প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা হলো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। একটি দেশ কতটা আধুনিক এবং প্রগতিশীল, তা নির্ভর করে সে দেশের নির্বাচনি ব্যবস্থার স্বচ্ছতার ওপর। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘নির্বাচনি প্রতারণা’ শুধু একটি রাজনৈতিক শব্দ নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলার অন্যতম প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। যখন জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা হয় বা কৌশলে নির্বাচনি ফলাফল নিজেদের পক্ষে নেওয়ার অপচেষ্টা চলে, তখন তার মাশুল দিতে হয় সাধারণ নাগরিককেই। নির্বাচনি প্রতারণার ফলে সৃষ্ট জনদুর্ভোগ আজ শুধু চরমে নয়, বরং তা জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।
নির্বাচনি প্রতারণা শুধু ভোটের দিন কারচুপির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি শুরু হয় নির্বাচনের আগে থেকে- মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, পেশিশক্তির ব্যবহার এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপ-প্রয়োগের মাধ্যমে। যখন কোনো জনপ্রতিনিধি জনগণের প্রকৃত রায় ছাড়াই ক্ষমতায় বসেন, তখন তার দায়বদ্ধতা জনগণের প্রতি থাকে না। তিনি দায়বদ্ধ থাকেন সেই অশুভ শক্তি বা ব্যবস্থার প্রতি, যারা তাকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। ফলে জনস্বার্থের চেয়ে গোষ্ঠীস্বার্থ বা ব্যক্তিগত স্বার্থ বড় হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণ মানুষ তখন হয়ে পড়ে দিশাহারা, কারণ তাদের সমস্যা শোনার বা সমাধানের কেউ থাকে না।
একটি জালিয়াতিপূর্ণ নির্বাচনের পর যে সরকার গঠিত হয়, তারা শুরু থেকেই নৈতিক সংকটে ভোগে। বৈধতার সংকটে থাকা সরকারকে টিকে থাকতে হয় বলপ্রয়োগের মাধ্যমে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের প্রশাসনিক কাঠামোতে। পুলিশ, প্রশাসন এবং বিচার বিভাগকে যখন রাজনৈতিক উদ্দেশে ব্যবহার করা হয়, তখন সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। আমলাতন্ত্র তখন জনসেবার চেয়ে ক্ষমতার তোষামোদিতে বেশি ব্যস্ত থাকে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর মতো মৌলিক খাতগুলোতে স্থবিরতা নেমে আসে। দুর্নীতি ডালপালা মেলে এবং সাধারণ মানুষের করের টাকা লুটপাটের শিকারে পরিণত হয়। নির্বাচনি প্রতারণার সঙ্গে অর্থনীতির একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আস্থার সংকটের কারণে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যায়। একই সঙ্গে, জবাবদিহিহীন সরকারের ছত্রছায়ায় একশ্রেণির ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দ্রব্যমূল্য বাড়ানো হয়, কারণ তারা জানে যে জনগণের কাছে তাদের কোনো জবাবদিহি করতে হবে না। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ যখন উচ্চমূল্যের বাজারে হিমশিম খায়, তখন ক্ষমতাশীনরা ব্যস্ত থাকে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার খেলায়। সাধারণ মানুষের পকেট কেটে যখন রাজনৈতিক ফায়দা তোলা হয়, তখন জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছানোই স্বাভাবিক। নির্বাচনি প্রতারণা একটি সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। যখন তরুণ প্রজন্ম দেখে যে মেধা বা জনসমর্থন নয়, বরং প্রতারণা ও কারচুপির মাধ্যমেই ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব, তখন তারা নৈতিকতা হারায়। এটি সমাজে চরম অস্থিরতা এবং বিভাজন সৃষ্টি করে। মানুষ রাষ্ট্রের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলে। একটি রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ‘ভোট’ নিশ্চিত করতে পারে না, তখন সেখানে অরাজকতা সৃষ্টি হয়। এই আস্থার সংকট সমাজকে দিন দিন বসবাসের অযোগ্য করে তোলে। এই চরম জনদুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র পথ হলো নির্বাচনি ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চা করা। এর জন্য প্রয়োজন স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন। যারা কোনো রাজনৈতিক দলের কাছে মাথানত করবে না। নির্বাচনের সময় প্রশাসনকে শতভাগ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। জনগণকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জারি রাখতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে ক্ষমতার লোভ ত্যাগ করে জনকল্যাণের রাজনীতিতে ফিরে আসতে হবে।
নির্বাচনি প্রতারণা কেবল একটি রাজনৈতিক অপরাধ নয়, এটি জনগণের সঙ্গে করা চরম বিশ্বাসঘাতকতা। এই প্রতারণার ফলে সৃষ্ট জনদুর্ভোগ আজ সাধারণ মানুষের পিঠ দেওয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। একটি সমৃদ্ধ ও শান্তিময় দেশ গড়তে হলে ভোটের পবিত্রতা রক্ষা করা অপরিহার্য। মনে রাখতে হবে, জনগণের ক্ষোভ যখন চরমে পৌঁছায়, তখন কোনো কারচুপি বা প্রতারণাই ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে না। ইতিহাসের শিক্ষা এটাই যে, জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে কেউ টিকে থাকতে পারেনি। তাই সময় থাকতেই নির্বাচনি ব্যবস্থাকে কলঙ্কমুক্ত করে জনগণের হাতে তাদের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।