ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

কথা বলতে না পারার ট্র্যাজেডি

সাজেদা আক্তার (সাজু)
কথা বলতে না পারার ট্র্যাজেডি

কথা বলতে না পারার কারণে যুগে যুগে অসংখ্য সম্পর্ক নীরবে ভেঙে পড়েছে যার কোনো পরিসংখ্যান নেই, কোনো হিসাবও নেই। না বলা কথা আর চেপে রাখা অনুভূতিই অনেক সময় সম্পর্ক ভাঙনের সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নীরবতার এই অভ্যাস ধীরে ধীরে জন্ম দেয় অভিমান, ভুল বোঝাবুঝি ও স্থায়ী দূরত্ব। বিস্ময়কর হলেও সত্য, এই নীরবতার সূচনা অনেক সময় হয় সেই জায়গা থেকেই, যেখানে একজন মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ থাকার কথা পরিবারে। কথা বলতে না পারার সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি দেখা যায় দাম্পত্য সম্পর্কে। সময়মতো নিজের কষ্ট, প্রত্যাশা কিংবা অনুভূতির কথা প্রকাশ না হওয়ায় বহু সম্পর্ক ভিতর থেকেই ভেঙে পড়ে।

ভালোবাসার মতো গভীর সম্পর্কও তখন টিকে থাকতে পারে না। অথচ কথাতেই রয়েছে শান্তি, কথাতেই রয়েছে মুক্তি। মনোযোগ দিয়ে শোনা কয়েকটি বাক্য বহু বিচ্ছেদ ঠেকাতে পারত। দাম্পত্যের মতোই বাবা-মা ও সন্তানের সম্পর্কেও নীরবতা ক্ষতি ডেকে আনে। অনেক বাবা-মা সন্তানের খাওয়া-পরা ও পড়াশোনার দায়িত্ব পালনে যতটা সচেতন, তার মানসিক প্রয়োজনের দিকে ততটাই উদাসীন। এর ফলে সন্তান ধীরে ধীরে নিজের ভয়, কষ্ট, আনন্দ কিংবা অন্যায়ের কথা বাবা-মায়ের কাছে বলতে শেখে না। বাবা-মা ও সন্তানের মাঝখানে গড়ে ওঠে এক অদৃশ্য দেওয়াল। যে পরিবারে প্রশ্ন করার সুযোগ নেই, সেখানে কৌতূহল দমে যায়। আর যেখানে অনুভূতি প্রকাশের জায়গা নেই, সেখানে নীরবতাই হয়ে ওঠে আশ্রয়। নতুন বিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে এই নীরবতার চাপ আরও তীব্র হয়। নতুন পরিবারে মানিয়ে নেওয়া ও নিজেকে প্রমাণ করার চাপের ভেতর দিয়ে তাদের যেতে হয়। এই সময় খোলাখুলি কথা বলার সুযোগ না পেলে ক্ষোভ ও অভিমান জমতে থাকে। এখানে সবচেয়ে বড় দায়িত্বটি থাকে স্বামীর যার দৃঢ় সমর্থন ছাড়া সম্পর্ক সহজেই দুর্বল হয়ে পড়ে। সমাজের সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো অসংখ্য শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হলেও তা প্রকাশ করতে পারে না। ভয়, লজ্জা ও অনিরাপত্তা তাদের মুখ বন্ধ করে দেয়।

এই ‘বলতে না পারা’র দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। এর বড় অংশই পরিবার ও অভিভাবকদের অবহেলার ফল, যেখানে শিশুর কথা শোনার পরিবেশ নেই। যে শিশু কথা বলতে পারে না, সে ধীরে ধীরে সহ্য করতে শেখে। আর এই সহ্য করাই একসময় তাকে ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়। আজকের সমাজে সচেতন নাগরিকের চেয়ে তথাকথিত আধুনিক নাগরিকের সংখ্যাই বেশি। আধুনিকতার নামে সম্পর্ক ও পারিবারিক মূল্যবোধকে অনেকেই অবহেলা করছে।

প্রযুক্তি যতই এগোক, মানুষের সঙ্গে মানুষের কথা বলার প্রয়োজন ততই বাড়ে। কথা বলা কখনই পুরোনো হয়ে যায় না। একটি শিশুর শারীরিক বেড়ে ওঠার মতোই তার মানসিক গঠন সমান গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের আচরণ ও অনুভূতির পরিবর্তনের দিকে গভীর মনোযোগ দেওয়া বাবা-মায়ের দায়িত্ব।

ভুলকে ভয় না বানিয়ে, প্রশ্নকে অপরাধ না করে যদি পরিবার সন্তানের পাশে দাঁড়াতে পারে, তবে সে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। যে পরিবারে ভুল স্বীকারের সুযোগ নেই, সেখানে ভয় জন্ম নেয়। আর যেখানে ভয় থাকে, সেখানে নীরবতাই সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়। সবচেয়ে জরুরি হলো পরিবারে নিয়মিত ও খোলামেলা কথোপকথনের সংস্কৃতি গড়ে তোলা। কারণ যে শিশু কথা বলতে শেখে না, সে ধীরে ধীরে সত্য লুকাতে শেখে। একটি মানুষ সে শিশু হোক বা প্রাপ্তবয়স্ক তখনই সত্য বলার সাহস পায়, যখন সে জানে তার কথা শোনার মতো অন্তত একজন মানুষ আছে। যে মানুষটি বিচারক নয়, বরং আশ্রয়।

সাজেদা আক্তার (সাজু)

শিক্ষার্থী, হিসাববিজ্ঞান (এমবিএ), ফেনী সরকারি কলেজ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত