ঢাকা রোববার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ৬ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বৈশ্বিক সংঘাতের ছায়ায় বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত জীবন

সাদিয়া সুলতানা রিমি
বৈশ্বিক সংঘাতের ছায়ায় বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত জীবন

বর্তমান বিশ্ব এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং পরিবেশগত সংকট একসঙ্গে মিলে এমন এক পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। বাংলাদেশের মতো একটি আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে আন্তর্জাতিক অস্থিরতার অভিঘাত সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় নিম্নআয়ের ও শ্রমজীবী মানুষের জীবনে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই অভিঘাতকে আরও তীব্র করে তুলেছে। এই যুদ্ধ শুধুমাত্র একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর একটি গভীর আঘাত, যার প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে।

গত কয়েক বছর ধরেই দেশের সাধারণ মানুষ নানা সংকটে জর্জরিত। করোনা মহামারির ধাক্কা, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ভাঙন এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের অস্থিরতা সব মিলিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইরানকে ঘিরে নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতি যেন ‘মরার ওপর খাড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত হাজার মাইল দূরে হলেও এর উত্তাপ এসে পড়েছে বাংলাদেশের বাজারে, বিশেষ করে জ্বালানি খাতে।

ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালী, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং ২৫ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন হয়।

এই প্রণালীতে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। এরইমধ্যে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ১২০ ডলার ছাড়িয়েছে, যা গত দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে এই দাম ১৫০ থেকে ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। বাংলাদেশের মতো একটি দেশ, যার জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল, সেখানে এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে। জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু পরিবহন খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি উৎপাদন, কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং দৈনন্দিন ভোগ্যপণ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে। ফলে সামগ্রিকভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়।

তবে এই সংকটের সবচেয়ে নির্মম দিকটি হলো এটি সাধারণ মানুষের জীবনে যে অদৃশ্য যন্ত্রণা সৃষ্টি করছে। ঢাকার পেট্রল পাম্পগুলোতে এখন লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে। পরিবহন চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।

এই সময়টুকু তারা কাজে লাগাতে পারছেন না, ফলে তাদের আয় কমে যাচ্ছে। একজন চালক দিনে যে আয় করতে পারতেন, তার একটি বড় অংশ হারিয়ে যাচ্ছে শুধু তেলের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে। অনেক সময় এত অপেক্ষার পরও তেল পাওয়া যায় না। তখন তারা বাধ্য হয়ে পরদিন আবার লাইনে দাঁড়ান। এই অনিশ্চয়তা তাদের জীবনে এক ধরনের মানসিক চাপ তৈরি করছে। যারা তেল পাচ্ছেন না, তারা কালোবাজারের দিকে ঝুঁকছেন, যেখানে তেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ। এতে তাদের দৈনিক খরচ বেড়ে যাচ্ছে কয়েকশ থেকে হাজার টাকার মতো।

এই বাড়তি খরচ তাদের সংসারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। অনেকেই ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন, কেউ কেউ কাজ ছেড়ে দিচ্ছেন। ছোট যানবাহনের চালকদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। তাদের আয়ের বড় অংশ জ্বালানির পেছনে চলে যাচ্ছে, ফলে পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে। শুধু পরিবহন খাত নয়, এই সংকটের প্রভাব পড়ছে খাদ্য বাজারেও। জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ফলে খাদ্যপণ্যের দামও বাড়ছে। বাজারে চাল, ডাল, তেল, সবজি সব কিছুর দাম ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে নিম্নআয়ের মানুষ বাধ্য হচ্ছেন তাদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে। মাছ, মাংস, ডিম, দুধের মতো পুষ্টিকর খাবার তাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। তারা শুধু ভাত বা রুটির ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী মূল্যস্ফীতির হার ৮.২৪ শতাংশ হলেও বাস্তবে তা আরও বেশি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। অনেকের মতে, প্রকৃত মূল্যস্ফীতি ১০ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যে। এই পরিস্থিতিতে একটি চার সদস্যের পরিবারের মাসিক ন্যূনতম খরচ প্রায় ২৩ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা অনেক শ্রমিকের আয়ের চেয়েও বেশি।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দেশের একটি বড় অংশের মানুষ এমন অবস্থায় আছেন, যেখানে তারা মাত্র দুই দিন কাজ করতে না পারলেই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারেন। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, বাংলাদেশ এখন ‘মন্দাক্ষীতি’ বা স্ট্যাগফ্লেশনের মুখোমুখি যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমছে, অথচ মূল্যস্ফীতি বাড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য নীতি নির্ধারণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, অন্যদিকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু রাখতে হবে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। সরকার বর্তমানে ভর্তুকি দিয়ে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু এতে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর চাপ বাড়ছে। এই চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে সরকারকে উন্নয়ন ব্যয় কমাতে হতে পারে। অবকাঠামো প্রকল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় কমানো হলে তার প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে। অন্যদিকে, দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে প্যানিক বাইং শুরু হয়েছে। মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনতে শুরু করেছে, যা সংকটকে আরও তীব্র করছে। মজুতদারি ও কালোবাজারি এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। সরকার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করলেও তা স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না। কারণ সমস্যার মূল উৎস সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, যা শুধুমাত্র আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনগণের আস্থা। যদি মানুষ মনে করে যে সরকার সঠিক তথ্য দিচ্ছে না বা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না, তাহলে তারা নিজেরাই ব্যবস্থা নিতে শুরু করবে। এর ফলে প্যানিক আরও বাড়বে। তাই এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন স্বচ্ছতা, পরিকল্পনা এবং কার্যকর পদক্ষেপ। স্বল্পমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, মধ্যমেয়াদে বিকল্প উৎস খোঁজা এবং দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকে পড়া এই তিনটি স্তরে কাজ করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই সংকটে যেন গরিব ও শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। কারণ ইতিহাস আমাদের বলে, বড় সংকটের বোঝা সবসময় গিয়ে পড়ে সেইসব মানুষের কাঁধে, যারা আগেই সবচেয়ে দুর্বল। বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের একটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির জটিল খেলায় সাধারণ মানুষের কোনো ভূমিকা না থাকলেও তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এই দুর্বল জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করা এবং তাদের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। এই যুদ্ধ শুধু সীমান্তের লড়াই নয় এটি অর্থনীতির যুদ্ধ, এটি বেঁচে থাকার যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি লড়াই করতে হচ্ছে সেই মানুষদের, যারা প্রতিদিন জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন বাংলাদেশের গরিব ও শ্রমজীবী মানুষ।

সাদিয়া সুলতানা রিমি

শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত