ঢাকা বুধবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

কর্মজীবী নারীর নিরাপদ পথচলা পৃথক বাস সার্ভিস দাবি

কর্মজীবী নারীর নিরাপদ পথচলা পৃথক বাস সার্ভিস দাবি

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীদের অংশগ্রহণ আজ আর শুধু ঘরের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নেই। কলকারখানা থেকে শুরু করে করপোরেট অফিস, বিসিএস ক্যাডার থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা- সবখানেই নারীর পদচারণা মুখর। তবে এই অগ্রযাত্রার পথে বড় একটি অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে গণপরিবহন ব্যবস্থা। প্রতিদিন কর্মস্থলে যাওয়া-আসার পথে একজন কর্মজীবী নারীকে যে পরিমাণ মানসিক ও শারীরিক লাঞ্ছনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা তার কর্মদক্ষতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই বিড়ম্বনা কমাতে চাকরিজীবী মহিলাদের জন্য পর্যাপ্ত ও আলাদা বাস সার্ভিস চালু করা এখন সময়ের দাবি।

রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোতে গণপরিবহনের সংকট দীর্ঘদিনের। কিন্তু নারীদের জন্য এই সংকট বহুগুণ বেশি। পুরুষযাত্রীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাসে ওঠা একজন নারীর জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। বাসে আসন সংখ্যা সীমিত হওয়ায় অধিকাংশ সময় দাঁড়িয়ে যাতায়াত করতে হয়। এই ভিড়ের সুযোগ নিয়ে অনেক সময় কুরুচিপূর্ণ আচরণ এবং যৌন হয়রানির শিকার হতে হয় তাদের। অনেক নারী শুধু যাতায়াতের এই অসহনীয় যন্ত্রণার ভয়ে ভালো ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ঘরের বাইরে বের হতে দ্বিধাবোধ করেন।

বর্তমানে গণপরিবহনে নারীদের জন্য কয়েকটি আসন সংরক্ষিত থাকে। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেসব আসন পুরুষদের দখলে থাকে অথবা আসনগুলো বাসের ইঞ্জিনের ঠিক ওপরে বা অত্যন্ত সংকীর্ণ জায়গায় হওয়ায় নারীদের জন্য তা আরামদায়ক হয় না। বিআরটিসির কিছু ‘মহিলা বাস’ চালু থাকলেও চাহিদার তুলনায় তা নগণ্য এবং সেগুলোর সময়সূচি অধিকাংশ ক্ষেত্রে অফিস সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে নারীকে বাধ্য হয়েই অনিরাপদ সাধারণ বাসে উঠতে হয়। আলাদা বাস থাকলে নারীদের হয়রানির শিকার হওয়ার ভয় থাকবে না। একটি স্বস্তিদায়ক পরিবেশে তারা যাতায়াত করতে পারবেন।

সকালে যাতায়াতের সময় চরম বিশৃঙ্খলার মুখোমুখি হলে তার প্রভাব সারাদিনের কাজের ওপর পড়ে। নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত হলে নারীরা কর্মস্থলে আরও বেশি মনোযোগী ও উৎপাদনশীল হতে পারবেন। যাতায়াত ব্যবস্থা সুগম হলে আরও বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমবাজারে যুক্ত হওয়ার সাহস পাবেন, যা দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। কর্মজীবী নারীরা শুধু কর্মী নন, তারা গৃহিণী এবং মাও বটে। যাতায়াতে সময় ও শক্তি সাশ্রয় হলে তারা পরিবারকেও গুণগত সময় দিতে পারবেন। চাকরিজীবী মহিলাদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস চালু করা খুব কঠিন কোনো কাজ নয়, তবে এর জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা ও সদিচ্ছা। সরকার বিআরটিসির বাসের সংখ্যা বাড়িয়ে নির্দিষ্ট রুটে কর্মজীবী নারীদের জন্য বরাদ্দ দিতে পারে। বেসরকারি বাস মালিকদেরও নির্দিষ্ট সংখ্যক ‘উইমেনস অনলি’ বাস চালাতে উৎসাহিত করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে শুধু অফিস শুরুর আগে এবং অফিস ছুটির পর এই বিশেষ ট্রিপগুলো পরিচালনা করলেই বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব।

তবে শুধু বাস নামালেই হবে না, সেই বাসগুলোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, মহিলা বাসগুলোতে যান্ত্রিক ত্রুটি বেশি থাকে বা সেগুলো নিয়মিত চলাচল করে না। এই জায়গাটিতে কড়া নজরদারি প্রয়োজন।

একটি রাষ্ট্র কতটা উন্নত, তা পরিমাপের অন্যতম মাপকাঠি হলো সেই রাষ্ট্রের নারীরা কতটা নিরাপদে চলাফেরা করতে পারেন। আমরা যদি ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি, তবে অর্ধেক জনসমষ্টিকে যাতায়াত বিড়ম্বনার মুখে রেখে তা সম্ভব নয়। নারীর ক্ষমতায়ন শুধু স্লোগানে সীমাবদ্ধ না রেখে তা বাস্তবে রূপ দিতে হলে তাদের পথচলা নির্বিঘ্ন করতে হবে।

চাকরিজীবী মহিলাদের জন্য আলাদা বাস কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি তাদের মৌলিক অধিকার ও কর্মপরিবেশের একটি অংশ। এটি নিশ্চিত করা গেলে নারীরা আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করতে পারবেন। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, পরিবহন মালিক সমিতি এবং সুশীল সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে, যাতে আমাদের মায়েরা, বোনেরা এবং কন্যারা নির্ভয়ে, সসম্মানে তাদের কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেন। একটি নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা মানেই নারীর অগ্রযাত্রার আরও এক ধাপ উত্তরণ।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত