ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৬ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

রমজান : সংযমের শিক্ষা না ভোগের প্রতিযোগিতা

ওম্মে হাবিবা তৃষা
রমজান : সংযমের শিক্ষা না ভোগের প্রতিযোগিতা

রমজান আমাদের দরজায় কড়া নাড়লেই চারপাশের আবহাওয়ায় এক ধরনের পরিবর্তন অনুভূত হয়। মসজিদে মুসল্লির সংখ্যা বাড়ে, ঘরে ঘরে ইফতারের প্রস্তুতি চলে, সন্ধ্যার আকাশে আজানের ধ্বনি যেন নতুন এক আবেগ জাগায়। রমজান নিঃসন্দেহে আত্মশুদ্ধি, সংযম ও সহমর্মিতার মাস। কিন্তু প্রশ্ন হলো- আমরা কি সত্যিই সেই চেতনাকে ধারণ করছি, নাকি ধীরে ধীরে এই মাসটিকেও ভোগের প্রতিযোগিতায় পরিণত করছি?

রমজানের মূল শিক্ষা সংযম। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকার ভেতর দিয়ে মানুষ ধৈর্য, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আত্মসমালোচনার অনুশীলন করে। ক্ষুধা ও তৃষ্ণা মানুষকে মনে করিয়ে দেয়- সমাজে এমন অসংখ্য মানুষ আছে, যাদের কাছে এই অভাব প্রতিদিনের বাস্তবতা। রোজার এই অভিজ্ঞতা আমাদের হৃদয়ে সহমর্মিতার বোধ জাগ্রত করার কথা। কিন্তু বাস্তবে আমরা কতটা সেই শিক্ষা গ্রহণ করছি?

রমজান এলেই বাজারে ভিন্ন এক দৃশ্য দেখা যায়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা বাড়ে, দাম বাড়ে, কখনো কৃত্রিম সংকটও তৈরি হয়। ব্যবসার নীতিগত সততার পরিবর্তে অনেক সময় লাভের হিসাবই বড় হয়ে ওঠে। সংযমের মাসে অযথা মূল্যবৃদ্ধি শুধু অর্থনৈতিক চাপই বাড়ায় না, এটি নৈতিকতার প্রশ্নও তোলে। কারণ রমজান আমাদের শেখায় আত্মসংযম; অন্যের অসহায়তাকে সুযোগে পরিণত করা সেই শিক্ষার পরিপন্থি।

ইফতারের সংস্কৃতিও আজ নতুনরূপ নিয়েছে। একসময় ইফতার ছিল সাধারণ ও সরল- খেজুর, পানি, কিছু ভাজাপোড়া, আর পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে বসা। এখন অনেক ক্ষেত্রে ইফতার আয়োজন হয়ে উঠেছে আড়ম্বরপূর্ণ। হোটেল-রেস্তোরাঁয় ইফতার পার্টি, সামাজিক প্রতিযোগিতা, টেবিলভর্তি খাবারের প্রদর্শন- এসব যেন সংযমের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অনেক খাবার অপচয় হয়, অথচ একই সময়ে শহরের পথশিশু কিংবা নিম্নআয়ের পরিবারগুলো ন্যূনতম খাবারের জন্য সংগ্রাম করে।

তবে এই চিত্র পুরো সমাজের নয়। রমজান এলেই অসংখ্য মানুষ জাকাত, ফিতরা ও দানের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিতদের পাশে দাঁড়ান। বিভিন্ন সংগঠন ইফতার বিতরণ করে, কেউ কেউ গোপনে সাহায্য পৌঁছে দেন দরিদ্র পরিবারে। এই মানবিক উদ্যোগগুলোই প্রমাণ করে, রমজানের চেতনা এখনো বেঁচে আছে। প্রশ্ন কেবল- এটি কতটা বিস্তৃত এবং কতটা ধারাবাহিক?

রমজান শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের সময় নয়; এটি সামাজিক দায়িত্বেরও সময়। এই মাসে আমাদের আচরণে সততা, সহনশীলতা ও ন্যায়বোধের প্রতিফলন থাকা উচিত। রোজা রেখে মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা বা অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ণ করা রমজানের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অথচ বাস্তবে আমরা প্রায়ই দেখি, রোজার কষ্ট থাকলেও আচরণে পরিবর্তন আসে না। ফলে রোজা একটি আনুষ্ঠানিক রীতি হয়ে দাঁড়ায়, নৈতিক অনুশীলন নয়।

রমজান আত্মসমালোচনারও সময়। এই মাস আমাদের থামতে শেখায়, নিজের ভেতরে তাকাতে শেখায়। আমরা কেমন মানুষ, আমাদের জীবনে কী পরিবর্তন প্রয়োজন- এই প্রশ্নগুলো রমজানে নতুনভাবে সামনে আসে। কিন্তু দ্রুতগতির নগরজীবনে আমরা অনেক সময় এই গভীরতায় পৌঁছাতে পারি না। ইফতারের প্রস্তুতি, অফিসের সময়সূচি, সামাজিক ব্যস্ততার ভিড়ে আত্মজিজ্ঞাসার জায়গা ছোট হয়ে যায়।

আজকের তরুণ প্রজন্মের জন্য রমজান একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হতে পারে। প্রযুক্তি ও ব্যস্ততার ভেতরে বেড়ে ওঠা এই প্রজন্ম যদি রমজানের সংযমকে জীবনের অংশ করতে পারে, তবে তা শুধু ধর্মীয় অনুশীলনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি ব্যক্তিত্ব গঠনের শক্তিতে পরিণত হবে। ধৈর্য, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সহমর্মিতা- এই গুণগুলোই তো একজন দায়িত্বশীল নাগরিকের ভিত্তি।

অন্যদিকে রাষ্ট্র ও সমাজেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। বাজার ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু রাখা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং দরিদ্র মানুষের জন্য সহায়তার ব্যবস্থা করা জরুরি। রমজানের চেতনাকে শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; এটি সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হওয়া উচিত।

রমজান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃত সম্পদ বস্তুগত নয়- নৈতিকতা ও মানবিকতাই আসল সম্পদ। ক্ষুধার অনুভূতি আমাদের নম্র করে, প্রার্থনা আমাদের সংযত করে, দান আমাদের উদার করে তোলে। যদি এই পরিবর্তন রমজান শেষে টিকে থাকে, তবেই রোজার সার্থকতা।

সবশেষে বলা যায়, রমজান আমাদের সামনে দুটি পথ খোলা রাখে- সংযমের পথ কিংবা ভোগের পথ। আমরা যদি এই মাসকে শুধু খাদ্যতালিকার বৈচিত্র্য বা সামাজিক আয়োজনের উৎসবে সীমাবদ্ধ করি, তবে তার গভীরতা হারিয়ে যাবে। কিন্তু যদি একে আত্মশুদ্ধি, নৈতিক উন্নতি ও মানবিকতার অনুশীলনে রূপান্তর করতে পারি, তবে রমজান আমাদের ব্যক্তি ও সমাজ- উভয়কেই বদলে দিতে পারে।

রমজান তাই কেবল একটি ধর্মীয় সময় নয়; এটি একটি নৈতিক আহ্বান। এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে যদি আমরা নিজেদের ভেতরে সংযম, সহমর্মিতা ও সততার বীজ রোপণ করতে পারি, তবে সমাজে সত্যিকারের পরিবর্তনের সূচনা ঘটবে। আর তাতেই রমজানের প্রকৃত সৌন্দর্য উন্মোচিত হবে।

ওম্মে হাবিবা তৃষা

দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত