প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক ও কৌশলগত দিকসহ সবমিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। পাহাড়, নদী ও সবুজে ঘেরা এই জনপদ শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, বরং বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক সহাবস্থানের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবেও পরিচিত। তবে দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চল নানা রাজনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি ইশতেহারে পার্বত্য শান্তি চুক্তির পুনর্মূল্যায়নের বিষয়টি উঠে আসায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু।
১৯৯৭ সালের দোসরা ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পার্বত্য শান্তি চুক্তি ছিল একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের সংঘাত নিরসন, উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা এবং পাহাড়ে বসবাসরত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। চুক্তির ফলে সহিংসতা অনেকাংশে কমেছে, প্রশাসনিক কাঠামোয় কিছু পরিবর্তন এসেছে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু প্রায় তিন দশক পর বাস্তবতার আলোকে দেখা যাচ্ছে, চুক্তির সব ধারা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি, আবার কিছু ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন নিয়ে মতবিরোধও রয়েছে। ফলে একটি অংশ মনে করে চুক্তি কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি, অন্যদিকে আরেকটি অংশ মনে করে এটি এখনও পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তির প্রধান ভিত্তি।
এই প্রেক্ষাপটে শান্তিচুক্তি পুনর্মূল্যায়নের প্রশ্নটি অস্বাভাবিক নয়, বরং সময়োপযোগী। যে কোনো জাতীয় চুক্তি বা নীতিমালা সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পর্যালোচনা করা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে পুনর্মূল্যায়ন যেন কোনোভাবেই বিভাজন বা নতুন উত্তেজনার কারণ না হয়, সেই বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেতে হবে। আলোচনার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত পার্বত্য চট্টগ্রামে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা, সমঅধিকার নিশ্চিত করা এবং উন্নয়নের সুফল সব মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
সারাদেশের তুলনায় পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা অত্যন্ত জটিল। এখানে উপজাতি ও বাঙালি, উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের দীর্ঘদিনের বসবাস, ইতিহাস ও প্রত্যাশা রয়েছে। তাই কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে প্রয়োজন অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ। স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজ, গবেষক, প্রশাসন ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের মতামতকে সমান গুরুত্ব দিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি করতে হবে। একতরফা সিদ্ধান্ত কখনও স্থায়ী সমাধান বয়ে আনে না, বরং পারস্পরিক আস্থা গড়ে তোলাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।
পুনর্মূল্যায়নের আলোচনায় কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখা জরুরি। প্রথমত, উন্নয়ন যেন শুধুমাত্র অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ না থাকে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তিগত সুযোগ সম্প্রসারণেও জোর দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা দীর্ঘদিনের একটি স্পর্শকাতর ইস্যু, এটি সমাধানে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা অপরিহার্য। তৃতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখার পাশাপাশি মানবিক ও অংশগ্রহণমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সব জাতিগোষ্ঠীর মানুষ নিরাপত্তার পাশাপাশি সম্মানবোধও অনুভব করে।
এক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা সবচেয়ে বড় নিয়ামক। ক্ষমতায় যে দলই আসুক না কেন, পার্বত্য চট্টগ্রামকে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে রেখে জাতীয় ঐক্যের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। কারণ এই অঞ্চল শুধু বাংলাদেশের একটি ভৌগোলিক সীমানা নয়, এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচয় হবে এমন একটি পথ খুঁজে বের করা, যেখানে শান্তি ও উন্নয়ন জাতি-ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে পরস্পরকে শক্তিশালী করবে।
একই সঙ্গে সামাজিক সম্প্রীতি জোরদার করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পার্বত্য চট্টগ্রামে নানা জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের বসবাস থাকা সত্ত্বেও একটি অভিন্ন জাতীয় পরিচয় ‘বাংলাদেশি’ সবার মধ্যে সংহতির সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে। এই পরিচয় কোনো বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করে না, বরং পারস্পরিক সম্মান ও সহাবস্থানের ভিত্তিতে একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের ধারণাকে শক্তিশালী করে। শিক্ষা, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও যৌথ উন্নয়ন উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
মনে রাখতে হবে, শান্তি শুধু চুক্তির কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিফলিত হয়। যখন একজন শিক্ষার্থী নিরাপদে বিদ্যালয়ে যেতে পারে, একজন কৃষক নিশ্চিন্তে জমিতে কাজ করতে পারে, কিংবা একজন উদ্যোক্তা বিনিয়োগে আস্থা পায়, তখনই প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই পুনর্মূল্যায়নের প্রক্রিয়া এমন হতে হবে, যা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত মানুষের বাস্তব জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।
তাই পার্বত্য শান্তি চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন কোনো বিতর্ক তৈরির বিষয় নয়, বরং এটি হতে পারে নতুন সম্ভাবনার দ্বার। সঠিক পরিকল্পনা, আন্তরিকতা এবং সর্বস্তরের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে এই অঞ্চলের প্রতিটি মানুষের মর্যাদা, অধিকার ও স্বপ্নকে সমান গুরুত্ব দেওয়া আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। মাথা উঁচু করে ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়ে এগিয়ে যাওয়ার এই প্রত্যাশাই হোক আগামী দিনের পথচলার প্রেরণা, যেখানে বৈচিত্র্য হবে শক্তি, ঐক্য হবে ভিত্তি, আর শান্তিই হবে উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি।
এম মহাসিন মিয়া
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা