প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৪ জুন, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনায় একটি প্রশ্ন বারবার উঠে আসে- এত বিপুল অর্থপাচারের পরও দেশ কীভাবে টিকে আছে? সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
কিন্তু একই সময়ে দেখা যাচ্ছে, অর্থনীতি এখনও সচল, রপ্তানি চলছে, রেমিট্যান্স আসছে, বাজারে লেনদেন হচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে। এই আপাত বৈপরীত্যের কারণ অনুসন্ধান করাই এই আলোচনার উদ্দেশ্য। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশ থেকে বাণিজ্যভিত্তিক অবৈধ অর্থপ্রবাহের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে তাদের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০১৩ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে বাণিজ্যভিত্তিক অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৮.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থাৎ বছরে গড়ে প্রায় ৬.৮ বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে চলে গেছে। প্রতিবেদনে বিশেষভাবে বাণিজ্যিক পণ্যের মূল্য কম বা বেশি দেখিয়ে অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি শ্বেতপত্রে দাবি করা হয় যে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশের বাইরে পাচার হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে দুর্নীতি ও সুশাসনবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে যে দুর্নীতি ও অর্থপাচার উন্নয়নের অন্যতম বড় অন্তরায়। বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, দেশের বাইরে চলে যাওয়া অর্থের পরিমাণ মোটেই ছোট নয়।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এত বড় আর্থিক ক্ষতির পরও বাংলাদেশের অর্থনীতি কেন ভেঙে পড়ছে না? এর উত্তর খুঁজতে হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভেতরের শক্তিগুলোকে দেখতে হবে। প্রথমত, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন প্রায় ৪৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি আকারের। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন অনেক বড় এবং বহুমুখী। প্রায় ১৮ কোটির মানুষের এই দেশে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়।
কৃষি, শিল্প, সেবা, নির্মাণ, পরিবহন, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কার্যক্রম অর্থনীতির ভিত্তিকে বিস্তৃত করেছে। ফলে কোনো একটি খাতে সংকট তৈরি হলেও পুরো অর্থনীতি একযোগে স্থবির হয়ে পড়ে না। দ্বিতীয়ত, প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে কর্মরত লাখো বাংলাদেশি তাঁদের শ্রম ও মেধার বিনিময়ে অর্জিত অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন।
এই অর্থ শুধু পরিবারগুলোর জীবনমান উন্নত করছে না, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণ, আমদানি ব্যয় মেটানো এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অর্থনীতিবিদদের অনেকেই রেমিট্যান্সকে বাংলাদেশের অর্থনীতির ‘নীরব রক্ষাকবচ’ হিসেবে অভিহিত করেন।
তৃতীয়ত, তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে এই খাত থেকে। সাম্প্রতিক অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি থেকে প্রায় ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হয়েছে। বিশ্বের শতাধিক দেশে বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানি হচ্ছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের প্রধান বাজার হিসেবে রয়েছে। লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি এই শিল্প বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে।
চতুর্থত, কৃষি খাত এখনও বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। দেশের খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে অগ্রগতি, গ্রামীণ অর্থনীতির বিস্তার এবং কৃষকের উৎপাদনশীলতা জাতীয় অর্থনীতিকে একটি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ ভিত্তি প্রদান করেছে। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত কোটি মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করছে। পঞ্চমত, বাংলাদেশের জনগণের অর্থনৈতিক সহনশীলতা ও অভিযোজন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বৈশ্বিক মহামারি, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মন্দা কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও দেশের মানুষ উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্য অব্যাহত রেখেছে। এই সামাজিক স্থিতিস্থাপকতাও অর্থনীতিকে টিকিয়ে
রাখার একটি বড় কারণ।
তবে এই বাস্তবতা কখনোই অর্থপাচারের ক্ষতিকর প্রভাবকে খাটো করে দেখার সুযোগ দেয় না। অর্থপাচারের ফলে দেশীয় বিনিয়োগ কমে যায়, ব্যাংকিং খাতে আস্থাহীনতা তৈরি হয়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ে এবং সরকারের রাজস্ব আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, যে অর্থ দেশের শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গবেষণা ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ হওয়ার কথা, সেই অর্থ বিদেশে চলে যাওয়ার ফলে উন্নয়নের গতি মন্থর হয়ে পড়ে।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, অর্থপাচার অনেকটা শরীর থেকে ধীরে ধীরে রক্তক্ষরণের মতো। একজন মানুষ কিছু রক্ত হারিয়েও দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে পারেন, কিন্তু রক্তক্ষরণ যদি অব্যাহত থাকে, একসময় তা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
রেমিট্যান্স, পোশাকশিল্প, কৃষি ও অভ্যন্তরীণ বাজার অর্থনীতিকে এখনও সচল রেখেছে; কিন্তু অর্থপাচারের ধারাবাহিকতা দীর্ঘমেয়াদে এই শক্তিগুলোকেও দুর্বল করে দিতে পারে। সুতরাং বলা যায়, বাংলাদেশ টিকে
আছে মূলত প্রবাসীদের ঘামে অর্জিত রেমিট্যান্স, শ্রমনির্ভর পোশাকশিল্পের সাফল্য, কৃষকের উৎপাদনশীলতা, উদ্যোক্তাদের কর্মপ্রচেষ্টা এবং বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারের কারণে। কিন্তু টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত
করতে হলে অর্থপাচার রোধ, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিকল্প নেই। কারণ একটি জাতির প্রকৃত শক্তি
শুধু সম্পদ অর্জনে নয়, সেই সম্পদকে দেশের উন্নয়নের কাজে সঠিকভাবে ব্যবহার করার মধ্যেই নিহিত।