ঢাকা বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ভয়াবহ বাস্তবতা

সুমাইয়া সিরাজ সিমি, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ভয়াবহ বাস্তবতা

বাংলাদেশের সড়ক যেন ধীরে ধীরে এক নীরব যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে। উন্নয়নের গল্প যতই উচ্চারিত হোক, পরিসংখ্যান বলছে আমাদের সড়ক নিরাপত্তা এখনও ভঙ্গুর। আর এই বিপর্যয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মোটরসাইকেল। গতির মোহ, সহজলভ্যতা, কিশোর যুবকদের ঝোঁক এবং নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবস্থাপনা মিলিয়ে মোটরসাইকেল আজ এক ভয়ঙ্কর মৃত্যু ফাঁদে রূপ নিয়েছে। প্রতিদিনের খবরের পাতায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি এতটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে যে, আমরা যেন শোকের প্রতিও অসাড় হয়ে যাচ্ছি।

সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই বছর দেশে ৭ হাজার ৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৭ হাজার ৩৫৯ জন এবং আহত হয়েছেন ১৬ হাজার ৪৭৬ জন। এর মধ্যে ৩ হাজার ২৯টি দুর্ঘটনাই ঘটেছে মোটরসাইকেলকে কেন্দ্র করে, যেখানে নিহত হয়েছেন ২ হাজার ৬৭২ জন যা মোট নিহতের ৩৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি তিনজন নিহতের মধ্যে একজন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৪০ শতাংশই মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট। এই হার শুধু একটি পরিবহন মাধ্যমের ঝুঁকিকেই নয়, একটি সামাজিক প্রবণতার ভয়াবহতাকেও সামনে আনে।

২০২৪ সালের পরিসংখ্যানের সঙ্গেও তুলনা করলে দেখা যায়, দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি দুই ক্ষেত্রেই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বিদ্যমান। ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছিল ৬ হাজার ৯২৭টি, এতে নিহত হন ৭ হাজার ২৯৪ জন। ২০২৫ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট মৃত্যুও। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে নিবন্ধিত মোট যানবাহনের প্রায় ৭১ শতাংশই মোটরসাইকেল। সহজ কিস্তি সুবিধা, রাইড-শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মের বিস্তার এবং কর্মসংস্থানের সংকট তরুণদের দ্রুত মোটরসাইকেলের দিকে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু সেই সঙ্গে বাড়েনি প্রশিক্ষণ, বাড়েনি শৃঙ্খলা, বাড়েনি আইন প্রয়োগের কঠোরতা।

২০২৬ সালের শুরুটাও নতুন কোনো পরিবর্তন আনেনি, একই চিত্র অব্যাহত। চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির প্রাথমিক হিসাবেই কয়েকশ’ দুর্ঘটনায় বহু প্রাণহানির তথ্য সামনে এসেছে, যার বড় অংশ মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট। নতুন বছরের প্রথম মাসেই প্রায় অর্ধশতাধিক মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীর মৃত্যু সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

গত কয়েক বছরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার স্থির না থেকে ক্রমাগত ওঠানামা করলেও মোট মৃত্যুর অংশে এর আধিপত্য অটুট থাকছে। বিশেষ করে ঈদ ও উৎসবকেন্দ্রিক সময়ে মহাসড়কে মোটরসাইকেলের ঝুঁকি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। পরিবার-পরিজন নিয়ে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়না অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়ায়।

এই মৃত্যুর মিছিলের সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক হলো- কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বিপুল ক্ষয়। ২০২৫ সালে ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী ৫ হাজার ৭২৩ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৭৮ শতাংশ। এদের বড় একটি অংশই মোটরসাইকেল চালক বা আরোহী। অর্থাৎ দেশের উৎপাদনশীল শক্তিই সবচেয়ে বেশি ঝরে যাচ্ছে। একটি দুর্ঘটনা মানে শুধু একটি প্রাণহানি নয়; এটি একটি পরিবারের উপার্জনের উৎস হারানো, একটি শিশুর শিক্ষার পথ থেমে যাওয়া, একটি বৃদ্ধ পিতামাতার ভরসা ভেঙে পড়া। জাতীয় অর্থনীতির অদৃশ্য ক্ষতও এখানেই নিহিত।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কাঠামোগত ও আচরণগত কারণ কাজ করছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক, লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভিং, মানহীন হেলমেট ব্যবহার বা হেলমেট না পরা, অতিরিক্ত গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং এসব যেন নিত্যদিনের চিত্র। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটি মোটরসাইকেলে তিন থেকে চারজন আরোহী, যার মধ্যে শিশুও থাকে। দুর্ঘটনার সময় সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থাই কার্যকর থাকে না। ট্রাফিক আইন প্রয়োগে নেই বিশেষ কোনো কঠোরতা এবং এর সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। জরিমানা বা মামলা অনেক সময় ভয় দেখালেও স্থায়ী আচরণগত পরিবর্তন আনতে পারছে না।

অবকাঠামোগত ত্রুটিও কম দায়ী নয়। অপরিকল্পিত ইউ-টার্ন, ঝুঁকিপূর্ণ মোড়, সড়কে গর্ত, আলোর স্বল্পতা এবং ভারী যানবাহনের সঙ্গে একই লেনে মোটরসাইকেলের চলাচল এসবই দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। মহাসড়কে আলাদা মোটরসাইকেল লেন না থাকায় দ্রুতগতির বাস-ট্রাকের পাশে মোটরসাইকেল চালানো অনেক সময় আত্মঘাতী হয়ে ওঠে। নগর এলাকায় রাইড-শেয়ারিংয়ের চাপে সময়মতো পৌঁছানোর প্রতিযোগিতা চালকদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।

সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, নারী ও শিশুরাও এই বিপর্যয়ের বাইরে নেই। ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ৯৬২ জন নারী ও ১ হাজার ৮ জন শিশু নিহত হয়েছেন। তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার। একটি শিশুর মৃত্যু মানে একটি ভবিষ্যতের মৃত্যু; একটি মায়ের মৃত্যু মানে একটি পরিবারের ভিত্তি নড়ে যাওয়া। নিরাপদ সড়ক তাই শুধু পরিবহন নীতির বিষয় নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের প্রশ্ন। প্রশ্ন হচ্ছে, সমাধান কোথায়? শুধু কঠোর আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; তার কার্যকর প্রয়োগ প্রয়োজন। মোটরসাইকেল চালকদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স প্রাপ্তির প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, মানসম্মত হেলমেট নিশ্চিতকরণ, মহাসড়কে আলাদা লেন এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত নিরাপদ সড়ক সংস্কৃতি গড়ে তোলা। গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।

মোটরসাইকেল নিজে কোনো শত্রু নয়; এটি একটি প্রয়োজনীয় ও কার্যকর যানবাহন। কিন্তু যখন গতি দায়িত্বকে অতিক্রম করে, যখন স্বাধীনতা বেপরোয়ায় রূপ নেয়, তখনই এটি মৃত্যু ফাঁদে পরিণত হয়। ২০২৪, ২০২৫ পেরিয়ে ২০২৬ সালেও যদি একই চিত্র অব্যাহত থাকে, তবে আমাদের উন্নয়নচর্চা এক গভীর প্রশ্নের মুখে পড়বে। সড়ক শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর পথ নয়; এটি জীবনের ধারক। সেই পথ যদি নিরাপদ না হয়, তবে উন্নয়নের সব অর্জনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে।

এখন সময় এসেছে গতির নেশা থেকে দায়িত্বের চেতনায় ফেরার। কারণ প্রতিটি দুর্ঘটনার পেছনে যে কান্না, তা কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে মুছে ফেলা যায় না। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা না গেলে মোটরসাইকেলের চাকা ঘুরবে, কিন্তু থেমে যাবে অসংখ্য জীবনের স্বপ্ন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত