ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬, ৭ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ইতিহাসের আয়নায় বাবা দিবস

আমানুর রহমান
ইতিহাসের আয়নায় বাবা দিবস

পিতার স্নেহ যেন এক অদৃশ্য বটবৃক্ষ, যার সুশীতল ছায়ায় সন্তানের জীবন শত ঝড়ঝাপটার মাঝেও নিরাপদ ও সুন্দরভাবে বিকশিত হয়। আধুনিক সমাজব্যবস্থায় প্রতিবছর জুন মাসের তৃতীয় রোববার বিশ্বের অধিকাংশ দেশে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য ও ভালোবাসার সঙ্গে যে ‘বাবা দিবস’ পালিত হয়, তার পেছনে রয়েছে শতবর্ষের এক আবেগঘন ইতিহাস। অনেকেই হয়ত সরলভাবে মনে করেন, এটি কেবল আধুনিক পুঁজিবাদের সৃষ্টি অথবা কার্ড ও উপহার বিক্রির একটি নিখাদ বাণিজ্যিক ফন্দি। কিন্তু ইতিহাসের গভীরতম স্তরে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, এর শেকড় নিহিত আছে এক গভীর সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং অব্যক্ত ত্যাগের স্বীকৃতির মাঝে। মাতৃত্বের মহিমা ও মায়েদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘মা দিবস’ যখন পশ্চিমা সমাজে শক্তভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল, ঠিক তখনই পিতার নীরব অবদান ও পরিবারের প্রতি তার অপরিসীম দায়িত্ববোধকে সম্মান জানানোর তাগিদ থেকে এই দিবসের জন্ম। একটি সুনির্দিষ্ট দিন কেবল উৎসব বা উদযাপনের জন্য নয়; বরং এটি পিতার সেই অবিচল পাহাড়সম নির্ভরতাকে ঐতিহাসিকভাবে স্মরণ করার একটি শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক উপায় হিসেবে বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত।

ইতিহাসের পাতা উলটে দেখলে দেখা যায়, বড় কোনো সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা অনেক সময়ই জন্ম নেয় গভীর কোনো শোক বা ট্র্যাজেডি থেকে। ১৯০৭ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার ফেয়ারমন্ট এলাকায় অবস্থিত মনোনগাহ কয়লাখনিতে এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। সেখানে ৩৬২ জন খনিশ্রমিক মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান। আমেরিকার ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ এই খনি দুর্ঘটনার ফলে এক হাজারেরও বেশি শিশু রাতারাতি পিতৃহীন হয়ে পড়ে। বিপুলসংখ্যক এই অনাথ শিশুর পিতার স্মৃতির প্রতি পরম শ্রদ্ধা জানাতে গ্রেস গোল্ডেন ক্লেটন নামের এক সহানুভূতিশীল নারী ১৯০৮ সালের ৫ জুলাই প্রথমবারের মতো স্থানীয়ভাবে একটি স্মরণসভার আয়োজন করেন। যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, একটি সমাজ যখন আকস্মিকভাবে একসঙ্গে এতগুলো পরিবারের প্রধানকে হারায়, তখন পরিবারের রক্ষক ও জোগানদাতা হিসেবে পিতার অপরিহার্যতার বিষয়টি তীব্রভাবে অনুভূত হয়। যদিও ক্লেটনের সেই মহৎ উদ্যোগটি কেবল একটি স্থানীয় গির্জার চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, তবুও তা সামগ্রিক সমাজকাঠামোয় পিতৃত্বের গুরুত্ব ও শূন্যতাকে প্রথমবারের মতো সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার বীজ বপন করেছিল।

তবে বাবা দিবসকে একটি আনুষ্ঠানিক, সুসংগঠিত ও বিস্তৃত রূপ দেওয়ার কৃতিত্ব সোনোরা স্মার্ট ডড নামের এক অসামান্য ও দূরদর্শী নারীর; যার অকৃত্রিম পিতৃভক্তি ইতিহাসকে এক নতুন পথ দেখিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের স্পোকেন শহরের বাসিন্দা সোনোরা ১৯০৯ সালে একটি গির্জায় মা দিবসের তাৎপর্য নিয়ে আয়োজিত একটি ধর্মোপদেশ শুনছিলেন। ঠিক তখনই তার মনে একটি যৌক্তিক প্রশ্ন জাগে- মায়েদের সম্মান জানাতে যদি একটি নির্দিষ্ট দিন থাকতে পারে, তবে বাবাদের অসামান্য ত্যাগের জন্য কেন অনুরূপ কোনো দিন থাকবে না? তার পিতা উইলিয়াম জ্যাকসন স্মার্ট ছিলেন মার্কিন গৃহযুদ্ধের একজন প্রবীণ সৈনিক। স্ত্রীর অকালমৃত্যুর পর তিনি অভাবনীয় সাহসিকতার সঙ্গে একাই তার ছয়টি সন্তানকে লালন-পালন করেছিলেন। সোনোরা গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন যে, পিতা কেবল পরিবারের অর্থ উপার্জনকারী কোনো যন্ত্র নন; বরং তিনিও মাতৃত্বের সমান মমতায় ও কর্তব্যে সন্তানকে আগলে রাখতে সক্ষম। তার এই অকাট্য যুক্তি এবং অক্লান্ত প্রচারণার ফলেই ১৯১০ সালের ১৯ জুন ওয়াশিংটনে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে বাবা দিবস পালিত হয়। একজন সাধারণ কন্যার এই অসাধারণ উদ্যোগ প্রমাণ করেছিল যে, পিতার অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া সমাজের কোনো অনুগ্রহ নয়; বরং এটি একটি অবশ্যপালনীয় নৈতিক কর্তব্য।

?যে কোনো নতুন সামাজিক প্রথা বা ধারণাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় সমর্থন প্রয়োজন হয়। বাবা দিবসের ক্ষেত্রে এই স্বীকৃতি আদায়ের পথটি ছিল দীর্ঘ ও চমকপ্রদ। ১৯২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ক্যালভিন কুলিজ প্রথম এই দিনটিকে জাতীয়ভাবে পালনের পক্ষে তাঁর প্রকাশ্য সমর্থন ব্যক্ত করেন। তবে সবচেয়ে যুগান্তকারী পদক্ষেপটি আসে আরও কয়েক দশক পর, ১৯৬৬ সালে। প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসন জুন মাসের তৃতীয় রবিবারকে বাবা দিবস হিসেবে নির্ধারণ করে প্রথম রাষ্ট্রীয় ঘোষণা বা ‘প্রেসিডেনশিয়াল প্রোক্লেমেশন’ জারি করেন। এরও বেশ পরে, ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন একটি কংগ্রেশনাল আইনে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে দিনটিকে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে চূড়ান্ত আইনি বৈধতা প্রদান করেন। ১৯১০ সালে শুরু হওয়া একটি ব্যক্তিগত উদ্যোগকে পূর্ণাঙ্গ আইনি স্বীকৃতি পেতে দীর্ঘ ৬২ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। এই দীর্ঘসূত্রতা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণ করে যে, মাতৃত্বের সর্বজনীন আবেগের তুলনায় পিতৃত্বের নীরব অবদানকে উপলব্ধি করতে সমাজের নীতিনির্ধারকদের কিছুটা বেশি সময় লেগেছে। তবুও, দীর্ঘ এই ঐতিহাসিক পথপরিক্রমার মধ্য দিয়ে বাবা দিবস শেষ পর্যন্ত আবেগ ও আইনি কাঠামোর এক অনন্য মেলবন্ধন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে।

বর্তমানের দ্রুত পরিবর্তনশীল ও যান্ত্রিক বিশ্বে বাবা দিবসকে ফিরে দেখা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আধুনিক সমাজবিজ্ঞান ও মনস্তাত্ত্বিক গবেষণার নির্ভরযোগ্য উপাত্ত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, যেসব পরিবারে সন্তানের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে পিতার সক্রিয়, যত্নশীল ও ইতিবাচক অংশগ্রহণ থাকে; সেসব পরিবারের শিশুদের মানসিক বিকাশ, সামাজিক দক্ষতা এবং আত্মবিশ্বাস বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। এই বাস্তব উপাত্তগুলো বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে, উইলিয়াম জ্যাকসন স্মার্টের মতো পিতারা শতাব্দীপ্রাচীন যে আদর্শ ও দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তা আজও একটি সুস্থ সমাজের সবচেয়ে মজবুত ভিত্তি। বাবা দিবস তাই বছরে কেবল একটি নির্দিষ্ট দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি পোস্ট করা বা উপহার দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়; বরং এটি পিতার ঘামে ভেজা সংগ্রামী জীবনের প্রতি বিনম্র কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক ঐতিহাসিক দলিল। ইতিহাসের এই স্বচ্ছ আয়না আমাদের নিরন্তর শেখায় যে, পিতার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও কঠোর পরিশ্রম মানবসভ্যতার এক নীরব চালিকাশক্তি; যাকে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করা আমাদের মানবিক অস্তিত্বেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আমানুর রহমান

শিক্ষার্থী, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত