ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ২৬ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

সাময়িক যুদ্ধবিরতি নাকি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের নতুন অধ্যায়

জুবাইয়া বিন্তে কবির
সাময়িক যুদ্ধবিরতি নাকি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের নতুন অধ্যায়

মধ্যপ্রাচ্য একটি অঞ্চল- যেখানে ইতিহাস, রাজনীতি, ধর্মীয় বাস্তবতা এবং বিশ্বশক্তির স্বার্থ জড়িয়ে আছে এক জটিল সমীকরণে। এই অঞ্চলের প্রতিটি সংঘাত শুধু সীমান্তের ভেতরে আবদ্ধ থাকে না; বরং তা ছড়িয়ে পড়ে বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তার প্রতিটি স্তরে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, তা আবারও প্রমাণ করেছে- মধ্যপ্রাচ্যের কোনো সংঘাতই বিচ্ছিন্ন নয়। এই উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন। আপাতদৃষ্টিতে এটি স্বস্তির খবর হলেও, গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এই যুদ্ধবিরতি যতটা শান্তির ইঙ্গিত বহন করে, তার চেয়েও বেশি অনিশ্চয়তা, কৌশল এবং ভবিষ্যৎ সংঘাতের সম্ভাবনা ধারণ করে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ। পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক উপস্থিতি এই চারটি বিষয়কে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস ক্রমাগত বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বহুদিন ধরেই ইরানকে তাদের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছেন। অন্যদিকে, ইরান নিজেকে একটি প্রতিরোধশক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে, যা পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এই দ্বন্দ্বের ভেতরেই শুরু হয় সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা, যা ধীরে ধীরে একটি বিস্তৃত সংঘাতে রূপ নেয়। যখন সংঘাত চরমে পৌঁছেছে, তখনই ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির। তিনি এটিকে ‘বিশ্ব শান্তির জন্য একটি বড় পদক্ষেপ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই সিদ্ধান্ত কি সত্যিই শান্তির উদ্দেশে নেওয়া, নাকি এটি একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে তখন কঠিন একটি সিদ্ধান্ত ছিল। একদিকে যুদ্ধ চালিয়ে গেলে তা একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারত, অন্যদিকে হঠাৎ করে পিছু হটলে তা রাজনৈতিক দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হতো। এই অবস্থায় যুদ্ধবিরতি একটি মধ্যপন্থা হিসেবে কাজ করেছে যেখানে সংঘাত থামানো হয়েছে; কিন্তু চাপ বজায় রাখা হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী খোলা রাখার শর্ত যুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করেছে যে, এই যুদ্ধবিরতি নিঃশর্ত নয়; বরং এটি একটি চাপ প্রয়োগের কৌশল।

যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লিপিড সরাসরি এই সিদ্ধান্তকে ‘রাজনৈতিক বিপর্যয়’ হিসেবে আখ্যা দেন। তার মতে, ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় দেশটিকে আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে, যা শুধু কূটনৈতিক ব্যর্থতা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় মর্যাদার অবমাননা। লাপিদ আরও অভিযোগ করেন যে, প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু কৌশলগত এবং কূটনৈতিক দুই ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়েছেন। তার এই মন্তব্য ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নীতিকে অনেক বিশ্লেষক ‘দ্বৈত ও অসংগতিপূর্ণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কখনও কঠোর সামরিক হুমকি, আবার কখনও শান্তির বার্তা এই দুইয়ের মধ্যে দোলাচল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা-এর উপদেষ্টা বেন রোডস এই নীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার মতে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে একটি লজ্জাজনক অধ্যায়। তিনি আরও সতর্ক করেছেন যে, এই ধরনের নীতি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বকে দুর্বল করে এবং আন্তর্জাতিক আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এই সংঘাতে ইরান নিজেকে একটি বিজয়ী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব, বিশেষ করে মজতবা খামেনি, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলেও স্পষ্ট করে দিয়েছেন এটি যুদ্ধের শেষ নয়। ইরানের দাবি অনুযায়ী, তারা যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ১০ দফা প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য করেছে। এই প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, সামরিক আগ্রাসন বন্ধ, হরমুজ প্রণালীতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের স্বীকৃতি। এই দাবিগুলো যদি আংশিকভাবেও বাস্তবায়িত হয়, তবে তা ইরানের জন্য একটি বড় কৌশলগত সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে।

বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। এই প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে। যুদ্ধ চলাকালে তেলের দাম বৃদ্ধি, বাজারে অস্থিরতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন দেখা গেছে। ফলে এই প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে এই প্রণালী খোলা রাখার বিষয়টি যুক্ত হওয়ায় বোঝা যায়- এই সংঘাত শুধু সামরিক নয়; এটি অর্থনৈতিক যুদ্ধও। এই সংঘাতে কোনো পক্ষই পূর্ণাঙ্গ বিজয় অর্জন করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কিছু সামরিক সাফল্য অর্জন করলেও, তারা ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে দিতে পারেনি। অন্যদিকে, ইরানও পুরোপুরি প্রতিপক্ষকে পরাজিত করতে পারেনি। তবে তারা নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে এবং কিছু ক্ষেত্রে শক্তিশালী করেছে। এই পরিস্থিতিতে প্রতিটি পক্ষই নিজেদের বিজয়ী হিসেবে উপস্থাপন করছে যা মূলত রাজনৈতিক বয়ান, বাস্তবতা নয়। এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আস্থার অভাব। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস কোনো চুক্তিকেই স্থায়ী হতে দিচ্ছে না। আলোচনার মাঝেই হামলার ঘটনা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং রাজনৈতিক বক্তব্য সব মিলিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আস্থা প্রায় নেই বললেই চলে। এই বাস্তবতায় বর্তমান যুদ্ধবিরতিও অনেকের কাছে একটি সাময়িক বিরতি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

এই সংঘাতের প্রভাব পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। লেবানন, ইয়েমেন, ইরাক সব জায়গায় ইরান-সমর্থিত শক্তিগুলো সক্রিয়। যদি সংঘাত আবার শুরু হয়, তবে তা একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব হবে ভয়াবহ।

বর্তমান যুদ্ধবিরতি নিঃসন্দেহে একটি স্বস্তির মুহূর্ত এনে দিয়েছে। এটি তাৎক্ষণিক সংঘাত কমিয়েছে এবং আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু এটি কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়। বরং এটি একটি সূক্ষ্ম কৌশলগত বিরতি যেখানে প্রতিটি পক্ষ নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠন করছে। আগামী দুই সপ্তাহ হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের আলোচনার ওপর নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্য শান্তির পথে এগোবে, নাকি আবারও একটি ভয়াবহ সংঘাতের দিকে ধাবিত হবে। সবশেষে বলা যায়, এই যুদ্ধবিরতি একটি প্রশ্নচিহ্ন যার উত্তর এখনও অজানা। শান্তি কি আসবে, নাকি এটি শুধু ঝড়ের আগের নীরবতা তা নির্ধারণ করবে সময়, কূটনীতি এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা।

জুবাইয়া বিন্তে কবির

অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত