প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
বাংলাদেশের আকাশপথের ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের নাম হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল। দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর বিশাল কর্মযজ্ঞের পর এই টার্মিনালটি এখন উদ্বোধনের অপেক্ষায়। একটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধানমাধ্যম হলো- তার বিমানবন্দর। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে এবং পর্যটনশিল্পকে বিশ্বমানের পর্যায়ে নিয়ে যেতে এই তৃতীয় টার্মিনালটি সময়োপযোগী এবং অপরিহার্য একটি পদক্ষেপ।
বর্তমানে শাহজালাল বিমানবন্দরের দুটি টার্মিনাল ব্যবহার করে বছরে প্রায় ৮০ লাখ যাত্রী যাতায়াত করেন। কিন্তু বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি এবং প্রবাসীদের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এই সক্ষমতা অনেক আগেই সীমা ছাড়িয়ে গেছে। যাত্রীদের দীর্ঘলাইন, মালামাল পেতে বিলম্ব এবং সেবার নিম্নমান নিয়ে প্রায়ই অভিযোগ শোনা যায়। এই সংকট নিরসনে তৃতীয় টার্মিনাল হবে একটি স্থায়ী সমাধান। নতুন এই টার্মিনালটি চালু হলে বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা ৮০ লাখ থেকে বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখে। জাপানি স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই টার্মিনালে থাকছে স্বয়ংক্রিয় চেক-ইন কাউন্টার, আধুনিক ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা এবং বিশাল কার্গো ভিলেজ। বাণিজ্যের প্রসারে কার্গো সক্ষমতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। নতুন টার্মিনালের অত্যাধুনিক কার্গো কমপ্লেক্স বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য পণ্য রপ্তানিকে আরও দ্রুত ও সহজতর করবে।
একটি দেশের প্রবেশদ্বার যদি আকর্ষণীয় ও সুশৃঙ্খল হয়, তবে তা বিদেশি বিনিয়োগকারী ও পর্যটকদের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তৃতীয় টার্মিনালটি শুধু একটি ভবন নয়, এটি বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং।
উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা দেখে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আশ্বস্ত হন। এই টার্মিনালটি চালুর ফলে দেশে-বিদেশি বিনিয়োগের হার বাড়বে বলে আশা করা যায়। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি শক্তিশালী ‘এভিয়েশন হাব’ হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। ইউরোপ-আমেরিকা থেকে পূর্ব এশিয়ায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে ঢাকাকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে গড়ে তুলতে এই টার্মিনাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য কয়েক হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তবে অবকাঠামো তৈরিই শেষ কথা নয়; আসল চ্যালেঞ্জ হলো সেবার মান বজায় রাখা। অতীতে আমরা দেখেছি, আধুনিক প্রযুক্তি থাকলেও দক্ষ জনবল বা সদিচ্ছার অভাবে যাত্রীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পান না। টার্মিনালটি পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ জনবল প্রয়োজন। প্রয়োজনে বিদেশি অভিজ্ঞ গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কোম্পানিকে যুক্ত করে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বিমানবন্দরে যাত্রীরা যেন কোনো ধরনের হয়রানি বা চুরির শিকার না হন, সে বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। টার্মিনালের সঙ্গে শহরের অন্যান্য অংশের যোগাযোগব্যবস্থা (যেমন- এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল) যেন নির্বিঘ্ন হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয় টার্মিনাল চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বকে জানান দিচ্ছে যে, আমরা আর পিছিয়ে নেই। এটি আমাদের সক্ষমতার প্রতীক এবং ২০৪১ সালের স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার পথে একটি বিশাল মাইলফলক। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রত্যাশা, কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়াই দ্রুততম সময়ে পূর্ণাঙ্গভাবে এ টার্মিনাল চালু করা হোক। আমাদের আকাশপথ হোক নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যময় এবং বিশ্বমানের।