ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

অনলাইন জুয়ার বিষাক্ত ছোবল

মো সাইদুর রহমান
অনলাইন জুয়ার বিষাক্ত ছোবল

বাংলাদেশের ডিজিটাল স্পেসে সাম্প্রতিক সময়ে অত্যন্ত চতুর ও আকর্ষণীয় ছদ্মবেশে অনলাইন জুয়ার এক নতুন জোয়ার এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে স্ক্রোল করার সময় প্রায়শই এমন কিছু স্পনসরড বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে, যা দেখতে অত্যন্ত সাধারণ ও নিরীহ ধাঁচের ক্যাজুয়াল মোবাইল গেমের মতো দেখায়। উদাহরণস্বরূপ, স্ক্রিনে একটি মুরগি রাস্তা পার হচ্ছে কিংবা কোনো ছোট চরিত্র লাফিয়ে বাধা অতিক্রম করছে। এমন দৃশ্যকে সামনে রেখে নিচে বড় করে ‘১১০০ টাকা বোনাস’ বা ‘৩০ গুণ নিশ্চিত লাভ’ এ-জাতীয় চটকদার অফার প্রদর্শন করা হয়।

এই ধরনের গেমগুলোকে প্রযুক্তিগত ভাষায় ‘ক্র্যাশ গেম’ বা ‘গ্যামিফাইড বেটিং অ্যাপস’ বলা হয়। এই ছদ্মবেশী গেমগুলো মূলত অ্যাপে ও ওয়েবসাইটে সরাসরি ‘জুয়া’ বলে নিজেকে পরিচয় দেয় না। তারা সাধারণত গেম, বিনোদন বা পুরস্কার জেতার অ্যাপ হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করে।

কখনও গুগল প্লে স্টোরের সাধারণ গেমের মতো লিংক ব্যবহার করে, আবার কখনো ফেসবুক বা টিকটকে ভুয়া বা স্পনসর করা পেজের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেয়। সাধারণ ব্যবহারকারীরা, বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও তরুণরা, এগুলোকে সাধারণ বিনোদনমূলক গেম মনে করে খেলত থাকে এবং ধীরে ধীরে বড় ধরনের আর্থিক বাজি ধরার নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে। 1xBet, মেলবেট, লাইনবেট, বাজি. লাইভ এবং হ্যাস ৮৮-এর মতো পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বেটিং ও অনলাইন ক্যাসিনো প্ল্যাটফর্মগুলো দেশে মারাত্মকভাবে শিকড় গেড়েছে। ১৯৯৭ সালে রাশিয়ায় অফলাইন কার্যক্রম শুরু করা 1xBet ২০১২ সালে অনলাইনে আসার পর থেকে ছদ্মনাম ও বিকল্প লিংকের (Alternative Mirror Links) মাধ্যমে বাংলাদেশে তাদের অবৈধ সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে। এই প্ল্যাটফর্মগুলো কেবল ক্যাসিনো স্লট গেমই অফার করছে না, বরং ক্রিকেট বা ফুটবলেরে মতো জনপ্রিয় খেলাগুলোর ওপর সরাসরি লাইভ বেটিং করার সুযোগ দিচ্ছে।

এই প্ল্যাটফর্মগুলোর সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এগুলো সম্পূর্ণ স্থানীয় মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) যেমন বিকাশ, নগদ ও রকেটের এর মতো পেমেন্ট গেটওয়েগুলোকে নিজেদের সিস্টেমে ইন্টিগ্রেট করে নিয়েছে। ফলে কোনো আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড ছাড়াই অত্যন্ত সহজে ও দ্রুততম সময়ে দেশের সাধারণ মানুষ এই নিষিদ্ধ জুয়ার সাথে সরাসরি আর্থিক লেনদেনে জড়িয়ে পড়ছে ।

মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে বিচার করলে, এই অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্মগুলো অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক উপায়ে মানব মস্তিস্কের ডোপামিন নিঃসরণকে নিয়ন্ত্রণ করে । তারা ‘ভেরিয়েবল রেশিও রিইনফোর্সমেন্ট’ (Variable Ratio Reinforcement) এবং ‘নিয়ার-মিস ইফেক্ট’ (Near-Miss Effect)-এর মতো মনস্তাত্ত্বিক কৌশল ব্যবহার করে। এর ফলে একজন ব্যবহারকারী বারবার হেরে যাওয়ার পরেও তার মনে হয় যে ‘পরের বারই সে নিশ্চিতভাবে জিতবে’ এবং এই অলীক আশ্বাসে সে তার জীবনের সমস্ত সঞ্চয় হারায়। এদিকে বাংলাদেশে জুয়াকে অত্যন্ত গর্হিত কাজ মনে করায়, আসক্ত ব্যক্তিরা তাদের আর্থিক ক্ষতির কথা পরিবার বা সমাজকে বলতে পারে না এবং তীব্র অপরাধবোধ ও সামাজিক লজ্জার কারণে চরম একাকিত্ব ও বিষণ্ণতায় ভোগে। এর ফলে পরিবার ভাঙন, ঘরোয়া সহিংসতা, তীব্র মানসিক রোগ এবং আত্মহত্যার মতো চরম ঘটনাগুলোও দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে ।

বাংলাদেশে এই জুয়া ও বেটিং সাইটগুলোর মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ থেকে ৫ কোটি টাকা অবৈধভাবে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। জুয়াড়িরা স্থানীয় মোবাইল ওয়ালেটের মাধ্যমে স্থানীয় এজেন্টদের টাকা পরিশোধ করে, আর এই এজেন্টরা বহুস্তরীয় নেটওয়ার্কের আড়ালে মূল ডোমেন বা অপরাধী চক্রের কাছে টাকা পৌঁছে দেওয়ার জন্য হুন্ডি ও ক্রিপ্টোকারেন্সির সাহায্য নেয়। ক্রিপ্টোকারেন্সির বিকেন্দ্রীভূত ও বেনামী লেনদেনের বৈশিষ্ট্যের কারণে বিটকয়েন বা ইউএসডিটি (USDT)-এর মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থের উৎস বা গতিপথ ট্র্যাক করা আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য অত্যন্ত জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই ক্রমাগত মূলধন পাচার দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও আর্থিক সার্বভৌমত্বকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে ।

অনলাইন জুয়ার এই নীরব আগ্রাসনকে একটি সমন্বিত ও বহু-প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের মাধ্যমে সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব । যার জন্য সিআইডি (CID), বিটিআরসি (BTRC), জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা (NCSA) এবং বিএফআইইউ (BFIU)-এর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী ও সক্রিয় জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে, যা সন্দেহভাজন জুয়া চক্রের আর্থিক লেনদেন ও ডোমেনগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে ট্র্যাকিং এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে । বিটিআরসি-কে কেবল আইপি ব্লকিংয়ের মতো প্রচলিত ও দুর্বল ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে উন্নত ডিপ প্যাকেট ইন্সপেকশন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে, যাতে করে ব্যবহারকারীরা ভিপিএন (VPN) ব্যবহার করেও জুয়া সাইটের মূল সার্ভারের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে না পারে।

একইসাথে, বিকাশ, নগদ বা রকেটের ডিস্ট্রিবিউশন ও রিটেইলার পয়েন্টগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি জোরদার করতে হবে। জুয়ার আর্থিক লেনদেনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করার প্রমাণ পাওয়ামাত্র সংশ্লিষ্ট এজেন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একইসাথে, বাংলাদেশ সরকারকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিটিআরসি-র মাধ্যমে কুরাসাও, মাল্টা ও সাইপ্রাসের ক্যাসিনো লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করতে হবে। যেন এই লাইসেন্সধারী কোম্পানিগুলো তাদের সিস্টেমে বাংলাদেশি আইপি এবং স্থানীয় এমএফএস পেমেন্ট মেথড নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয়।

ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে ক্যাসিনো গেমের ছদ্মবেশী স্পনসরড বিজ্ঞাপনের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা ও নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।

একই সাথে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুয়া সাইটের বিজ্ঞাপন দাতা সেলিব্রিটি বা ইনফ্লুয়েন্সারদের কঠোর সাজার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। জুয়াকে মাদকের মতোই একটি মারাত্মক মরণব্যাধি হিসেবে জাতীয় প্রচারণা কার্যক্রমের আওতাভুক্ত করতে হবে। দেশের প্রতিটি জেলায় আসক্ত তরুণদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও জুয়া আসক্তি নিরাময় কেন্দ্র স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি।

মো সাইদুর রহমান

শিক্ষার্থী, আইন ও ভূমি প্রশাসন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত