প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৫ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে মানুষের বিনোদন ও সময় কাটানোর ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে। একসময় মানুষ নিরবতায় চিন্তা করত, বইয়ের পাতায় ডুবে থাকত, দীর্ঘ আলোচনায় নিজেকে খুঁজে পেত। কিন্তু এখন সেই জায়গা দখল করেছে কয়েক সেকেন্ডের শর্ট ভিডিও ভিত্তিক বিনোদন। যেগুলো ‘রিলস’ নামে পরিচিত। রিলস বলতে মূলত Facebook Reels, TikTok, Instagram Reels ও YouTube Shorts-এর মতো ছোট ভিডিওভিত্তিক কনটেন্টকে বোঝায়। বর্তমানে ‘রিলস’ বিশ্বের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। হবেই না বা কেন? মানুষ এখন এতো পরিমাণে রিলস দেখছে যে, তা যেন এক ধরনের সংস্কৃতিতে রূপ নিয়েছে। এসব ছোট ছোট ভিডিও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষের আবেগ ও মনোযোগকে প্রভাবিত করে ফেলে । ফলে মানুষ একটির পর একটি ভিডিও স্ক্রল করতেই থাকে। অনেকেই বাস্তব জীবনের চাপ, একাকীত্ব, হতাশা কিংবা বোরডম থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে রিলসে আসক্ত হয়ে পড়ে। এতে যদিও সাময়িক বিনোদন পাওয়া যায় ; তবে ধৈর্যশক্তি কমে যাওয়া, গভীরভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়া, কঠিন বা দীর্ঘমেয়াদি কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে না পারার মতো অনেক নেতিবাচক প্রভাবও দীর্ঘমেয়াদি হয়ে থাকে। এছাড়াও অনেক সময় সম্পর্কেও দ্রুত বিরক্তি তৈরি হয়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এই রিলস সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় নেতিবাচক প্রভাবের সম্মুখীন হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। অতিরিক্ত রিলস দেখার কারণে পড়াশোনায় তাদের মনোযোগ কমে যাচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী বাস্তব পড়াশোনার চেয়ে তথাকথিত “স্টাডি রিলস” দেখেই বেশি সময় ব্যয় করছে। ফলে তারা সাময়িক অনুপ্রেরণা লাভ করলেও বাস্তব কাজের অগ্রগতি খুবই কম। রিলস আসক্তির প্রভাব শুধুমাত্র মনোযোগেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অতিরিক্ত শর্ট ভিডিও দেখার ফলে উদ্বেগ, মানসিক চাপ ও অবসাদ বাড়তে পারে।
এছাড়াও রাতে ঘুমানোর আগে রিলস দেখলে ঘুমের মান মারাত্মকভবে কমে যায়, যা হাইপারটেনশন বা উচ্চরক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়। দীর্ঘসময় ধরে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে চোখের ক্ষতি, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে স্থ’ূলতা এবং হৃদরোগের ঝুঁকিসহ নানা অসুখ শরীরে বাসা বাঁধে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত শর্ট ভিডিও কনটেন্টে বেশি সময় ব্যয় করেন, তারা দীর্ঘ লেখা পড়া, লেকচার শোনা কিংবা একটি কাজে দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি সমস্যার মুখোমুখি হন। গবেষকেরা সতর্ক করছেন যে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম ভবিষ্যতে চোখের সমস্যাসহ নানা মানসিক জটিলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। প্রায় ১০০,০০০ মানুষের ওপর পরিচালিত ৭১ টি গবেষণায় দেখা গেছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় দীর্ঘ সময় কাটালে মনোযোগের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে। কিছু গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত শর্ট ভিডিও দেখা মস্তিষ্কের জন্য অ্যালকোহল বা ধূমপানের চেয়েও ৫ গুণ বেশি ক্ষতিকর হতে পারে। ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের ৫০% এর বেশি মানুষের মায়োপিয়া (কাছের জিনিস ঝাপসা দেখা) হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
যার একটি বড় কারণ অতিরিক্ত ডিজিটাল স্ক্রিন টাইম। এই আসক্তি থেকে বাঁচতে এবং মনোযোগ বৃদ্ধি করতে আমাদেরকে কিছু অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। একদিনে কোনোভাবেই আসক্তি কমানো সম্ভব নয়। তাই ধীরে ধীরে রিলস দেখার সময় কমিয়ে আনতে হবে। প্রথমে নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে রিলস দেখার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। পড়াশোনা বা কাজের সময় ফোন হাতের নাগালের বাইরে রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা কার্যকর হতে পারে। রিলস দেখলে মস্তিষ্কে অতিরিক্ত ডোপামিন নিঃসৃত হয়, যার ফলে আসক্তি বাড়ে। এর পরিবর্তে বই পড়া, ব্যায়াম বা সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে ডোপামিন পাওয়ার অভ্যাস করতে হবে। আসক্তি অতিরিক্ত হয়ে গেলে কিছুদিনের জন্য সংশ্লিষ্ট অ্যাপ ফোন থেকে আনইনস্টল করাও কার্যকর সমাধান হতে পারে। সবশেষে বলা যায়, রিলস সংস্কৃতি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের এক অনিবার্য বাস্তবতা। এটি যেমন বিনোদন ও যোগাযোগকে সহজ করেছে, তেমনি ধীরে ধীরে মানুষের মনোযোগ, ধৈর্য ও গভীর চিন্তার ক্ষমতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি আত্মনিয়ন্ত্রণ, সচেতনতা এবং সময়ের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে নেতিবাচক দিকগুলো মোকাবিলা করে প্রযুক্তি ও বাস্তব জীবনের মধ্যে একটি সুস্থ ভারসাম্য গড়ে তুলতে হবে।
আফিয়া সুলতানা আঁখি
শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ