ঢাকা শনিবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ভোটের দিন কেন লাশ গোনা হবে

মেহেদী হাসান নাঈম, শিক্ষার্থী ও কলাম লেখক, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া
ভোটের দিন কেন লাশ গোনা হবে

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬। নির্বাচন ঘিরে দেশের ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলজুড়ে বইছে উৎসবের আমেজ। দীর্ঘ সতেরো বছর পর নির্বাচন, তাই রূপ নিয়েছে নাগরিক উৎসবে। কখন ভোট দেবে- এই ভাবনায় অপেক্ষার প্রহর গোনছে সাড়ে ১২ কোটির অধিক ভোটার। করবেন মত প্রকাশ। অংশ নেবেন নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে। অথচ বাংলাদেশের বাস্তবতায় নির্মম চিত্র হলো- ভোটের দিন মানেই উৎকণ্ঠা, আতঙ্ক আর শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর সংবাদ। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন জাগে, ভোটের দিনে কেন লাশ গোনা হবে?

আমাদের দেশে নির্বাচন শেষে ব্যালট পেপার গণনার আগেই লাশের সংখ্যা গণনা শুরু হয়। কারও ছেলে আর ঘরে ফেরে না। কারও বাবা ভোট দিতে গিয়ে হাসপাতালে। কেউবা রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়ে প্রাণ হারায়। গত ১৭ বছরের ৪টি জাতীয় নির্বাচন ছিল হাসিনার সাজানো আমি-ডামি আর ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়ার নির্বাচন। তার আগের জাতীয় নির্বাচনে কি প্রাণ হাড়ানোর ঘটনা ঘটেনি? আসুন সেটিই একটু দেখে আসি। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট জয়ী হয়। নির্বাচন সংক্রান্ত ঘটনায় ২০০১ সালের ১৫ জুলাই থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত কমপক্ষে ২১৭ জন নিহত হয়েছে। নির্বাচনের দিন কমপক্ষে ২১ জন নিহত হয়। ১৯৯৬ সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট জয়ী হয়। এই নির্বাচনে সংঘটিত সহিংসতায় প্রায় ২৬ জন প্রাণ হারায়। ভোটের আগে ১৫ জন, ভোটের দিন ৫ জন আর ভোটের পরে ৬ জন নিহত হন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন মোট মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৬৬ জন। ভোটের দিন প্রায় ১০ জন নিহত হয়। আর ভোটের পর নিহত হয় প্রায় ৪৮ জন। তথ্য খুঁজতে যত পেছনে তাকাবো ততই বড় হবে মৃত্যুর মিছিল। একদিকে প্লাস্টিকের ব্যালট বাক্স আর অন্য দিকে কাঠের তৈরি লাশের কফিন রেখে প্রশ্ন করতে চাই- এই মৃত্যুর দায় আসলে কার?

নির্বাচনি সহিংসতার দায় কোনো একক পক্ষ এড়িয়ে যেতে পারে না। রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার লড়াইয়ে কর্মীদের মানুষ নয়, পরিণত করেছে সংখ্যায়। প্রশাসন অনেক সময় দায়িত্বশীলতার জায়গা হারায়। বিলুপ্ত হয় নিরপেক্ষতা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শক্তি প্রয়োগ আর মানবিকতার সীমারেখা গুলিয়ে ফেলে। আর আমরা সাধারণ নাগরিকরা থাকি নীরব দর্শক হয়ে। ফলে আবারও প্রশ্ন ওঠে- এই মৃত্যুর দায় আসলে কার?

রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা এই সমস্যার মূল। ভিন্নমত মানেই শত্রু- এই মানসিকতা থেকেই জন্ম নেয় সংঘর্ষ, আগুন, গুলি আর রক্ত। ভোটকেন্দ্র হয়ে ওঠে যুদ্ধক্ষেত্র। ভিন্ন মতকে সহ্য করার সংস্কৃতি না থাকলে নির্বাচন প্রতিযোগিতা নয়, সংঘর্ষে রূপ নেয়। মতের পার্থক্য যখন শত্রুতায় পরিণত হয়, তখন ব্যালট বাক্সের পাশে দাঁড়ায় অস্ত্র। আর গণতন্ত্রের পাশে দাঁড়ায় কফিন। অথচ গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো মতের ভিন্নতা আর শান্তিপূর্ণভাবে আদর্শের প্রতিযোগিতা। তাই রাজনৈতিক দলগুলো দায় এড়াতে পারে না। কখনও কখনও সরাসরি দায়ী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। এই তো কয়েকদিন আগে একজন সংসদ সদস্য প্রার্থী বলেই ফেললেন যে, জামায়াত আর ছাত্রী কল্যাণ সংস্থার কোনো মহিলা কর্মী আপনাদের বাসায় আসলে বেধে রেখে পুলিশকে কল দিবেন। এদিকে কেউ আবার মহিলাদের সায়া (জামা) খুলে নেওয়ার প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছে। স্পস্টই এমন বক্তব্য উসকে দেয় মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের। কর্মীরা বুঝেও না তাদের এই সংঘাটের ফলাফল কারা ভোগ করে। যেই কর্মীটা নিহত হয় তার পরিবারের দায়িত্ব কি দল বা নেতা নেয়? বরং বিছিন্ন ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়। রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি দায় আছে সরকারের। ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। কেউ যেন ভোট দিতে গিয়ে মৃত্যুভয় না পায়, এটি নিশ্চিত করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলো চিহ্নিত করে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া, নিরপেক্ষ প্রশাসন ও সংযত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি জীবন বাঁচাতে পারে। শক্তি প্রদর্শন নয়, সংযমই এখানে সবচেয়ে বড় শক্তি।

রাজনৈতিক দলগুলোকেও আত্মসমালোচনার মুখোমুখি হতে হবে। ক্ষমতা কি মানুষের জীবনের চেয়েও দামী? একটি আসন, একটি জয়। কিন্তু তার বিনিময়ে এক বা একাধিক প্রাণ? ইতিহাস কখনোই রক্তের দাগ মুছে দেয় না। বরং সেই দাগ আরও গভীর হয়ে রাষ্ট্রের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করে। রক্তের ওপর দাঁড়ানো বিজয় কখনও টেকসই হয় না। বরং সেই রক্ত রাষ্ট্রের বিবেকে স্থায়ী দাগ ফেলে যায়। নির্বাচনের প্রকৃত সাফল্য কে ক্ষমতায় গেল সেটা নয়। প্রকৃত সাফল্য হলো, সবাই বেঁচে বাড়ি ফিরল কিনা। একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনই পারে গণতন্ত্রকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে। গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। উত্তেজনা বাড়ানো নয়, দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন এবং শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া সময়ের দাবি। কাউকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ প্রচার করার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। একই সঙ্গে তরুণ সমাজকে হতে হবে সংঘাতের হাতিয়ার নয়, বরং শান্তির দূত।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত