ঢাকা রোববার, ১৭ মে ২০২৬, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

পর্যটন খাত : কোস্টারিকা পারলে বাংলাদেশ কেনো পারছে না

মো. শাহিন আলম
পর্যটন খাত : কোস্টারিকা পারলে বাংলাদেশ কেনো পারছে না

মধ্য আমেরিকার ক্ষুদ্র দেশ কোস্টারিকার আয়তন বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ, জনসংখ্যা মাত্র ৫২ লাখ। অথচ এই দেশটিই আজ বিশ্বের কাছে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের রোল মডেল। ১৯৫০ থেকে ১৯৮০-র দশকের মধ্যে কৃষি ও পশুপালনের জন্য ব্যাপক বন উজাড়ের ফলে দেশটির বনভূমি মোট ভূখণ্ডের মাত্র ২০ থেকে ২১ শতাংশে নেমে এসেছিল। ১৯৯৬ সালে পাস হওয়া বন সংরক্ষণ আইন প্রাকৃতিক বনভূমিকে অন্য কাজে রূপান্তর নিষিদ্ধ করে এবং বিশ্বের প্রথম জাতীয়ভিত্তিক বাস্তুতন্ত্র সেবার বিনিময়ে পারিশ্রমিক কার্যক্রম হিসেবে বনভূমি রক্ষাকারী মালিকদের সরাসরি আর্থিক পুরস্কার দিতে শুরু করে। ফলাফল হয় চমকপ্রদ। আন্তর্জাতিক সাময়িকী ফ্রন্টিয়ার্স ইন এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স-এর তথ্যমতে, ১৯৮৫ সালের ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ২০১১ সালে বনভূমি ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, যা আজ দাঁড়িয়েছে ৫৪ শতাংশে। ২০২৪ সালে পর্যটন থেকে দেশটির আয় রেকর্ড ৫ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসেই প্রায় ৬ লাখ ৫৪ হাজার পর্যটক এসেছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি। মোট দেশজ উৎপাদনে পর্যটনে দেশটির অবদান আজ ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। এই সাফল্য যে শুধু প্রকৃতির দান; তা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের সোনালী ফসল।

কোস্টারিকা রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চার এবং প্রশান্তি- দুটোর জন্যই আদর্শ স্থান। এখানে জঙ্গল ভ্রমণ, বন্যপ্রাণী দেখা (যেমন স্লথ এবং স্কারলেট ম্যাকাও) এবং সমুদ্রসৈকতে সময় কাটানো জনপ্রিয়। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য কোস্টারিকার চেয়ে কম নয়, কোনো কোনো বিচারে বেশি। সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন ও ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান, যেখানে বাঘ, হরিণসহ বিভিন্ন প্রজাতির পশু, ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৩১৫ প্রজাতির পাখি, ২১০ প্রজাতির মাছ ও ৬ প্রজাতির ডলফিনের আবাস। কক্সবাজারে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম অখণ্ড সমুদ্রসৈকত। সেন্ট মার্টিন দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ। পার্বত্য চট্টগ্রাম হাজার বছরের আদিবাসী সংস্কৃতির ধারক। টাঙ্গুয়ার হাওর আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমির মর্যাদাপ্রাপ্ত। এই পাঁচটি গন্তব্য একসঙ্গে ধরলে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পর্যটন সম্পদের বৈচিত্র্য অনেক বৃহৎ রাষ্ট্রকেও ছাড়িয়ে যায়।

তবু আন্তর্জাতিক তথ্যভাণ্ডার সিইআইসি ডেটার হিসাবে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে এসেছেন মাত্র ৬ লাখ ৩০ হাজার ৬৮৫ জন বিদেশি পর্যটক, যা থাইল্যান্ড বা ভিয়েতনামের যেকোনো পর্যটন মৌসুমের এক সপ্তাহের সমতুল্যও নয়। বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন পরিষদের তথ্য বলছে, পর্যটন এখন মোট দেশজ উৎপাদনের ৪ শতাংশ এবং ২১ লাখের বেশি মানুষের জীবিকার উৎস। প্রাকৃতিক সম্পদ আর পর্যটন আয়ের এই বিশাল ফারাকের কারণ বুঝতে হলে প্রতিটি গন্তব্যের দিকে আলাদাভাবে তাকাতে হবে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সুন্দরবনের পর্যটন খাত থেকে রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৬১ লাখ টাকা। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে, যেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভ্রমণ করেছেন ৩ লাখ ২৮ হাজার জন। কিন্তু এর মধ্যে বিদেশি পর্যটক মাত্র ১ হাজার ৭৩৪ জন। ট্যুর অপারেটররা বলছেন, দেশি পর্যটক বাড়লেও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে বিদেশিদের আসা কমে গেছে।

সুন্দরবনের দীর্ঘমেয়াদী পর্যটন সম্ভাবনা নির্ভর করে মূলত বনের বাস্তুতন্ত্র টিকে থাকার ওপর এবং সেই ভিত্তি এখন জলবায়ু পরিবর্তনের চাপে নড়বড়ে। বন বিভাগের ২০২৪ সালের ক্যামেরা ফাঁদ জরিপে বাঘের সংখ্যা ১২৫, যা ২০১৫ সালের ১০৬ থেকে বেড়েছে। কিন্তু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত লবণাক্ততা বাঘের বাসযোগ্য এলাকা সংকুচিত করছে; জীবিকার চাপে পড়া মানুষ বনে ঢুকতে বাধ্য হচ্ছেন, বাড়ছে মানুষ-বাঘ সংঘাত। বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার গবেষকদের একটি যৌথ গবেষণা, সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্ট সাময়িকীতে প্রকাশিত, সতর্ক করছে: উন্নত কম্পিউটার মডেলিং বলছে ২০৭০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনে কোনো কার্যকর বাঘের বাসস্থান অবশিষ্ট নাও থাকতে পারে।

ক্লাইমেটিক চেঞ্জ সাময়িকীর আরেকটি গবেষণা দেখাচ্ছে, অতিমাত্রায় কার্বন নিঃসরণ অব্যাহত থাকলে ২১০০ সালের মধ্যে সুন্দরবনের ২৩ শতাংশ পর্যন্ত স্থায়ীভাবে জলমগ্ন হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন উন্নয়ন সংস্থা ও সোলিমার ইন্টারন্যাশনালের কারিগরি সহায়তায় ২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রণীত হয়েছে ‘সুন্দরবন পরিবেশবান্ধব পর্যটন মহাপরিকল্পনা ২০২৫-২০৪৫’। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ওয়াসিউল ইসলামের নেতৃত্বে তৈরি এই ২০ বছরমেয়াদী পরিকল্পনায় রয়েছে ৬টি কৌশলগত লক্ষ্য, ৮টি নিয়ন্ত্রণবিধি ও ৪৩টি কর্মকৌশল। মোংলা, মুন্সিগঞ্জ ও শরণখোলায় পরিবেশবান্ধব প্রবেশদ্বার, ২০০-র বেশি পথপ্রদর্শক প্রশিক্ষণ, নৌকার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা এতে স্পষ্টভাবে আছে। কিন্তু পরিকল্পনাটি এখনও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায়। এছাড়া সুন্দরবন-সংলগ্ন বাওয়ালি, মৌয়াল ও জেলে সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণও পরিকল্পনার নথিতে স্পষ্ট নয়। অথচ থাইল্যান্ডের উত্তরাঞ্চল বা ইন্দোনেশিয়ার বালিতে সমাজভিত্তিক পরিবেশবান্ধব পর্যটন সফল হয়েছে মূলত স্থানীয় সম্প্রদায়কে অংশীদার করার কারণেই।

সেন্ট মার্টিনে ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা আরও দৃশ্যমান। ১৯৯৯ সালে সরকার দ্বীপটিকে পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে। ২০১১ সালে উচ্চ আদালত অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করে ৬০ দিনের মধ্যে উচ্ছেদের নির্দেশ দেয়। তবু অবৈধ হোটেল ও রেস্তোরাঁর সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এসব হোটেল থেকে সরাসরি সমুদ্রে ছাড়া পয়ঃবর্জ্য, নির্মাণ সামগ্রী হিসেবে প্রবাল উত্তোলন এবং দৈনিক ২০০-র বেশি যন্ত্রচালিত নৌকার অবাধ চলাচলের কারণে দ্বীপের প্রায় ৭০ শতাংশ প্রবালপ্রাচীর ধ্বংস হয়ে গেছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে নয় মাসের পর্যটন নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, বছরে মাত্র তিন মাস সীমিত পর্যটনের অনুমতি রেখে।

মো. শাহিন আলম

কলামিস্ট, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত