প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৯ এপ্রিল, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজ কাঠামোর গভীরে প্রোথিত রয়েছে কৃষি। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত খাদ্যনিরাপত্তা অর্জন, গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এবং দারিদ্র্য হ্রাসে কৃষির অবদান অনস্বীকার্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪০ শতাংশই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই কৃষির অন্যতম প্রধান উপকরণ হচ্ছে সার, বিশেষ করে ইউরিয়া সার, যা দেশের ধানসহ প্রধান ফসল উৎপাদনে অপরিহার্য। অথচ সেই সার উৎপাদনের মূল ভিত্তি দেশীয় সার কারখানাগুলো আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা শুধু শিল্পখাতের দুর্বলতা নয়; এটি একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও নীতিগত ব্যর্থতার প্রতিফলন, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ হতে পারে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান পরিস্থিতির গভীরতা স্পষ্ট করে। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (BCIC)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিদ্যমান ছয়টি প্রধান ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে পাঁচটিই গ্যাস সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে দৈনিক প্রায় ৭ হাজার টনের বেশি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাও বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যেখানে প্রায় ১০ লাখ টন ইউরিয়া উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেখানে প্রথম আট মাসেই অর্জিত হয়েছে মাত্র প্রায় অর্ধেক। অর্থাৎ, চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে একটি বিপজ্জনক ফাঁক তৈরি হয়েছে, যা পূরণ করতে হচ্ছে আমদানির মাধ্যমে।
এই সংকটের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে জ্বালানি সংকট, বিশেষ করে গ্যাসের ঘাটতি। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের একটি বড় অংশ বিদ্যুৎ খাতে চলে যাচ্ছে, ফলে শিল্পখাত বিশেষ করে সার কারখানাগুলো প্রয়োজনীয় গ্যাস থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA)-এর এক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জ্বালানি বণ্টনে অগ্রাধিকার নির্ধারণের অভাব শিল্প উৎপাদনে বড় বাধা সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের সার কারখানাগুলো মূলত গ্যাসনির্ভর। একটি পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন ব্যবস্থাকে সচল রাখতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ গ্যাস প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প ও গৃহস্থালি খাতে বাড়তি চাহিদার কারণে সার কারখানাগুলো প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ পাচ্ছে না। ফলে সরকার বাধ্য হয়ে অনেক সময় কারখানাগুলো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে কৃষিনির্ভর একটি দেশে কৃষি-সহায়ক শিল্পকে কেন অগ্রাধিকার দেওয়া হবে না?
জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে পুরোনো প্রযুক্তি ও অবকাঠামো। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (BIDS)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের অধিকাংশ সার কারখানা ৩০-৪০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এবং এগুলোর উৎপাদন দক্ষতা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেক কম। এসব কারখানার যন্ত্রপাতি এখন অনেকাংশে অকার্যকর ও অদক্ষ হয়ে পড়েছে। উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি হলেও উৎপাদন সক্ষমতা কম। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সার কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। সেখানে পুরোনো কারখানাগুলো ক্রমেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।
তবে সমস্যা শুধু প্রযুক্তিগত নয়; এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB)-এর একাধিক প্রতিবেদনে শিল্পখাতে পরিকল্পনা ঘাটতি, দুর্নীতি ও অদক্ষতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। সময়মতো সংস্কার না করা, পরিকল্পনার অভাব, সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা এবং অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতি এসবই সার কারখানাগুলোর বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী। বহু বছর ধরে এসব কারখানার আধুনিকায়নের কথা বলা হলেও বাস্তবায়ন হয়েছে খুবই সীমিত। নীতিনির্ধারণের এই অদূরদর্শিতা আজকের সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
এই সংকটের অর্থনৈতিক প্রভাবও ব্যাপক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সার আমদানির ব্যয় গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। আন্তর্জাতিক খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-এর তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক বাজারে সার ও জ্বালানির মূল্য অস্থির থাকায় আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে কৃষি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরকারকে বিপুল পরিমাণ সার আমদানি করতে হচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে, যা বর্তমান বৈদেশিক রিজার্ভ পরিস্থিতিতে একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। পাশাপাশি, সরকারকে কৃষকদের জন্য সার ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যা বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
তৌসিফ রেজা আশরাফী
লেখক ও শিক্ষার্থী, দিনাজপুর আইন কলেজ