এই বিপদ প্রকট। অফিসে বা রাস্তায় ধারণ করা কোনো সাধারণ ভিডিও, প্রেক্ষাপটহীনভাবে ভাইরাল হয়ে গেলে তা তাদের পেশাগত ও সামাজিক জীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে চাকরি হারানো, পারিবারিক চাপ কিংবা সামাজিক বয়কটের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। অথচ এসব ঘটনার পেছনে সত্যের চেয়ে বেশি কাজ করে মানুষের কৌতূহল ও বিনোদনের তাগিদ।
ভাইরাল সংস্কৃতির আরেকটি বিপজ্জনক দিক হলো কনটেন্টের মানের অবনতি।
চিন্তাশীল, গবেষণাভিত্তিক বা শিক্ষামূলক বিষয়ের তুলনায় চটকদার, বিতর্কিত ও উত্তেজনামূলক কনটেন্টই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে সামাজিকমাধ্যমে এক ধরনের বিকৃত প্রণোদনা তৈরি হয়েছে- যেখানে আলোচনায় থাকার জন্য মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে দায়িত্বহীন আচরণ করছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে, কারণ তারা সামাজিক স্বীকৃতি ও লাইক-শেয়ারের সংখ্যাকে সাফল্যের মানদ- হিসেবে দেখছে।
রাজনীতি ও সামাজিক ইস্যুতেও ভাইরাল সংস্কৃতির প্রভাব উদ্বেগজনক। আবেগনির্ভর ভিডিও বা বিভ্রান্তিকর তথ্য খুব সহজেই জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে। যুক্তিনির্ভর আলোচনা ও বিশ্লেষণের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ছে। অনেক সময় পরিকল্পিতভাবে বিভাজন তৈরির জন্য ভাইরাল কনটেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সামাজিক সম্প্রীতি ও গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য হুমকি।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন আসে- দায়িত্ব কার? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর অবশ্যই দায়িত্ব আছে। ভুয়া তথ্য ও ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে তাদের ভূমিকা আরও সক্রিয় হওয়া জরুরি। একইসঙ্গে রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব আছে কার্যকর আইন ও তার প্রয়োগ নিশ্চিত করার। কিন্তু সবচেয়ে বড় দায়িত্ব আমাদের- ব্যবহারকারীদের।
যাচাই না করে শেয়ার করা, উত্তেজনায় মন্তব্য করা কিংবা ভাইরাল কনটেন্টে অংশ নেওয়া- এসবের মাধ্যমেই আমরা এই সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখছি। এক মুহূর্তের বিনোদন বা কৌতূহলের জন্য আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, সেই কনটেন্টের পেছনে একজন বাস্তব মানুষ রয়েছে, যার জীবন, সম্মান ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।
ভাইরাল হওয়া ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু তার ক্ষত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তাই ডিজিটাল যুগে নাগরিক হিসেবে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে- আমরা কি সত্য ও মানবিকতাকে অগ্রাধিকার দেব, নাকি মুহূর্তের ভাইরাল উত্তেজনাকেই বেছে নেব? এই সিদ্ধান্ত শুধু সামাজিকমাধ্যমের ভবিষ্যৎ নয়, আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের দিকনির্দেশও নির্ধারণ করবে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সহজ- ভাইরাল হওয়াই কি আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য, নাকি সত্য ও দায়িত্বশীলতাই হওয়া উচিত আমাদের পথনির্দেশক? এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে আমাদের ডিজিটাল সমাজের ভবিষ্যৎ।
সুমাইয়া সিরাজ সিমি
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়