ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬, ৭ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

শিক্ষার জোয়ার বনাম দক্ষতার খরা

ইব্রাহীম ইবনে আজিজ
শিক্ষার জোয়ার বনাম দক্ষতার খরা

বাংলাদেশ আজ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। অর্থনীতিবিদ ও জনসংখ্যাবিদদের ভাষায় এটি ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক লভ্যাংশের সময়। অর্থাৎ দেশের মোট জনসংখ্যার একটা বড়ো অংশ এখন কর্মক্ষম বয়সে রয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশই তরুণ; যাদের বয়স ১৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী সঠিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলে দেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনার পাশাপাশি একটি বড় শঙ্কাও ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আমরা কি এই জনমিতিক লভ্যাংশকে জাতীয় সম্পদে রূপান্তর করতে পারব, নাকি তা দক্ষতার অভাবে একসময় জাতীয় বোঝায় পরিণত হবে?

বাংলাদেশে গত দুই দশকে শিক্ষার প্রসার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্কুলে ভর্তি বৃদ্ধি পেয়েছে, উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে। প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছেন। কাগজে-কলমে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর হার বাড়ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই শিক্ষা কি তাদের কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করছে? বাস্তবতা বলছে, উত্তরটি আশাব্যঞ্জক নয়। একদিকে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের দীর্ঘ বেকারত্ব, অন্যদিকে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দক্ষ কর্মী সংকট এই বৈপরীত্য বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি। অনেক প্রতিষ্ঠান অভিযোগ করে যে তারা প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী খুঁজে পায় না। আবার অসংখ্য তরুণ চাকরির জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করেন। ফলে সৃষ্টি হয়েছে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। চাকরি আছে, কিন্তু উপযুক্ত কর্মী নেই; কর্মী আছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় দক্ষতা নেই। এই সংকটের মূল কারণগুলোর একটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা। আমাদের শিক্ষা এখনও অনেকাংশে পরীক্ষাকেন্দ্রিক এবং মুখস্থবিদ্যানির্ভর। শিক্ষার্থীদের শেখানো হয় কীভাবে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে হয়; কিন্তু শেখানো হয় না কীভাবে বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে হয়, কীভাবে দলগতভাবে কাজ করতে হয়, কীভাবে যোগাযোগ দক্ষতা উন্নত করতে হয় কিংবা কীভাবে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে হয়। অথচ একবিংশ শতাব্দীর কর্মক্ষেত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করেছে। বর্তমান বিশ্বে চাকরিদাতারা শুধু সনদ নয়; দক্ষতা খোঁজেন। তারা খোঁজেন বিশ্লেষণী চিন্তাশক্তি, নেতৃত্বের গুণাবলি, সৃজনশীলতা, ডিজিটাল সক্ষমতা, ভাষাগত দক্ষতা, অভিযোজন ক্ষমতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের যোগ্যতা। একজন তরুণের হাতে ডিগ্রি থাকলেও যদি এসব দক্ষতা না থাকে, তবে তিনি শ্রমবাজারে পিছিয়ে পড়বেন।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (World Economic Forum) বিভিন্ন প্রতিবেদনে বারবার বলা হয়েছে যে ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতার মধ্যে থাকবে সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, সৃজনশীলতা এবং শেখার সক্ষমতা। কিন্তু আমাদের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের প্রস্তুত করতে পারেনি। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence), অটোমেশন, রোবোটিক্স, ডেটা অ্যানালিটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবাখাত দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। অনেক প্রচলিত পেশা বিলুপ্ত হচ্ছে, আবার নতুন নতুন পেশার জন্ম হচ্ছে। ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রয়োজন হবে এমন কর্মী, যারা শুধু নির্দিষ্ট জ্ঞান নয়; বরং আজীবন শেখার মানসিকতা নিয়ে নিজেকে নিয়মিত হালনাগাদ করতে সক্ষম। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনও সেই বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাওয়াতে পারেনি। বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে বছরের পর বছর একই পাঠ্যক্রম চলছে। শিল্পখাতের চাহিদা বদলালেও পাঠ্যসূচিতে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্জিত জ্ঞান ও বাস্তব কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয়তার মধ্যে এক গভীর ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

এই সমস্যার আরেকটি বড় কারণ হলো শিল্পখাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্বল সংযোগ। উন্নত দেশগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বিদ্যমান। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম তৈরির সময় শিল্পখাতের প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি ইন্টার্নশিপ করে, বাস্তব প্রকল্পে অংশ নেয় এবং চাকরির পরিবেশ সম্পর্কে আগেই ধারণা লাভ করে।

ইব্রাহীম ইবনে আজিজ

শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত