প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১০ জুলাই, ২০২৬
ডিজিটাল বিপ্লবের এই যুগে শহরের রাস্তায় এখন নতুন এক ধরনের কর্মব্যস্ততা চোখে পড়ে। খাবার ডেলিভারি, রাইড শেয়ারিং কিংবা অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং- এসব খাতে নিয়োজিত মানুষগুলোই আজ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অদৃশ্য চালিকাশক্তি।
কিন্তু নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা তিক্ত সত্যটি হলো, এসব কর্মীর প্রকৃত পরিচয় নিয়ে একধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ধোঁয়াশা রয়েই গেছে। তারা কি আসলেই কোনো প্রতিষ্ঠানের ‘পার্টনার’ (অংশীদার), নাকি নিছকই শোষিত ‘শ্রমিক’ পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের গিগ অর্থনীতি (Gig economy) থেকে আয় হয়েছে প্রায় ১.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ২ শতাংশ। অথচ এত বিশাল একটি অর্থনৈতিক চাকাকে সচল রাখা মানুষগুলোর নিজেদের জীবনই চরম অনিশ্চয়তায় মোড়ানো। সামাজিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই বৈষম্যের বিষয়টিই আজ আমাদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে।
গিগ অর্থনীতির মূল কৌশলগত ফাঁদই হলো ‘পার্টনারশিপ’ বা অংশীদারত্বের এই মিথ্যা অঙ্গীকার। মূলত শ্রম আইনের বাধ্যবাধকতা এড়াতেই প্ল্যাটফর্ম কোম্পানিগুলো তাদের কর্মীদের ‘স্বাধীন ঠিকাদার’ বা ‘পার্টনার’ হিসেবে অভিহিত করে।
এর ফলে কর্মীদের কোনো ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যবিমা বা প্রভিডেন্ট ফান্ড দেওয়ার দায় কোম্পানিগুলোর থাকে না। এতে তৈরি হয় ‘কাজ নেই তো মজুরি নেই’- এমন এক চরম অনিশ্চিত বাস্তবতা। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, বাংলাদেশের ৮৫ শতাংশ কর্মীই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন।
অন্যদিকে, গিগ প্ল্যাটফর্মগুলো ডেলিভারি বা রাইড শেয়ারিং চালকদের আয় থেকে ৩৫-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন কেটে নেয়। ‘ফেয়ারওয়ার্ক বাংলাদেশ রেটিংস ২০২১’ অনুযায়ী, শ্রমমানের দিক থেকে দেশের শীর্ষস্থানীয় প্ল্যাটফর্মগুলো ১০-এর মধ্যে পেয়েছে মাত্র ১। এসব তথ্যই প্রমাণ করে, নামে ‘পার্টনার’ হলেও বাস্তবে এরা কোনো মালিকানার অংশীদার নন; বরং অ্যালগরিদমের কঠোর শাসনে পিষ্ট একদল অসহায় শ্রমিক মাত্র।
শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকির কথা বিবেচনা করলেও এসব ‘পার্টনার’-এর জীবন অত্যন্ত করুণ। রোদ, বৃষ্টি, যানজট কিংবা ঝড়- কোনো প্রতিকূলতার তোয়াক্কা না করেই তাঁদের ছুটে চলতে হয়। কিন্তু কাজের ফাঁকে কোনো দুর্ঘটনায় আহত হলে প্ল্যাটফর্ম কোম্পানিগুলোর দায়বদ্ধতা কর্পূরের মতো উড়ে যায়। বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি মোট জিডিপিতে প্রায় ৪৩ শতাংশ অবদান রাখে, যার একটি বড় অংশ আসে গিগ কর্মীদের ঘামঝরানো শ্রম থেকে। দেশে প্রায় ৩২ লাখ মানুষ গিগ অর্থনীতিতে যুক্ত থাকলেও তাঁদের কেউই কর্মস্থলে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ বা চিকিৎসা ভাতা পান না। দিনের পর দিন ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা অমানবিক পরিশ্রমের বিনিময়ে তাঁরা যে সামান্য আয় করেন, তা দিয়ে কোনোরকমে পরিবার চালানো আর ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই তাদের দিন কাটে।
?বিশাল এই কর্মীবাহিনীর সুরক্ষায় বর্তমান শ্রম আইন যে সম্পূর্ণ ব্যর্থ, তা আর অস্বীকার করার উপায় নেই। দেশে প্রায় ১০ লাখের বেশি মানুষ ডেলিভারি ও রাইড শেয়ারিংয়ের মতো অবস্থানভিত্তিক (লোকেশন-বেসড) গিগ কাজের সঙ্গে যুক্ত। তাদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। সরকার ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের এমন একটি আইন প্রণয়ন করতে হবে, যা গিগ কর্মীদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করবে এবং প্ল্যাটফর্মগুলোকে একটি ‘কর্মী-সুরক্ষা তহবিল’-এ অবদান রাখতে বাধ্য করবে। গিগ কর্মী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য চুক্তি ও দুর্ঘটনা বিমার দাবি জানিয়ে এলেও করপোরেট স্বার্থের কাছে তা বারবার উপেক্ষিত হচ্ছে। রাষ্ট্রের উচিত এই অদৃশ্য শ্রমিকদের দৃশ্যমান করে তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা।
?স্মার্টফোনের পর্দায় একটি ক্লিকের মাধ্যমে আমরা যে আরামণ্ডআয়েশ উপভোগ করি, তার পেছনে যে চরম মানবিক মূল্য চোকাতে হচ্ছে, তা আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। প্রকৃত অর্থে ‘পার্টনারশিপ’ মানে পারস্পরিক সম্মান ও ঝুঁকি ভাগাভাগি করে নেওয়া, একতরফা শোষণ নয়। গিগ অর্থনীতির এই চকচকে ইমারতকে টিকে থাকতে হলে, তাকে অবশ্যই ন্যায্যতার ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে হবে। যতদিন না আইনি কাঠামোর সংস্কার হচ্ছে এবং প্ল্যাটফর্ম কোম্পানিগুলো এই ‘গিগ-বীর’দের প্রাপ্য সম্মান ও শ্রমিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করছে, ততদিন এই অর্থনীতির সাফল্যগাথা কেবলই মরীচিকা হয়ে থাকবে।
আমানুর রহমান
শিক্ষার্থী, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ