ঢাকা বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

রমজানে একই আজান : ভিন্ন থালা

ওম্মে হাবিবা তৃষা, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
রমজানে একই আজান : ভিন্ন থালা

মাগরিবের আজান ভেসে আসে চারিদিকে। একই সূর্যাস্ত, একই চাঁদের মাস, একই রমজান- কিন্তু একই সমাজে দুই পরিবারের জীবনে ফুটে ওঠে দুই ভিন্ন চিত্র। আজানের ধ্বনি যেমন সবার কানে পৌঁছে যায়, তেমনি রোজার বিধানও সবার জন্য সমান। তবু বাস্তবতা সমান নয়। কারও ইফতারের টেবিলে প্রাচুর্যের বাহার, কারও থালায় সামান্য আহার।

শহরের এক অভিজাত এলাকায় একটি পরিবার রমজানকে ঘিরে বিশেষ প্রস্তুতি নেয়। রমজান শুরু হওয়ার আগেই বাজারের তালিকা তৈরি হয়। প্রতিদিনের ইফতারের জন্য আলাদা মেনু ঠিক করা হয়। বিকেল হতেই রান্নাঘরে ব্যস্ততা বেড়ে যায়। খেজুর, ফল, শরবত, পিয়াজু, বেগুনি, কাবাব, হালিম, বিরিয়ানি নানা পদের আয়োজন। টেবিল যেন এক রঙিন উৎসব। পরিবারের সদস্যরা ইফতারের আগে ছবি তোলে, সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করে। খাবারের পরিমাণ এত বেশি যে অনেক সময় কিছু অবশিষ্ট থাকে। রোজা যেন এখানে শুধু ক্ষুধা দমনের অনুশীলন নয়, বরং আয়োজনের প্রতিযোগিতাও।

অন্যদিকে, শহরেরই অন্য প্রান্তে কিংবা গ্রামের কোনো ছোট ঘরে আরেকটি পরিবার রমজান কাটায় ভিন্ন বাস্তবতায়। দিনমজুর বাবা সারাদিন কাজের খোঁজে ঘুরে বেড়ান। কাজ না পেলে আয় নেই। মা ঘরে বসে হিসাব মেলান- আজকের ইফতারে কী থাকবে? অনেক সময় টেবিলে থাকে শুধু ভাত আর লবণ, অথবা সামান্য ডাল। কখনও দু-একটি খেজুর পেলে সেটাই বড় প্রাপ্তি। শিশুরা চুপচাপ বসে থাকে। তাদের চোখে হয়তো কৌতূহল- পাশের বাড়িতে এত কিছু রান্না হচ্ছে, আমাদের ঘরে কেন নয়? তবু তারা অভিযোগ করে না। কারণ অভাব তাদের শেখায় ধৈর্য। একই আজান, কিন্তু অনুভূতি আলাদা। এক পরিবার ইফতারের পরও খাবার বেছে খায়; অন্য পরিবার অল্প খাবারটুকু সমান ভাগে ভাগ করে। ধনী পরিবারের শিশু হয়তো বলে, ‘আজ এটা ভালো লাগছে না।’ গরিব পরিবারের শিশু ছোট্ট একটি ফল পেয়ে আনন্দে ঝলমল করে ওঠে। এই বৈষম্য শুধু অর্থের নয়; এটি জীবনের সুযোগ ও নিরাপত্তার বৈষম্য।

রমজান আমাদের শেখায় সংযম। কিন্তু প্রশ্ন হলো- যেখানে কেউ প্রতিদিনই অভাবে থাকে, তার জন্য সংযমের শিক্ষা নতুন কী? যে পরিবার বছরের বারো মাসই অল্পে চলে, তাদের কাছে রোজা মানে হয়তো আলাদা কষ্ট নয়, বরং একই সংগ্রামের ধারাবাহিকতা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত