প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৪ জুন, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং বিনিয়োগের স্থবিরতা; অন্যদিকে তরুণ জনশক্তি, ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজার এবং শিল্পায়নের সম্ভাবনা। সব মিলিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তার মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা। এই বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েই এবারের জাতীয় বাজেটে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য সরকার যে কৌশল সামনে এনেছে, তা হলো ‘থ্রি আর’ (৩জ) কৌশল।
এর তিনটি স্তম্ভ হচ্ছে- রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন (Recovery and Stabilization), রিস্টোরেশন (Restoration) এবং রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাক্সিলারেশন (Reconstruction for Acceleration)। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, প্রথমে অর্থনীতিকে সংকট থেকে উদ্ধার করা, তারপর ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোকে পুনরুদ্ধার করা এবং শেষ পর্যন্ত অর্থনীতিকে আরও আধুনিক, শক্তিশালী ও গতিশীল করে তোলাই এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য। এটিকে শুধু একটি বাজেট-সংক্রান্ত ধারণা নয়; বরং ভঙ্গুর অর্থনীতিকে ধাপে ধাপে পুনর্গঠনের একটি সমন্বিত রোডম্যাপ বলা যায়। আবার অনেক সময় একে অর্থনীতির চিকিৎসাপত্র বলা হয়। কেননা, ডাক্তার যেমন একজন গুরুতর অসুস্থ রোগীকে সুস্থ করতে ধাপে ধাপে চিকিৎসা দেন- প্রথমে তার প্রাণ বাঁচান, তারপর তাকে সুস্থ করেন এবং সবশেষে ভবিষ্যতে যেন আবার অসুস্থ না হয় তার ব্যবস্থা করেন- ঠিক তেমনি এই কৌশলটিও ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করে।
এই কৌশলের প্রথম ধাপ হলো রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন। বর্তমানে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। বাজারে চাল, ডাল, তেল কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়ে গেলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, ব্যবসায়ীদের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তাই এই পর্যায়ে সরকারের প্রধান কাজ হচ্ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে স্থিতিশীল রাখা, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং রাজস্ব আদায় বাড়ানো। বাস্তবে এটি অনেকটা আগুন নেভানোর মতো কাজ করে। ধরুন, কোনো কারণে ভোজ্যতেল বা চালের দাম হঠাৎ বেড়ে গেল। তখন সরকার আমদানি শুল্ক কমাতে পারে, বাজার তদারকি বাড়াতে পারে অথবা টিসিবির মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে পণ্য বিক্রি করতে পারে। একইসঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমানো এবং মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মতো পদক্ষেপও নিয়ে থাকেন। এসব উদ্যোগের ফলে বাজারে জনগণের আস্থা ফিরে আসে এবং অর্থনীতির ওপর থেকে তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কমে যায়। অর্থনীতিতে স্থায়িত্ব ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থাটি প্রতিরক্ষামূলক দেয়াল হিসেবে কাজ করে।
দ্বিতীয় ধাপ হলো রিস্টোরেশন বা পুনরুদ্ধার। অর্থনীতি যখন কিছুটা স্থিতিশীল হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোকে আবার সচল করার প্রয়োজন। সম্প্রতি ভৌগোলিক, রাজনৈতিক এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষি খাত এবং বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। রিস্টোরেশনের লক্ষ্য হচ্ছে এসব খাতকে আবার উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ধারায় ফিরিয়ে আনা। এজন্য সরকার কম সুদে ঋণ, কর রেয়াত, প্রণোদনা এবং ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণের মাধ্যমে এই কাজগুলো করে থাকে। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি বুজতে সহজ হবে, করোনাকালীন সময়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখার জন্য সরকার যে প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়েছিল অনেকটক সেরকম। তখন সেই সহায়তার ফলে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল এবং বহু শ্রমিক চাকরি ধরে রাখতে পেরেছিলেন। অর্থাৎ এই ধাপে অর্থনীতির থমকে যাওয়া চাকা আবার ঘুরতে শুরু করে। কৃষক উৎপাদন বাড়ায়, উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করেন, শ্রমিক কাজ পান এবং বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরে আসে।
তৃতীয় ধাপ রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাক্সিলারেশন, যা এই কৌশলের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে লক্ষ্য শুধু অর্থনীতিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা নয়; বরং ভবিষ্যতের জন্য আরও শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করা। আমাদের চোখের সামনে বিশ্ব অর্থনীতি ব্যবস্থার দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, সবুজ জ্বালানি এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আমাদেরকেও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। এই পর্যায়ে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়ন, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, স্মার্ট অবকাঠামো নির্মাণ এবং রপ্তানি খাতের বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। মনে করেন, সরকার একটা নতুন হাইওয়ে, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করল অথবা আইটি পার্ক বা স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করল। তখন দেখা যাবে পণ্যের পরিবহন ব্যয় কমেছে, উৎপাদনশীলতা আগের চেয়ে বেড়েছে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। আপনি দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা ভিয়েতনামের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা দেখলে বুঝতে পারবেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে অর্থনীতিকে নতুনভাবে পুনর্গঠন করলে প্রবৃদ্ধির গতি বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এই থ্রি আর কৌশলের সম্ভাবনা যথেষ্ট উজ্জ্বল। দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তরুণ জনগোষ্ঠী এবং বিস্তৃত অভ্যন্তরীণ বাজার। আমার মতে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এই কৌশল বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে পারবে এবং উৎপাদন খাতকে আরও শক্তিশালী করতে পারবে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, ফার্মাসিউটিক্যালস, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, জাহাজ নির্মাণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। একইসঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, রাজস্ব আদায়ের সীমাবদ্ধতা, প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং দুর্নীতি এই কৌশলের সফলতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সরকার যদি অতিরিক্ত ঋণ নিয়ে বাজেট ঘাটতি পূরণ করে, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি কঠিন হয়ে যেতে পারে। আবার বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা কিংবা ভূরাজনৈতিক সংঘাতও অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সবশেষে বলব, থ্রি আর কৌশল বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বর্তমান সংকট থেকে বের করে এনে একটি টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নেওয়ার একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা। তবে এই কৌশলের প্রকৃত সফলতানির্ভর করবে সুশাসন, নীতির ধারাবাহিকতা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। কেননা পরিকল্পনা যতই ভালো হোক, বাস্তবায়ন দুর্বল হলে তার সুফল জনগণের কাছে কখনোই পৌঁছাবে না। তাই এখন সময় কাগজে-কলমের পরিকল্পনার চেয়ে বাস্তব পদক্ষেপে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার।
কারণ সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাজেটের এই ‘থ্রি আর’ কৌশলই হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান ভিত্তি।