প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৩ জুন, ২০২৬
কোনো জাতি বা রাষ্ট্র হঠাৎ করে উন্নত বা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে না। একটি দেশের উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও সভ্যতার পেছনে দীর্ঘ সামাজিক ও নৈতিক প্রক্রিয়া কাজ করে। সেই প্রক্রিয়ার মূলভিত্তি হলো- ব্যক্তি, দম্পতি, সমাজ এবং রাষ্ট্র। এই চারটি স্তর বা স্তম্ভ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। একটি স্তম্ভ দুর্বল হয়ে পড়লে পুরো কাঠামোই নড়বড়ে হয়ে যায়। তাই ব্যক্তি থেকে শুরু করে রাষ্ট্র অব্দি প্রতিটি পর্যায়ের সুস্থতা ও সঠিক বিকাশ একটি দেশ ও জাতির অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য। উন্নয়নের চার স্তম্ভের প্রথমেই আসে ব্যক্তি।
সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্ষুদ্রতম, অথচ প্রধান একক হলো ব্যক্তি। একজন মানুষের চরিত্র, মূল্যবোধ, সততা, দায়িত্ববোধ ও কর্মনিষ্ঠাই একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে থাকে। যে সমাজে অধিকাংশ ব্যক্তি সৎ, পরিশ্রমী ও নৈতিকতাসম্পন্ন, সেই সমাজ স্বাভাবিকভাবেই উন্নতির পথে এগিয়ে যায়। অন্যদিকে ব্যক্তির মধ্যে যদি দুর্নীতি, অসততা, দায়িত্বহীনতা ও স্বার্থপরতা বৃদ্ধি পায়, তবে তার প্রভাব সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে ভাইরাসের মতন ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাসের পাতায় নজর দিলে আমরা দেখি, বহু শক্তিশালী সভ্যতা বাহ্যিক আক্রমণের চেয়ে অভ্যন্তরীণ নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে গেছে। ব্যক্তির পরের ধাপ হলো দম্পতি বা পরিবার। পরিবারকে সমাজের প্রথম বিদ্যালয় বলা হয়।
একজন মানুষ তার জীবনের প্রথম শিক্ষা পরিবার থেকেই গ্রহণ করে। দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ, ত্যাগ ও ভালোবাসা থাকলে একটি সুস্থ পরিবার ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। আর সুস্থ পরিবার থেকেই জন্ম নেয় সুশিক্ষিত ও আদর্শ নাগরিক। কিন্তু যখন দাম্পত্য সম্পর্কে অস্থিরতা, অবিশ্বাস ও দায়িত্বহীনতা বৃদ্ধি পায়, তখন তার নেতিবাচক প্রভাব সন্তানদের ওপর পড়ে। পরিবার ভেঙে গেলে সমাজেও বিচ্ছিন্নতা ও অস্থিরতা বাড়ে। ফলে সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রেও এর প্রভাব পড়ে। তৃতীয় স্তর হলো সমাজ।
যা ব্যক্তি ও পরিবারের যৌথ সমন্বয়ে তৈরী। সমাজ মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্র। একটি সুস্থ সমাজ নাগরিকদের নিরাপত্তা, নৈতিকতা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষা করে।
সমাজে যদি পারস্পরিক সম্মান, ন্যায়বিচার ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠিত থাকে, তবে সেখানে শান্তি ও অগ্রগতি নিশ্চিত হয়। কিন্তু সমাজ যখন বিভাজন, হিংসা, বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতার শিকার হয়, তখন উন্নয়নের পথ বাধাগ্রস্ত হয়। সামাজিক অবক্ষয় একসময় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের জন্ম দেয়। ফলে রাষ্ট্রের ভিতও ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। সর্বশেষ স্তম্ভটি রাষ্ট্র। রাষ্ট্র হলো ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার নাগরিকরা দায়িত্বশীল, পরিবারগুলো সুসংহত এবং সমাজ মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ থাকে।
আবার রাষ্ট্র যদি দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, বৈষম্য ও আইনের শাসনের অভাবে আক্রান্ত হয়, তবে ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যেও নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে। ফলে উন্নয়নের গতি থেমে যায় এবং রাষ্ট্র অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
এই চারটি স্তরকে একটি বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করা যায়। ব্যক্তি হলো বীজ, পরিবার হলো শিকড়, সমাজ হলো কাণ্ড ও শাখা-প্রশাখা এবং রাষ্ট্র হলো সেই বৃক্ষের ফল ও ছায়া। বীজ যদি নষ্ট হয়, শিকড় দুর্বল হয় বা কাণ্ড যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে ফলনও ভালো হবে না। একইভাবে ব্যক্তি, দম্পতি বা সমাজের কোনো স্তরে অবক্ষয় দেখা দিলে রাষ্ট্রের ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বেই পড়বে।
বর্তমান বিশ্বে আমরা দেখতে পাই, যে দেশগুলো মানবসম্পদ উন্নয়ন, পারিবারিক মূল্যবোধ, সামাজিক সংহতি এবং সুশাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে, তারা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে অনেক এগিয়েছে। অন্যদিকে যেখানে ব্যক্তি-নৈতিকতার অবক্ষয়, পারিবারিক ভাঙন, সামাজিক বিভক্তি ও রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা প্রকট, সেখানে অস্থিরতা ও সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। ব্যক্তি, দম্পতি, সমাজ ও রাষ্ট্র- এই চারটি স্তম্ভ একে অপরের পরিপূরক। কোনো একটিকে উপেক্ষা করে অন্যটির উন্নয়ন সম্ভব নয়। একটি জাতির টেকসই উন্নয়ন, শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে ব্যক্তির চরিত্র গঠন, পরিবারের বন্ধন সুদৃঢ় করা, সমাজে মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রে সুশাসন নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। কারণ এই চার স্তম্ভের সমন্বয়ই একটি জাতির উত্থানের ভিত্তি, আর এদের যেকোনো একটির বিচ্যুতিই হতে পারে পতনের সূক্ষ্ম অথচ মূল কারণ ।
বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল
উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ