ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

প্রার্থনা, ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিকতার মেলবন্ধন শবেবরাত

ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রার্থনা, ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিকতার মেলবন্ধন শবেবরাত

শাবানের রুপালি চাঁদ যখন আকাশে উদিত হয়, তখন বাংলার জনপদে এক অনন্য আবহ তৈরি হয় যা শুধু ধর্মীয় নয়, বরং এক গভীর সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জাগরণ। ২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে যে রজনীটি পালিত হতে যাচ্ছে, তা শুধু একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়, বরং কয়েক প্রজন্মের লালিত বিশ্বাস আর ঐতিহ্যের সংমিশ্রণ। হাদিসের নির্যাস আর লোকজ বিশ্বাসের শক্তিতে এটি বাঙালির হৃদয়ে ‘মুক্তির রজনী’ হিসেবে গেঁথে আছে। এই রাতটি যেন এক মহাজাগতিক ক্ষণ, যেখানে আসমানি রহমত আর জমিনের মানুষের আকুতি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। রহমতের অবারিত দ্বার খোলার এই প্রতীক্ষায় মুমিন হৃদয়ে যে হিল্লোল বয়ে যায়, তার বর্ণনা কোনো জাগতিক ভাষায় সম্পূর্ণ করা অসম্ভব। এটি এমন এক ক্ষণ যখন মানুষ তার বিগত জীবনের গ্লানি ধুয়ে মুছে নতুনের আহ্বানে সাড়া দেওয়ার শক্তি পায়।

ঐতিহ্যগতভাবে শবে বরাতকে কেন্দ্র করে বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে যে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়, তা এক কথায় অতুলনীয়। শিশির ভেজা সকালে গরু জবাই, বিকেলের নরম আলো শেষ হওয়ার পূর্বেই রুটি হালুয়া তৈরি, গোস্ত রান্না এবং সন্ধ্যা নামতেই পাড়ায় পাড়ায় হালুয়া-রুটি-গোস্ত বিতরণ করার ধুম পড়ে যায়, যা মূলত রাতের বিশেষ আয়োজনের প্রস্তুতি। মা-বোনদের ব্যস্ততা বাড়ে রান্নাঘরে; চালের গুঁড়োর রুটি আর হরেক পদের হালুয়ার সুগন্ধে ম ম করে চারপাশ। এই হালুয়া-রুটি শুধু খাদ্য নয়, বরং এটি সামাজিক সৌহার্দ্যের এক অঘোষিত প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেশীর ঘরে ঘরে খাবার বিলিয়ে দেওয়ার যে সংস্কৃতি, তা আমাদের সমাজকে এক সুতোয় গেঁথে রাখে। সরকারি ছুটির আমেজে ছোট-বড় সবাই যখন নতুন বা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পোশাক পরে মসজিদে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। এই সামাজিক মেলবন্ধনই শবেবরাতকে একটি ইবাদতের রাত ও একটি সর্বজনীন উৎসবে উন্নীত করে।

আধ্যাত্মিকতার গভীর স্তরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, শবেবরাত হলো পরম করুণাময়ের সান্নিধ্য লাভের এক সুবর্ণ সুযোগ। রাতভর জেগে নফল ইবাদত, জিকির-আজকার আর চোখের পানির মাধ্যমে বান্দা তার প্রভুর কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করে। বিশ্বাসীদের ধারণা, এই রাতেই আগামী এক বছরের রিজিক, হায়াত আর মউতের ফয়সালা চূড়ান্ত হয়।

যদিও এটি নিয়ে তাত্ত্বিক বিতর্ক রয়েছে; কিন্তু সাধারণ মানুষের সরল বিশ্বাসে এই রাতটি ভাগ্য পরিবর্তনের এক বিশেষ সুযোগ। সেজদায় লুটিয়ে পড়া হাজারো মানুষের সমবেত রোনাজারিতে মসজিদের দেয়ালগুলোও যেন পবিত্রতায় থরথর করে কাঁপে। প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে থাকে মুক্তির আকুলতা আর প্রতিটি মোনাজাতে থাকে আগামীর সুন্দর জীবনের প্রার্থনা। এই আধ্যাত্মিক সংযোগ মানুষকে আত্মশুদ্ধির পথে ধাবিত করে এবং পার্থিব মোহ ত্যাগের প্রেরণা যোগায়।

২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোটের কারণে এই শবেবরাত বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অভিজ্ঞতার সাক্ষী হতে যাচ্ছে। একদিকে ইবাদতের নিস্তব্ধতা, অন্যদিকে রাজনৈতিক স্লোগানের প্রতিধ্বনি- এই দ্বৈত চরিত্র আমাদের সামাজিক বিবর্তনেরই অংশ।

মসজিদের সামনে বা পাড়ার মোড়ে মোড়ে যখন প্রার্থীরা দোয়ার নামে ভোট চাইবেন, তখন আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে রাজনীতির এক অদ্ভুত রসায়ন তৈরি হবে। লিফলেট আর প্রচারণায় যখন শবেবরাতের গুরুত্বের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি মিশে যাবে, তখন সাধারণ মানুষের কাছে এটি এক গবেষণাধর্মী পর্যালোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। মসজিদে যখন মুসল্লিদের বিশেষ ভিড় হবে, তখন হয়তো এক পাশে থাকবে পরকালীন মুক্তির আকুতি আর অন্যপাশে থাকবে আগামীর শাসনভার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।

কবর জিয়ারতের দৃশ্যটি শবে বরাতের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি করে। মোমবাতির স্নিগ্ধ আলো আর আগরবাতির সুবাসে যখন গোরস্থানগুলো ভরে ওঠে, তখন যেন জীবিত আর মৃতের মাঝে এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন রচিত হয়। হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে যখন সন্তান বা আত্মীয়রা কান্নায় ভেঙে পড়ে, তখন পৃথিবীর নশ্বরতা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। কবরের ঘাস পরিষ্কার করা কিংবা আলোকসজ্জা করার মাধ্যমে মৃতদের প্রতি যে ভালোবাসা প্রদর্শিত হয়, তা মূলত পরকালীন মুক্তির এক আকুল আকুতি। এই দৃশ্যটি যেমন শোকের, তেমনি এক গভীর শিক্ষারও বটে; যা মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে, আজ যে ইবাদত করছে, কাল সেও কোনো এক কবরের বাসিন্দা হবে।

তবে এই পবিত্রতার আড়ালে কিছু ‘বিদআত’ বা কুসংস্কারের অনুপ্রবেশ সমাজকে মাঝে মাঝে বিভ্রান্ত করে। আতশবাজির বিকট শব্দে যখন ইবাদতকারীদের একাগ্রতা নষ্ট হয়, তখন ধর্মের মূল চেতনা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। অনেকে সারারাত জেগে ইবাদতের নামে আড্ডা দিয়ে কাটিয়ে দেন এবং শেষ পর্যন্ত ফজরের ফরজ নামাজ না পড়েই ঘুমিয়ে পড়েন। আলেমদের একটি বড় অংশ তাই বারবার সতর্ক করেন যেন আমরা আবেগের বশে এমন কিছু না করি যা ইসলামের মূল শিক্ষার পরিপন্থি।

এই রজনীকে কেন্দ্র করে যে ‘হালুয়া-রুটি’ সংস্কৃতি, তা নিয়ে কিছুটা রম্য বা হাস্যরসেরও সৃষ্টি হয়। একদল যখন ইবাদতে মশগুল, অন্যদল তখন ব্যস্ত থাকে কোন বাড়ির হালুয়া বেশি সুস্বাদু তা যাচাই করতে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে এটি অনেক সময় শুধু একটি আড্ডার রাতে পরিণত হয়। তবুও এই রীতির পেছনে লুকিয়ে আছে আমাদের হাজার বছরের আবেগ ও সংস্কৃতি। এই যে গরুর মাংস আর রুটির জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা, এর মধ্যে এক ধরনের আটপৌরে আনন্দ আছে। ধর্মের সঙ্গে রসনার এই মিতালি দেখা যায়, যা শবে বরাতকে দিয়েছে এক অনন্য রূপ।

শবে বরাতের আরেকটি মানবিক ও করুণ দিক হলো ভিক্ষুকদের মহোৎসব। এই রাতে মসজিদ ও মাজারগুলোর সামনে শত শত দুস্থ মানুষের ভিড় জমে। দান-খয়রাত করা অবশ্যই সওয়াবের কাজ, কিন্তু একে কেন্দ্র করে যেভাবে ভিক্ষাবৃত্তির মেলা বসে, তা অনেক সময় বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি এই সুযোগে বড় অঙ্কের চাঁদা সংগ্রহ করেন। তবে ইতিবাচক দিক হলো, বিত্তবানদের হৃদয়ে এই রাতে যে দয়ার সঞ্চার হয়, তা বহু ক্ষুধার্ত পেটে অন্তত একবেলা ভালো খাবারের নিশ্চয়তা দেয়। ভিক্ষুকদের এই ভিড় আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃত মুক্তির রজনী তখনই সার্থক হবে যখন সমাজে কোনো ক্ষুধার্ত মানুষ থাকবে না।

বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিতে দেখলে, শবেবরাত হলো রমজানের আগাম প্রস্তুতি। এই রাতের মাধ্যমে মুমিনরা তাদের দেহ ও মনকে দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার জন্য প্রস্তুত করে তোলে। যারা সারা বছর মসজিদের ধারকাছেও ঘেঁষে না, তারাও এই রাতে কপালে সিজদার চিহ্ন আঁকতে চায়। এই সাময়িক পরিবর্তনকেও ইতিবাচকভাবে দেখা উচিত, কারণ এটি প্রমাণ করে যে মানুষের অন্তরে এখনও স্রষ্টার প্রতি এক সুপ্ত অনুরাগ রয়ে গেছে। সমাজের প্রতিটি স্তরে যখন জিকির আর তসবিহর ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়, তখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে আসে যা মানুষকে আগামী দিনের কঠিন পথ পাড়ি দেওয়ার শক্তি জোগায়।

সুফি-সাধক এবং আলেমদের ভূমিকা শবেবরাতের মর্যাদা প্রসারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের বয়ান ও নসিহতের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ এই রাতের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারে। যদিও হাদিসের বিশুদ্ধতা নিয়ে বিতর্ক আছে; কিন্তু আলেম সমাজ একমত যে, ইবাদতের জন্য যেকোনো রাতই উত্তম এবং শাবান মাসের এই রজনীটি বিশেষভাবে বরকতময়। যখন একজন আলেম মিম্বরে দাঁড়িয়ে গোনাহ মাফের কথা বলেন, তখন হাজারও মানুষ তাদের অতীতের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়। এই সামাজিক ও ধর্মীয় শাসন সমাজকে নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করতে একটি বড় ঢাল হিসেবে কাজ করে।

শবে বরাতের এই দীর্ঘ আয়োজনে এক ধরনের অতি-আবেগ কাজ করে। ভাগ্য নির্ধারণের বিশ্বাস নিয়ে মানুষের যে ব্যাকুলতা, তা কখনও কখনও কর্মবিমুখতারও জন্ম দেয়। অনেকে মনে করেন শুধু এই এক রাতে কান্নাকাটি করলেই সারা বছরের সাফল্য নিশ্চিত। ইসলাম কর্মকে গুরুত্ব দেয়। তবুও, মানুষের এই সরল বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা জানাতে হয়, কারণ দিনশেষে আশাই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। এই আবেগই মানুষকে বছরের পর বছর ধরে কনকনে শীত বা বৃষ্টির রাতেও জায়নামাজে বসিয়ে রাখে।

আধ্যাত্মিকতার এই চরম বহিঃপ্রকাশ আমাদের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। পরিশেষে বলা যায়, শবে বরাত আমাদের জীবনে আসে এক প্রশান্তির বারতা নিয়ে। এটি কেবল হালুয়া-রুটির উৎসব নয়, বরং এটি হওয়া উচিত নিজের সত্তাকে চেনার এবং স্রষ্টার কাছে সমর্পিত হওয়ার এক পবিত্র সুযোগ। আলোকসজ্জা আর জাঁকজমকের ভিড়ে যেন আমরা মূল ইবাদত আর সহমর্মিতার শিক্ষা ভুলে না যাই। বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে যদি আমরা এই রজনীতে অন্যের জন্য দোয়ার হাত বাড়াতে পারি এবং নিজের ভুলগুলো সংশোধন করতে পারি, তবেই শবেবরাতের সার্থকতা। ২০২৬ সালের সেই আলোকিত রজনী হোক শান্তি, মুক্তি আর ঐক্যের প্রতীক। যে বিশ্বাস আর ঐতিহ্য নিয়ে আমরা এই রাতটি পালন করি, তা যেন আমাদের আগামী দিনগুলোকে আরও সুন্দর এবং আধ্যাত্মিকতায় পূর্ণ করে তোলে।

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রাবন্ধিক, কথা সাহিত্যিক ও প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত