ঢাকা রোববার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ৬ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে

বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে

বর্তমান বিশ্ব এক নজিরবিহীন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য- সব মিলিয়ে মানবসভ্যতা আজ বহুমুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এই সংকটগুলো কোনো নির্দিষ্ট দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং এগুলো বৈশ্বিক রূপ ধারণ করেছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বিচ্ছিন্ন কোনো প্রচেষ্টা কখনও বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলা করতে পারেনি। তাই বর্তমানের এই ঘোলাটে পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র চাবিকাঠি হলো- বৈশ্বিক সংহতি ও সম্মিলিত পদক্ষেপ। আমরা যদি বর্তমান বিশ্বের প্রধান সমস্যাগুলোর দিকে তাকাই, তবে দেখব প্রতিটি বিষয় একে অন্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

জলবায়ু পরিবর্তন : এটি শুধু পরিবেশের বিষয় নয়, বরং এটি অস্তিত্বের লড়াই। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর অনীহা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অসহায়ত্ব পুরো বিশ্বকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধ বিগ্রহ শুধু প্রাণহানি ঘটাচ্ছে না, বরং বিশ্বজুড়ে সরবরাহ চেইন বা সাপ্লাই চেইনকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। ফলে বাড়ছে মুদ্রাস্ফীতি এবং অভাব। ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে ব্যবধান আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রকট হয়েছে। প্রযুক্তির অসম বণ্টন এবং ঋণের বোঝা স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে উন্নয়নের দৌড় থেকে ছিটকে দিচ্ছে।

একটি আধুনিক ও পরস্পর নির্ভরশীল বিশ্বে কোনো দেশই এককভাবে নিরাপদ থাকতে পারে না। মনে রাখতে হবে, ‘কারো ঘরে আগুন লাগলে পাশের ঘরটি কখনোই নিরাপদ নয়।’ মহামারি আমাদের শিখিয়েছে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বের প্রতিটি মানুষ নিরাপদ নয়, ততক্ষণ কেউই নিরাপদ নয়। ঠিক তেমনি, একটি দেশ কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনলে কিন্তু অন্য দেশগুলো তা বজায় না রাখলে, পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি ঠেকানো সম্ভব হবে না। ‘বর্তমান বিশ্বে সমস্যাগুলো আর জাতীয় নেই, সেগুলো এখন বৈশ্বিক নাগরিকত্বের বিষয়। তাই সমাধানের পথটিও হতে হবে সর্বজনীন।’

বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় আমাদের প্রধানত তিনটি ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন­-

জলবায়ু কূটনীতি ও প্রযুক্তি বিনিময় : উন্নত বিশ্বকে তাদের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা স্বীকার করে নিতে হবে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তির প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সবুজ প্রযুক্তি ও প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

সংঘাত নিরসন ও শান্তি প্রতিষ্ঠা : জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। অস্ত্রের প্রতিযোগিতায় বিনিয়োগ না করে সেই অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং মানবিক উন্নয়নে ব্যয় করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি : বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থাকে আরও ন্যায়সঙ্গত করতে হবে। দরিদ্র দেশগুলোর ওপর থেকে ঋণের বোঝা লাঘব করা এবং ডিজিটাল বিভাজন দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো ‘জাতীয়তাবাদ’ ও ‘সংকীর্ণ স্বার্থ’। প্রতিটি রাষ্ট্র যখন শুধু নিজের লাভের কথা চিন্তা করে, তখন সামগ্রিক কল্যাণ বাধাগ্রস্ত হয়। এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের ‘বৈশ্বিক নাগরিক’ হিসেবে ভাবতে হবে। বিশ্বনেতাদের উচিত তাত্ত্বিক আলোচনার চেয়ে প্রায়োগিক ক্ষেত্রে বেশি জোর দেওয়া। আঞ্চলিক জোটগুলোকে (যেমন- সার্ক, আসিয়ান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন) আরও সক্রিয় হতে হবে যাতে করে সংকটকালীন সময়ে দ্রুত সাড়া দেওয়া যায়।

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে আমাদের হাতে সময় খুব কম। বৈশ্বিক সংকটগুলো এখন আর ভবিষ্যতের হুমকি নয়, বরং বর্তমানের কঠিন বাস্তবতা। আজকের শিশুটি যে পৃথিবীতে বেড়ে উঠছে, তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আজ আমরা কতটা ঐক্যবদ্ধ হতে পারছি তার ওপর। কোনো বিভাজন, ধর্ম বা গোত্র পরিচয় যেন আমাদের অভিন্ন লক্ষ্যের পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। পৃথিবী নামক এই গ্রহটি আমাদের সবার। এর সুরক্ষা এবং স্থিতিশীলতার জন্য আজ শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না; বরং সিভিল সোসাইটি, বিজ্ঞানী, তরুণ সমাজ এবং সাধারণ মানুষ- সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল হতে হবে। একই সুতোয় গাঁথা এই পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে হাতে হাত রেখে চলার কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায়, বিচ্ছিন্নভাবে ডুবে যাওয়ার শঙ্কা থেকেই যাবে। আসুন, বিভেদ ভুলে আমরা গড়ি এক শক্তিশালী, সহনশীল এবং শান্তিপূর্ণ বিশ্ব। যেখানে প্রগতির চাকা ঘুরবে সবার সহযোগিতায়, সবার কল্যাণে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত