প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৬ জুলাই, ২০২৬
সমসাময়িক বৈশ্বিক রাজনীতি গ্রিন পলিটিক্স বা সবুজ রাজনীতি একটি টেকসই আইডোলজি হিসেবে সমাদৃত হচ্ছে।
বাংলাদেশে এটির জনগুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে ভীষণ। মূলধারার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে গ্রিন পলিটিক্সের ভিত্তিগুলোর একটা মেলবন্ধন হলে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি কাটিয়ে উঠাসহ পরিবেশ-প্রতিবেশ সংক্রান্ত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন ও সমন্বয় সাধন বেশ কার্যকর একটা গতি পেতে পারে।
প্রসঙ্গত গ্রিন পলিটিক্স কী? সেটি এখানে একটু উল্লেখ করা যেতে পারে। গ্রিন পলিটিক্স মূলত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও রাজনীতি নির্মাণে এবং টেকসই সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রমে পরিবেশবাদ, সামাজিক ন্যায়বিচার, গণতান্ত্রিক ভিন্নমতের সুরক্ষা এবং অহিংস নীতির উপর ভিত্তি করে পরিশীলিত রাজনৈতিক পরিসর গঠনের কার্যক্রম। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মসূচির ধরণ খেয়াল করলে মূল ধারার রাজনীতির সঙ্গে গ্রিন পলিটিক্সের সমন্বয়ের চেষ্টা ও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি আমাদের নাগরিকদের জন্য যথেষ্ট উদ্দীপকমূলক কল্যাণকর এক্টিভিটিস এবং প্রশংসাযোগ্য নিঃসন্দেহে।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তার দল যখন রাষ্ট্র পরিচালনার ৩১ দফা এবং ইশতেহার ঘোষণা করেছেন সেখানে গ্রিন পলিটিক্সের বিষয়গুলো প্রতিফলিত হয়েছে লক্ষ্য করা যায়।
যেমন- নির্বাচনি ইশতেহারে বিএনপি বলেছে, গ্রামীণ পর্যায়ে জনগণকে সম্পৃক্ত করে আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণ করতে চায় বিএনপি। কার্বন ট্রেডিং মার্কেটের এক বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সবুজ অর্থনীতির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চায় দলটি। এসব গাছ রোপণের পর সংরক্ষণের অংশ হিসেবে ট্রি মনিটরিং অ্যাপ চালুর কথা আছে প্রথম ভাগে। এ ছাড়া দ্বীপ ও চরাঞ্চলে বিশেষায়িত ড্রোন ব্যবহার করে বৃক্ষরোপণে কর্মসূচি নেওয়া, শহরগুলোতে পার্ক, ফুটপাত ও খেলার মাঠের পাশে বৃক্ষরোপণের কথা বলছে দলটি। এ ছাড়া শহরের ভবনে ছাদবাগানকে উৎসাহ দিতে কর-প্রণোদনা দেওয়া, ভবন নির্মাণ বিধিমালায় ‘সবুজ পরিমাপক মানদণ্ড’কে যুক্ত করে ভবনগুলোকে গ্রিন সার্টিফিকেশনের আওতায় আনতে চায় বিএনপি। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাণী সম্পদ ও পরিবেশ সংরক্ষণ, বাস্তুসংস্থান রক্ষাসহ পরিবেশ সংক্রান্ত বিস্তর আলাপ আছে।
এবং রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফার দফা ২৯ এ বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর ও টেকসই কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। পরিবেশ দূষণ রোধে কঠোর ব্যবস্থা এবং প্রতিরোধের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
এসব যে শুধুই আলাপ নয় বরং এ সংক্রান্ত কার্যক্রম স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী অংশগ্রহণ করছেন। যা আশাব্যঞ্জক এবং গ্রিন পলিটিক্সের ভিত্তিগুলোর অন্যতম ইস্যুর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
গ্রিন পলিটিক্সের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো, তৃণমূল গণতন্ত্র। স্থানীয় ও তৃণমূল পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। এ সংক্রান্ত দফা ২১ বলা হয়েছে, রাষ্ট্রক্ষমতার ব্যাপক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও স্বাধীন ও শক্তিশালী করা হবে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা ও জেলা পরিষদগুলোর আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা বাড়িয়ে তাদেরকে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ সেবা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে কার্যকর ভূমিকা পালনে সমর্থ করা হবে। ফ্যামিলি কার্ড প্রদান তৃণমূল নারী জনগোষ্ঠীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখবে। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক জনসভায় নিজেকে ‘ফ্যামিলি ম্যান’ হিসেবে উপস্থাপন করাটা তৃণমূল গণতন্ত্র চর্চার সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপ বিবেচনাযোগ্য।
সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা কল্যাণকর রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য বিকল্পহীন একটি ফ্যাক্টর। ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা ছাড়া কোনোভাবেই জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র ও রাজনীতি বিনির্মাণ সম্ভব নয়। সামাজিক ন্যায়বিচার কনসেপ্টের নানামুখি বিশ্লেষণ আছে, গ্রিন পলিটিক্সে এটি পরিবেশগত স্বাস্থ্যের সঙ্গে সমতার সংযোগ স্থাপন, সম্পদের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা করাকে গুরুত্ব আরোপ করে। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বক্তব্য এবং কর্মসূচির বেশ বড় একটি অংশ এই কেন্দ্রিক। বিএনপি নির্বাচনি ইশতেহারে ন্যায়ভিত্তিক মানবিক রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তার একাধিক বক্তব্যে বলেছেন, ‘বিএনপি বাংলাদেশকে একটি উদার গণতান্ত্রিক মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায়।’
জাতি গঠনের রাজনীতির অন্যতম শর্ত জাতীয় ঐক্য। আর জাতীয় ঐক্যের শর্ত অহিংস রাজনৈতিক গণপরিসর নির্মাণ। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত অনেকগুলো উদ্যোগে অহিংস নীতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অহেতুক হয়রানিমূলক কিছু কর্মকাণ্ড তিনি নিজেই হস্তক্ষেপ করে থামিয়ে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে বিএনপির ৩১ দফার দফা ২. সম্প্রীতিমূলক সমন্বিত রাষ্ট্রসত্তা প্রতিষ্ঠা ও ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠন। এটি গ্রিন পলিটিক্সের আইডোলজি’র অন্যতম ফোমেটিং কনসেপ্ট। অহিংস রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে টেকসই ভূমিকা নিশ্চিতে দফাটির যথাযথ অনুসরণ আশা করছি আমরা।
পরিশেষে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষার বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনীতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর গ্রিন পলিটিক্সের আইডোলজি আত্তীকরণের রাজনীতি আমাদের নাগরিকদের জন্য নতুনকরে বাংলাদেশকে কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠনের পথরেখা নিদের্শিত করছে।
অন্যান্য রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং ব্যক্তিক পর্যায়ে যার যার দল-মত-ধর্ম পালনের পাশাপাশি গ্রিন পলিটিক্সের কর্মকাণ্ড পরিচালনার দায়বোধ তৈরি হবে প্রধানমন্ত্রীর দেখানো গ্রিন পলিটিক্সের পথ ধরে। আগামীর বাংলাদেশ হবে সবার জন্য কল্যাণকর এবং কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ-প্রতিবেশ বন্ধুতাপূর্ণ।
মূলধারার রাজনীতির পাশাপাশি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর গ্রিন পলিটিক্সের সফলতা কামনা করছি।
সাকিব জামাল
লেখক : কবি ও ব্যাংকার