প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬
জ্বালানি একটি দেশের অর্থনীতি, শিল্প, কৃষি, পরিবহন ও দৈনন্দিন জীবনের প্রধান চালিকাশক্তি। বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে কলকারখানা, সেচ ব্যবস্থা, পণ্য পরিবহন, নৌযান, বিমান ও ব্যক্তিগত যানবাহন সব ক্ষেত্রেই তেলের গুরুত্ব অপরিসীম। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জ্বালানি নিরাপত্তা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন কল্পনা করা যায় না। তাই একটি দেশের নিজস্ব তেল শোধন সক্ষমতা যত বেশি শক্তিশালী হয়, সে দেশের অর্থনীতিও তত বেশি স্থিতিশীল থাকে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য- স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হয়ে গেলেও বাংলাদেশে সরকারিভাবে নতুন কোনো তেল শোধনাগার প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
এটি জাতীয় অগ্রগতির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অবহেলার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। বর্তমানে দেশে যে একমাত্র সরকারি তেল শোধনাগার রয়েছে চট্টগ্রামের ঊধংঃবৎহ জবভরহবৎু খরসরঃবফ (ঊজখ), সেটিও পাকিস্তান আমলে ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। স্বাধীনতার পর এত দীর্ঘ সময় পার হলেও সেখানে উল্লেখযোগ্য আধুনিকায়ন হয়নি। বিশ্বের বহু দেশ গত কয়েক দশকে নতুন প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক রিফাইনারি নির্মাণ করেছে, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনও পুরোনো অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল অবস্থায় রয়েছে। এতে দেশের জ্বালানি খাতের সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের বিদ্যমান শোধনাগারটির আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এটি মূলত মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা কম ঘনত্বের ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেল শোধন করতে পারে। কিন্তু বর্তমানে বিশ্ববাজারে রাশিয়া, মধ্য এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে তুলনামূলক বেশি ঘনত্বের ক্রুড অয়েল অনেক সময় কম দামে পাওয়া যায়। বাংলাদেশের পুরোনো শোধন প্রযুক্তি সেই তেল পরিশোধন করতে সক্ষম নয়। ফলে সেই তেল অন্য দেশে পাঠিয়ে শোধন করাতে হয়, অথবা পরিশোধিত জ্বালানি তেল বেশি দামে আমদানি করতে হয়। এতে দেশের অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। এর ফলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। শুধু তেল আমদানির খরচই নয়, পরিবহন ব্যয়, শোধন ব্যয়, বন্দর খরচ এবং বিভিন্ন ধরনের সেবামূল্য যুক্ত হয়ে সামগ্রিক ব্যয় আরও বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত এই চাপ সাধারণ মানুষের ওপর এসে পড়ে। ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিনসহ বিভিন্ন জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, সেচ খরচ বৃদ্ধি পায়, যানবাহনের ভাড়া বেড়ে যায়, শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়তে থাকে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ নতুন তেল শোধনাগার স্থাপনে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে না পারার পেছনে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার পাশাপাশি আঞ্চলিক রাজনৈতিক বাস্তবতাও আলোচনায় আসে। বিভিন্ন সময়ে এমন অভিযোগ শোনা গেছে যে, পার্শ্ববর্তী কিছু শক্তি বাংলাদেশকে জ্বালানি খাতে স্বনির্ভর হতে দিতে আগ্রহী ছিল না। কারণ বাংলাদেশ যদি নিজস্ব আধুনিক শোধনাগার গড়ে তুলতে পারত, তবে বিদেশি নির্ভরতা কমে যেত এবং আঞ্চলিক বাজারে নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি হতো। তাই কখনও রাজনৈতিক চাপ, কখনও কূটনৈতিক প্রভাব, কখনও অর্থায়ন জটিলতা, আবার কখনও নানামুখী প্রশাসনিক বিলম্বের মাধ্যমে এ খাতের উন্নয়ন ধীর করা হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে জ্বালানি বাজার অত্যন্ত অস্থির। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, সামুদ্রিক রুট সংকট, রাজনৈতিক উত্তেজনা কিংবা উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে এমন পরিস্থিতি একাধিকবার দেখা গেছে। যে দেশগুলোর নিজস্ব শোধন সক্ষমতা বেশি, তারা তুলনামূলক কম ক্ষতির মুখে পড়ে। কিন্তু আমদানিনির্ভর ও সীমিত সক্ষমতার দেশগুলোকে বড় চাপ নিতে হয়। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়।
বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যাচ্ছে। বড় বড় সেতু, বন্দর, মহাসড়ক, শিল্পাঞ্চল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে। কিন্তু জ্বালানি অবকাঠামোর এই গুরুত্বপূর্ণ অংশে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা দেশের সামগ্রিক অগ্রযাত্রার সঙ্গে এক ধরনের অসামঞ্জস্য সৃষ্টি করেছে। দেশের চাহিদা বাড়ছে, শিল্প বাড়ছে, যানবাহন বাড়ছে, বিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়ছে, অথচ তেল শোধনের সক্ষমতা সেই পুরোনো অবস্থাতেই রয়ে গেছে। তাই তেল শোধনাগার বৃদ্ধি আজ শুধু একটি অর্থনৈতিক দাবি নয়, এটি জাতীয় সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রশ্ন।
আবিদ হাসান
শিক্ষার্থী, ফলিত রসায়ন ও রসায়ন প্রকৌশল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়